× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্বজনহীন ঈদ, সোনাভানে ২১ প্রবীণের একাকিত্বের গল্প

অরূপ রতন, বগুড়া

প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০২৬ ১২:৪২ পিএম

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার জোয়ানপুর গ্রামের সোনাভান বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের ২১ জন প্রবীণের কাছে ঈদ যেন এক ভিন্ন বাস্তবতা। তাদের কাছে এই কেন্দ্রেই এখন তাদের শেষ ঠিকানা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার জোয়ানপুর গ্রামের সোনাভান বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের ২১ জন প্রবীণের কাছে ঈদ যেন এক ভিন্ন বাস্তবতা। তাদের কাছে এই কেন্দ্রেই এখন তাদের শেষ ঠিকানা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন আর পরিবারের উষ্ণতা। কিন্তু বগুড়ার শেরপুর উপজেলার জোয়ানপুর গ্রামের সোনাভান বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের ২১ জন প্রবীণের কাছে ঈদ যেন এক ভিন্ন বাস্তবতার নাম—নিঃসঙ্গতা, স্মৃতি আর দীর্ঘশ্বাসে ভরা এক দিন।

এই কেন্দ্রেই এখন তাদের শেষ ঠিকানা। একসময় কেউ ছিলেন স্বচ্ছল পরিবারের কর্তা, কেউ সংসারের প্রাণকেন্দ্র, আবার কেউ কোনোদিনই আপনজনের পূর্ণতা পাননি। আজ সবাই এক ছাদের নিচে, ভাগ করে নিচ্ছেন একই রকম একাকিত্ব।

একাকিত্বের গল্প

গাইবান্ধার সবুরা বেগমের জীবনে একাকিত্ব যেন দীর্ঘদিনের সঙ্গী। ১৯৮১ সাল থেকে স্বামী থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ। নেই সন্তান, নেই ঘনিষ্ঠ কোনো স্বজন। ঢাকার জীবন ছেড়ে ছয় বছর আগে তিনি আশ্রয় নেন এই কেন্দ্রে।

কণ্ঠে চাপা কষ্ট নিয়ে তিনি বলেন, “আমার তো কেউ নাই। ঈদ আসলে মনে হয়, যদি কেউ পাশে বসত, একটু কথা বলত।”

বগুড়া শহরের মালগ্রামের ৭৫ বছর বয়সী মহিদুল ইসলাম একসময় ঠিকাদারি করে স্বচ্ছল জীবন কাটিয়েছেন। পাঁচ বছর আগে স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার জীবন বদলে যায়। তিন মেয়ে থাকলেও তাদের নিজ নিজ সংসারের ব্যস্ততায় তিনি হয়ে পড়েন একা। শেষ পর্যন্ত নিজের বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নেন এই কেন্দ্রে।

তার কথায়, “সব ছিল একসময়, এখন কিছুই নাই। মেয়েরা আছে, কিন্তু তাদেরও সংসার। ঈদের সময় খুব খারাপ লাগে।”

প্রায় শতবর্ষী বাদশা প্রামাণিকের গল্পও ভিন্ন নয়। দুই ছেলে ও এক মেয়ে থাকলেও বার্ধক্যের ভারে একসময় পরিবারের কাছেই হয়ে ওঠেন বোঝা। তাই শেষ আশ্রয় এই পুনর্বাসন কেন্দ্র।

তিনি বলেন, “ছেলে-মেয়ে আছে, কিন্তু কাছে নাই। বয়স হইলে মানুষরে আর কেউ চায় না।”

আশ্রমই তাদের পরিবার

এই কেন্দ্রের ২১ জন বাসিন্দার মধ্যে ১৪ জন নারী ও ৭ জন পুরুষ। কেউ এখানে আছেন আট বছর ধরে, কেউবা এসেছেন সাম্প্রতিক সময়ে। ঈদ এলেই তাদের মন ফিরে যায় অতীতে—সন্তানদের হাসি, নাতি-নাতনিদের কোলাহল, পরিবারের সঙ্গে কাটানো আনন্দময় দিনগুলোর স্মৃতিতে।

বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। অনেকের স্বজন আর খোঁজই নেন না, আবার কারো কারো স্বজন থাকলেও নেই কোনো যোগাযোগ। তাই আশ্রমের বাসিন্দারাই এখন একে অপরের পরিবার। একসঙ্গে গল্প, হাসি আর স্মৃতিচারণেই কেটে যায় তাদের দিন।

ঈদের দিনটিও কাটে সাদামাটাভাবে। সকালে সেমাই, পায়েস, খিচুড়ি ও ডিম, আর দুপুরে থাকে বিরিয়ানি বা মাংসের আয়োজন। কিন্তু সব আয়োজনের মাঝেও অনুপস্থিত থাকে প্রিয়জনের সান্নিধ্য। তবুও একসঙ্গে বসে খাওয়া আর গল্প করার মধ্যেই তারা খুঁজে নেন সামান্য আনন্দ।

কিছু অপূর্ণতা পূরণ হওয়ার নয়

২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী অবসরপ্রাপ্ত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মজিদ খান তার মায়ের নামে এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রবাসে থেকেও তিনি এর কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন। এখানে বসবাসরত প্রবীণদের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা সেবাও নিশ্চিত করা হয়।

কেন্দ্রটির উপসহকারী মেডিকেল কর্মকর্তা বিজন কুমার পাল জানান, এখানে থাকা প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে অবহেলার শিকার।

তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করি তাদের যত্ন নেওয়ার, চিকিৎসা দেওয়ার এবং মানসিকভাবে ভালো রাখার।”

মাঝে মাঝে কেউ কেউ স্বজনের দেখা পেলেও বেশিরভাগের জন্য সেই অপেক্ষা অপূর্ণই থেকে যায়। সমাজের সহৃদয় মানুষ এগিয়ে এসে সহযোগিতা করলেও, স্বজনের অভাব পূরণ হয় না কোনো আয়োজনেই।

তাই সোনাভানের এই প্রবীণদের ঈদ তাই বর্ণহীন। তাদের কাছে ঈদ মানেই একটু অপেক্ষা, কিছু স্মৃতি আর না পাওয়া ভালোবাসার নীরব বেদনা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা