সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৬ ১২:১৩ পিএম
পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন ফুটপাতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে কেনাবেচা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঈদ মানেই নতুন পোশাকের আনন্দ। কিন্তু আকাশছোঁয়া দামের বাজারে সেই আনন্দ অনেকের জন্যই হয়ে ওঠে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার গল্প। তাই কিশোরগঞ্জ শহরে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ঈদ কেনাকাটার প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে ফুটপাতের দোকান।
শহরের গৌরাঙ্গ বাজার, রথখলা ও তেরিপট্টি এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, সারি সারি অস্থায়ী দোকানে সাজানো রয়েছে শার্ট, প্যান্ট, টি-শার্ট, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, শিশুদের পোশাক থেকে শুরু করে জুতা-স্যান্ডেল। পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে কেনাবেচা। রাত ১১টা–১২টা পর্যন্তও ক্রেতাদের ভিড় কমছে না।
সস্তা দামেই ঈদ আনন্দ
বড় শপিংমলে যেখানে একটি শার্ট কিনতেই খরচ হয় ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা, সেখানে ফুটপাতে একই ধরনের পোশাক মিলছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে।
এ কারণে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এসব দোকান হয়ে উঠেছে ‘গরিবের মার্কেট’। অনেকে পরিবারের একাধিক সদস্যের জন্য একসঙ্গে কেনাকাটা করছেন এখান থেকেই।
রিতু আক্তার নামের এক ক্রেতা বলেন, “ফুটপাত মানেই খারাপ জিনিস—এটা ঠিক না। ভালোভাবে দেখে কিনলে কম দামে ভালো কাপড় পাওয়া যায়। আমার ছেলের জন্য ৪০০ টাকায় প্যান্ট কিনেছি, যা শপিংমলে হলে দ্বিগুণ দাম পড়ত।”
তিনি জানান, সংসারের সীমিত আয়ে সব চাহিদা পূরণ করা কঠিন হলেও ঈদে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে ফুটপাতই তাদের ভরসা।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান দুলাল মিয়া। ছেলের জন্য পোশাক ও জুতা কেনার পর এবার স্ত্রীর জন্য শাড়ি কিনবেন বলে জানান তিনি।
নিজের কেনাকাটা নিয়ে তার মন্তব্য, “আগে পরিবারের সবারটা শেষ করি, পরে নিজের কথা ভাবব।”
নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করা মিজান বলেন, সীমিত বেতনে শপিংমল থেকে সবার জন্য কেনাকাটা করা সম্ভব নয়। তাই প্রতি বছরই ফুটপাত থেকে পোশাক কেনেন তিনি। “কম দামে মোটামুটি ভালো জিনিস পাওয়া যায়,” বলেন তিনি।
তবে ক্রেতাদের স্বস্তির এই বাজারের পেছনে রয়েছে বিক্রেতাদেরও সংগ্রামের গল্প।
বিক্রেতাদের সংগ্রামও কম নয়
ফুটপাতের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ কাঞ্চন মিয়া জানান, তারা মূলত বড় গার্মেন্টস কারখানা থেকে স্টকলট বা রিজেক্ট পণ্য কিনে এনে বিক্রি করেন। “শপিংমলে যে শার্ট দুই-তিন হাজার টাকা, সেটাই আমরা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায় দিতে পারি,” বলেন তিনি।
আরেক ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম জানান, ঈদের মৌসুম তাদের বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রতিদিন ১৫–২০ হাজার টাকার বিক্রি হচ্ছে, যা দিয়ে বছরের বড় অংশের আয় নির্ভর করে। তবে পাইকারিতে দাম বাড়ায় খুচরা বাজারেও প্রভাব পড়েছে বলে জানান তিনি।
এদিকে, ফুটপাতের এই জমজমাট বাজার পথচারীদের জন্য কিছুটা ভোগান্তির কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জায়গায় দোকান বসানোর কারণে ফুটপাত সংকুচিত হয়ে পড়েছে, ফলে চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কিশোরগঞ্জ শহরের হাজারো নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ফুটপাতের এই বাজার শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়—এটি তাদের ঈদের আনন্দ, স্বস্তি এবং সামর্থ্যের মধ্যে স্বপ্ন পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।