নতুন সরকারের এক মাস
ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬ ১৪:৩৯ পিএম
নতুন সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সফলতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু সমালোচনাও। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জয়ে সরকার গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন শুরু করে নতুন সরকার। সেই দায়িত্ব পালনের এক মাস পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে নতুন সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের সফলতার সঙ্গে কিছু সমালোচনাও যুক্ত হয়েছে।
সরকার গত এক মাসে কতটা সফলতা দেখিয়েছে, সে সম্পর্কে মূল্যায়ন করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মো. শামসুল আলম। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হওয়ার পরই তারেক রহমান ভিন্ন একটি কাজ করেছেন তা হচ্ছেÑ তিনি বিরোধীদলীয় প্রধান তথা জামায়াতে ইসলামীর আমিরের বাসা, জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রধান নাহিদ ইসলামের বাসা ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের (চরমোনাই পীর) বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন।
তিনি আরও বলেন, শপথগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী সময়মতো অফিসে যাচ্ছেন। তাতে প্রশাসনেও সাড়া ফেলছে। অন্যান্য মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সরকারের দায়িত্বশীলরা সময়মতো অফিসে উপস্থিত হচ্ছেন। ট্রাফিক জ্যাম এড়াতে প্রধানমন্ত্রী প্রটোকল প্রথা বাতিল করে দিয়েছেন। তা ছাড়া বিমানবন্দরে যে বহর নিয়ে বিদায় জানানোর রীতি ছিল, সেটিও বাতিল করে দিয়েছেন। এগুলো সরকারপ্রধানের উদারতা ও দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
সরকার এই সময়ে অর্থনৈতিক দিকে কতটা সফলতা দেখিয়েছে, সেই মূল্যায়ন করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সরকার অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। বিশেষত অর্থনীতিতে পুঞ্জীভূত চ্যালেঞ্জ অন্যতম। আমাদের সঞ্চয় আহরণ খুবই কম। অনেক বেশি ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছিল। বিনিয়োগে মন্দাভাব ছিল। গত সরকারের সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি, বরং ১৭ লাখ লোক কর্মহীন হয়ে পড়েছিল। তিনি
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক দিকে যে প্রভাব পড়ছে, সেটি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করছে সরকার।
তিনি বলেন, তারপরও বলতে হয় আমাদের রপ্তানিকারকরা বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছেন। তাদের কিছু কিছু অর্ডার স্থগিত রয়েছে। কিছু জায়গায় অর্ডার ডিসকাউন্ট চাচ্ছে। ইনস্যুরেন্স ও শিপিং খরচ বেড়েছে। কেননা তেলের দাম বাড়লে অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও বাড়ে। যোগ করেন, আমরা আশা করব অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সংস্কারে হাত দিয়েছিল নতুন সরকার সেগুলো অব্যাহত রাখবে। বিশেষত ব্যাংকিং সেক্টর, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগে চাঞ্চল্য আনাÑ এসব কাজ অব্যাহত রাখবে এবং আরও উদ্যোগী ভূমিকা রাখবে।
সরকারের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম
কৃষিঋণ মওকুফ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক প্রথম বৈঠকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ ও সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে করে কৃষকরা কৃষি ও মৎস্য খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফের আওতায় আসেন। সরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর গত ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুদসহ কৃষকদের কাছে পাওনা ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। এগুলো মওকুফের আওতাভুক্ত হয়। এতে করে প্রায় ১২ লাখ কৃষক প্রত্যক্ষভাবে লাভবান হচ্ছেন।
খাল খনন : ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় খনন করা হবে। সেখানে ৫৪ জেলায় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এতে সেচ উন্নত হবে, জলাবদ্ধতা কমবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা ও মানবিক সহায়তা
ফ্যামেলি কার্ড : ১০ মার্চ রাজধানীর কড়াইল বস্তিসংলগ্ন এলাকায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পরীক্ষামূলক (পাইলট) কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এদিন দেশের ১৩ জেলা ও সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের ৩৭ হাজার ৫৬৭ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়।
প্রশাসনিক সংস্কার ও সুশাসন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৭ মার্চ শনিবার সরকারি ছুটির দিনেও অফিস করেছেন। তিনি সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত হয়ে সবাইকে বিস্মিত করে দেন। পরবর্তীতে সরকারি কর্মকর্তাদের সকাল ৯টার মধ্যে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করেন। এতে প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা বেড়েছে। তা ছাড়া এমপিদের বিশেষ সুবিধা তথা শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট গ্রহণ না করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন; যার ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমবে, জনগণের আস্থা পুনঃস্থাপিত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
অর্থনীতি ও বাজার স্থিতিশীলতা
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার বাজার মনিটরিং বৃদ্ধি করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিতিশীলতার মাঝেও বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখতে স্পট এলএনজি ক্রয় করছে। জ্বালানি সংকট প্রতিহত করতে ভারত থেকে জ্বালানি আমদানি করছে। এ ছাড়া রাশিয়া থেকে তেল আমদানির চিন্তাও করছে।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
সরকার পুনঃভর্তি ফি ও লটারি বাতিল করেছে। প্রতি বছর পুনরায় ভর্তি ফি বাতিল, লটারির পরিবর্তে আধুনিক ভর্তি পরীক্ষা বা সাক্ষাৎকার, শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে বলে যে নির্দেশনা দিয়েছে, এতে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
এ ব্যাপারে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন মঙ্গলবার সরকারের ২৮ দিনের ২৮টি কাজের ফিরিস্তি দিয়েছেন। মাহদী আমিন বলেন, সরকার গঠনের প্রথম ২৮ দিনে নেওয়া পদক্ষেপগুলো তারেক রহমানের দৃঢ় নেতৃত্ব, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। তার নেতৃত্ব এভাবেই সাধারণ মানুষের আশা ও অনুভূতিকে ধারণ করছে, স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করছে।
সরকারের এসব সফলতার সঙ্গে কিছু সমালোচনাও যুক্ত হয়েছে। বিশেষ করে সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের ‘সড়কে বিভিন্ন পরিবহন থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা নেওয়া হলে সেটা চাঁদা নয়, বরং টাকা দিতে বাধ্য করা হলে সেটা চাঁদা’ বক্তব্যকে ঘিরে সমালোচনা তুঙ্গে ওঠে। তা ছাড়া বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও জেলায় দলীয় প্রশাসক নিয়োগ এবং একই দিন একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িঘড়ি করে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ায় বিভিন্ন পর্যায় থেকে সরকারের সমালোচনা শুরু হয়। বিশ্লেষকরা আরও সময় নিয়ে ও পর্যালোচনা করে উপাচার্য নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।
সরকারের কাছে প্রত্যাশা
অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং সেক্টরে সংস্কার অব্যাহত রাখা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগে চাঞ্চল্য আনতে সরকার অগ্রাধিকারভিত্তিক মনোযোগ দেবে প্রত্যাশা করেন। তিনি বলেন, চলমান বাজেটকে সরকার রিভাইস করবে এবং আগামী বাজেটে যেন ভালো অর্থায়ন হয়, সেটা করবে।
অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম বলেন, সংসদ অধিবেশন চলছে। আশা করি এটি প্রাণবন্ত হবে। যদিও বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তারা তা নেয়নি। তারা রাষ্ট্রপতি ভাষণের বিষয় নিয়ে ওয়াকআউট করেছে। এটি সংসদে হয়েই থাকে। আমরা বলব, নতুন সরকারের কাজে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। এসব কার্যক্রম ধরে রেখে দেশ পরিচালিত হলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যাব।