হোসেন শহীদ মজনু
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬ ১৩:২৭ পিএম
নিজের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা অভিনয় থেকে দীর্ঘদিন দূরে ছিলেন শামস সুমন।
১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে প্রাণ বাঁচাতে একটি নৌকায় আশ্রয় নিয়েছে নানান ধর্ম-জাত পাতের মানুষ। সেখানে অন্য আর দশ জনের মতো আশ্রয় নিয়েছেন জসিমউদ্দিন ও তার গর্ভবতী স্ত্রী। কে না জানে, পেটের সন্তানের কারণে গর্ভবতী নারীর ক্ষুধা বেশি লাগে। ঠিক সে কারণে ক্ষুধায় কাতরানো স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে অসম্ভব এক অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে জসিমউদ্দিনের চোখেমুখে। তিনি মুখ নিচু করে তাকিয়ে থাকেন, যে তাকিয়ে থাকার নাম দেখা নয়! যে তাকিয়ে থাকার মধ্যে চোখে পড়ে লুকিয়ে থাকা চাপা কষ্ট।
জসিমুদ্দি : ক্ষুধা লাগছে না?
স্ত্রী: (পেটের দিকে তাকিয়ে): আমার জন্য ভাবি না! ওর জন্যই তো!
জসিমুদ্দি: ভাইবো না। আল্লাহ্ই দেখবো আমার পোলারে।
স্ত্রী: (মৃদু হেসে): আপনার পোলা হইবো? জানেন ক্যামনে।
জসিমুদ্দি : আমি আল্লাহ্র খুব পছন্দের লোক। আল্লাহ্ আমার ইচ্ছে সব সময় পূরণ করে।
স্ত্রী: তাই?
জসিমুদ্দি বোকার মতো একটা হাসি দেয়। তার হাসির সুন্দর একটা অর্থÑআল্লাহ্ তার প্রিয় বান্দাকে তোমার মতো একজন স্ত্রী দিয়েছে।
কয়েক দিন পর।
স্ত্রী: এই ঘোর বিপদে আমি তোমার একটা বোঝা হইয়া গেলাম।
জসিমুদ্দি : নারে বউ! তুই বোঝা হইবি কেন? তুই তো আমার বোঝা বইয়া বেড়াইতাছস।
জসিমুদ্দি মাত্র একটি লাইনে কত কথা বুঝিয়ে দেয়। স্ত্রীর গর্ভে থাকা সন্তানের দায় তো তারই। সে যদি গর্ভবতী না হতো, তাহলে নৌকার আর দশজনের মতো স্বাভাবিক থাকত, একে অপরের সাহায্যে আসতে পারতো। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের ভয়ে পালানোর প্রয়োজনে দৌড়াতে পারত!
স্ত্রী: আমার কিছু হলে আপনি আমাগো পোলারে দেইখেন।
জসিমুদ্দি : কিছু হইবো না বউ! আল্লাহ্ আছে না? আল্লাহ্ আছে।
আরও কয়েক দিন পর।
নৌকা যাত্রীরা প্রায় সবাই একটি বাজারে নেমেছে। স্ত্রীর শরীর খারাপ থাকায় জসিমুদ্দি নামতে পারে না। বাজারের চিকিৎসক এসে তার স্ত্রীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলে, চিন্তা কইরেন না।
বাজারে খাবার রান্নার তোড়জোড় চলে। যে যেভাবে পারছে সাহায্য করে। রান্না শেষে মাত্রই খেতে বসেছে কেউ কেউ। এ সময় ছোট্ট এক শিশু মুক্তিযোদ্ধাদের রাখা একটি বন্দুক নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে গুলি বেরিয়ে যায়।
গুলির শব্দে পাকিস্তানি বাহিনীর সৈন্য গাড়িবহর ছুটে আসে বাজারে। নির্বিচারে গুলি চালায় খেতে বসা মানুষগুলোর ওপর। প্রাণ যায় প্রায় সবার।
আর স্ত্রীর অসুস্থতার জন্য নৌকা থেকে বাজারে নামতে না পারা জসিমুদ্দি পড়ে ভিন্ন এক বিপদে। হঠাৎ করে ডেলিভারি পেইন শুরু হয় তার স্ত্রীর। গোলাগুলির মধ্যে ডাক্তারকে ফের ডেকে নিতে বাজারে ছুটে আসে জসিমুদ্দি। দেখে গুলি খেয়ে পড়ে আছেন ডাক্তার। দিগ্বিদিকশূন্য জসিমুদ্দি অগত্যা ডাক্তারের ব্যাগটিকে অবলম্বন ভেবে হাতে তুলে নিয়ে দৌড় দেয়। কিন্তু স্ত্রীর কাছে পৌঁছার আগেই পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে নিথর হয়ে পড়েন তিনি।
‘আল্লাহ্র পছন্দের লোক’ জসিমুদ্দি তার অসহায় স্ত্রীকে রেখেই অনাগত সন্তানের মুখ না দেখে পাড়ি দেন অনন্তের পথে।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অপূর্ব এক সিনেমা ‘জয়যাত্রা’য় জসিমুদ্দি ছিলেন শামস সুমন। ২০০৪ সালে তারই বন্ধু-প্রায় সমবয়সী অভিনেতা-পরিচালক তৌকীর আহমেদের প্রথম পরিচালনা এটি। ওই সিনেমার সহকারী পরিচালক হিসেবে শামস সুমনকে কিছুটা ওপর থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল।
নব্বইয়ের দশকে শামস সুমন, টনি ডায়েস, জাহিদ হাসানরা যখন নায়ক, তাদের নায়িকা মিতা নূর, বিপাশা হায়াত, গোলাম ফরিদা ছন্দা, বিজরী বরকতুল্লাহ, তাজিন আহমেদ তুঙ্গে। আমরা টেলিভিশনের পর্দায় তাদের অভিনয়ে বিমোহিত হয়েছি। ‘জয়যাত্রা’র সহকারী পরিচালক ছিলাম এক বছর প্রায়। এর বাইরে দু-চারটি টিভি নাটকেও সহকারীর ভূমিকায় থাকার কারণে দূরের তারকাদের কাছে যাবার সুযোগ হয় কিছুটা। সে সময় মনে পড়তো প্রখ্যাত সাংবাদিক, বামপন্থী রাজনীতিক নির্মল সেনের একটি কথা। তিনি প্রায়শই বলতেন, তারকাদের কাছে যেও না। তুমি যাকে তারকা ভাবছো, যত কাছে যাবে ততই মুগ্ধতা নিঃশেষ হবে, তারকার অন্তঃসারশূন্যতা তোমাকে পীড়াও দিতে পারে। তা সে তারকা হোক সিনেমা-নাটকের কিংবা রাজনীতির মাঠের।
আমাদের সমাজে এমন ‘ফেক’ তারকার আধিক্যই বেশি। দূর থেকে আমরা যখন কাছে আসি, তখনই হয়তো সেটা উপলব্ধি করতে পারি। শামস সুমনকে তেমনটা কখনও মনে হয়নি। তিনি খুব গুছিয়ে সুন্দর করে কথা বলতে পারতেন, আড্ডা জমিয়ে তুলতেও জুড়ি ছিল না তার। ‘জয়যাত্রা’র সহঅভিনেতা কিংবা কলাকুশলীদের সঙ্গে ছিলেন সাবলীল। তবে একটা আভিজাত্যবোধ তীক্ষ্ণ ছিল তার, নিজেকে কোথায় রাখতে হবে, কীভাবে রাখতে হবে সেই পরিমিতিবোধ সবসময় মেনে চলতেন।
অভিনেতা তৌকীর আহমেদ এক জিনিস, আর পরিচালক তৌকীর আহমেদ অন্য জিনিস। জয়যাত্রার প্রত্যেকের কাছ থেকে সর্বোচ্চটা আদায় করেছেন তিনি। তার সহধর্মিণী বিপাশা হায়াত কিংবা কাছের বন্ধু শামস সুমন অথবা শ্বশুরমশায় আবুল হায়াত। কাউকে ছাড় দেননি তিনি। যারা এখনও জয়যাত্রা দেখেননি, তাদের জন্যই মূলত লেখার শুরুর বর্ণনাটা। তৌকীর আহমেদ একজন শামস সুমনের কাছ থেকে কাজটা কীভাবে আদায় করেছেন, তা বর্ণনাতেও কিছুটা মিলবে। আর জাত অভিনেতা হিসেবে নিজের সর্বোচ্চটা দিতে তিল-পরিমাণ পিছু হটেননি শামস। একদম নিখুঁত ও দুর্দান্ত অভিনয়। কিছুটা ওপর থেকে শামস সুমনকে এভাবেই দেখা আমার। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়ী এ অভিনেতা সবটা উজাড় করে দিয়েছেন অভিনয়ে। রেডিও, টেলিভিশন, মঞ্চ কিংবা সিনেমা, যেখানে যখন অভিনয় করেছেন, সেরাটা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। অভিনয়ের সুযোগ যখন পাননি কিংবা শুরু করেননিÑবিকল্প নানান কিছুকে আশ্রয় করে বাঁচতে চেয়েছেন, সেটা যে খুব ভালো পারেননি, তা তার মৃত্যুর পর ভক্তকুল জানতে পারছেন। নয়তো অভিনেতার বাইরের পরিচয়গুলো অজানায় থাকতো। তিনি আবৃত্তিকার হতে চেয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়, হতে চেয়েছিলেন শিক্ষক, হতে চেয়েছিলেন রেডিওর অনুষ্ঠান প্রধান। সেসবে তার পূর্ণতা মেলেনি। অভিনয়ই তাকে দিয়েছে পূর্ণতা।
হাসপাতালে মঙ্গলবার শামস সুমনের মৃত্যুর সময় উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা মাসুদ রানা মিঠু। তার বয়ানটা ঠিক যেন ‘জয়যাত্রা’র জসিমুদ্দির না ফেরার দেশে যাবার ঘটনাকে মনে করিয়ে দেয়। মিঠু গণমাধ্যমে বলেছেন, আমি গিয়ে দেখি ভাইকে এমআরআই রুমে নেওয়া হয়েছে। কিছুক্ষণ পর নিজেই হেঁটে বের হয়ে এলেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। আমরা বললাম, ভাই আমরা আছি। উনি বললেন, আচ্ছা। তখন তো মনে হয়নি, এত বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার মধ্যেই হঠাৎ নেমে আসে বিপর্যয়। এমআরআই শেষে ড্রেসিংরুমে পোশাক পরিবর্তনের সময় আচমকা মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন শামস সুমন। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সহকর্মীরা ছুটে যান। কয়েকজন মিলে তাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তখন তিনি কাতর স্বরে ‘ও আল্লাহ, ও মা’ বলতে বলতে নীরব হয়ে যান।
নিজের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা অভিনয় থেকে দীর্ঘদিন দূরে ছিলেন শামস সুমন। ছিলেন পরিবার থেকেও দূরে, স্ত্রী-সন্তান লন্ডন থাকে, তারা চেয়েছিল তিনিও সেখানে যাবেন। কিন্তু শামস সুমন থেকে গেছেন দেশে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে সর্বশেষ চ্যানেল আইয়ে শাহরিয়ার নাজিম জয়ের উপস্থাপনায় ‘১৩টি প্রশ্ন’ অনুষ্ঠানে কথা বলেন শামস সুমন। এটি তার শেষ সাক্ষাৎকার। শাহরিয়ার নাজিম জয় তার বন্ধু শামস সম্পর্কে ফেসবুকে লিখেছেন, শেষের দিকে তোমার সঙ্গে যখন কথা হতো, আমি তোমার কাছ থেকে শুধু হতাশার কথা শুনতাম। আমি তোমাকে সাহস দেওয়ার এবং সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম। …তোমার ব্যক্তিগত জীবনের টানাপড়েনের গল্প আমাকে সব খুলে বলেছিলে। আমি বুঝতে পারছিলাম না, কেন তুমি টানাপড়েন থেকে বের হতে পারছ না। তুমি আমাকে বলেছÑ তুমি চেষ্টা করছ, পারছ না। কিন্তু না পারতে পারতে মানসিক চাপ নিতে নিতে তুমি যে চোখের সামনে এভাবে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে, আমি অনুমান করলেও এটা নিয়ে কখনও গভীরভাবে ভাবিনি।
জয় আরও লেখেন, তোমার জীবন থেকে যা শিখলাম, পৃথিবীতে তুমি যত কাজ করো না কেন, যত সম্মান অর্জন করো না কেন, তোমার যা টাকা লাগবে তা যদি তোমার কাছে না থাকে, তাহলে তুমি সত্যিই মানসিক চাপে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে।
বয়স হয়ে যাওয়ায় অভিনয়ের কোনো অফার না পেয়ে ভুগতেন একাকিত্বে। এর পেছনে ছিল অন্য আরও কারণ, হয়তো ছিল অন্য আরও নানান অসহায়ত্ব। শামস সুমন গণমাধ্যমে বলেছিলেন, “বর্তমানে যে টিভি, ওটিটি ও ইউটিউবকেন্দ্রিক নাট্যচর্চা, সেগুলোর সঙ্গে আমি নিজেকে অ্যাডাপ্ট করতে পারছি না। না সংলাপ, না চরিত্র, না কাহিনীÑ কোনোটার সঙ্গেই নিজেকে খুঁজে পাই না। তবে আমি চেষ্টা করছি, কীভাবে ফিরে আসা যায়। ক্যামেরাকে ভুলতে পারব না।” তবে আর ফিরে আসা হয়নি অভিনয়ে, নিজের শহর রাজশাহীতে ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে।