রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬ ১২:৩৪ পিএম
উন্নয়নের কারণে বন্ধ গুলিস্তানের শহীদ মতিউর পার্ক (বাঁয়ে), শাহাবাগ শহীদ জিয়া শিশু পার্ক ও শ্যামপুরের ইকো পার্ক (শেষে)। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
হাতুড়ি কিংবা গ্রিল মেশিনের ঠুকঠাক আওয়াজ ভেসে আসছে। কোথাও রঙের পাত্রে ব্রাশ ডুবিয়ে বিবর্ণ ও শিরিশ কাগজ দিয়ে ঘষা দেয়ালের ওপর বসানো হচ্ছে টাটকা নতুন রঙ। পার্কের বিভিন্ন রাইডের সংযোগ পরীক্ষা করে দেখছেন টেকনিশিয়ানরা। ভাস্কর্যগুলোও সংস্কার করা হচ্ছে যত্ন করে। জোরেশোরে চলছে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও আলোকসজ্জার প্রস্তুতি। এমনটাই দেখা গেল কয়েক দিন ধরে ঢাকার বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র ঘুরে। সেগুলো যেন আবারও জেগে উঠছে নতুন ছন্দে। ধুলোমলিন দিন পেরিয়ে রঙ-তুলির ছোঁয়া, আলোকসজ্জা আর সংস্কারের মধ্য দিয়ে নতুন রূপে ফুটে উঠছে বিভিন্ন আনন্দভূমির চেহারা। কারণ ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে নগরবাসীর প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠছে এসব স্থান। তাই দর্শনার্থী টানতে শুরু হয়েছে বিনোদন কেন্দ্রগুলোয় উৎসবের উজ্জ্বল আবহ ফুটিয়ে তোলার কাজ। কিন্তু এর বিপরীত ধূসর চিত্র মিলছে ঢাকার ‘ফুসফুস’ খ্যাত বড় বিনোদন ও অবসর কেন্দ্রগুলোয়, দর্শক টানতে সক্ষম বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কেন্দ্রগুলোয়। কেননা উন্নয়নের বেড়াজালে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে ঢাকার শিশুপার্ক ও উদ্যান। আবার ঈদের দিন বন্ধ থাকার কথা রয়েছে আহসান মঞ্জিল ও জাতীয় জাদুঘরের।
ঢাকার শ্যামপুরে বুড়িগঙ্গা নদীর কোলঘেঁষা বিআইডব্লিউটিএ ইকোপার্কে গিয়ে দেখা গেল, ভীষণ ব্যস্ত সেখানকার সংস্কারকর্মী ও সংগঠকরা। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌযান কর্তৃপক্ষ ২০১২ সালের শেষ দিকে প্রায় ৭ একর জমিতে পার্কটি গড়ে তোলে। এখানে কর্মীরা কেউ ভাস্কর্যে রঙ করছেন, কেউ রাইডের যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করছেন।
এই পার্কে শিশু ও বড়দের জন্য মোট ২১টি রাইড রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছেÑ ৯ডি সিনেমা, স্ট্রাইকিং কার, বুল ফাইট, রোলার কোস্টার, রেঞ্জার, ফ্রিজবি, সুইং চেয়ার, ব্লু-ওয়ার্ল উইন্ড, ব্যাটারি কার, মেরি-গো-রাউন্ড, সেলফ কন্ট্রোল প্লেন, ওয়ান্ডার হুইল, টোরা টোরা, পাইরেট শিপ, ড্রাই স্লাইড, জাম্পিং প্যাড, ক্রস কান্ট্রি বাম্পার কার, রকিং বোট, কয়েন অপারেটেড বেবি ফিগার, কাউ বয় ও বাঞ্জি ট্রেম্পোলিন। প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা আর রাইডভেদে ৩০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত।
পার্কের ম্যানেজার আসাদুজ্জামান আসাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “পার্কের ২১টি রাইডই বর্তমানে মেরামত এবং যান্ত্রিক পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের নিজস্ব টেকনিশিয়ান ও ইঞ্জিনিয়াররা প্রতিটি যন্ত্রাংশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করছেন। ঈদ উপলক্ষে শিশুদের জন্য নতুন একটি জাম্পিং প্যাডও আনা হয়েছে।”
গুলিস্তানের শহীদ মতিউর পার্কেও দর্শকদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রস্তুতি এখন শেষ দিকে। ছোট ও বড়দের জন্য এখানে রয়েছে ১৪টি রাইড। পার্কের ম্যানেজার রওশন আলী মাহি বলেন, “ঈদুল ফিতর সামনে রেখে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সার্ভেল্যান্স ক্যামেরা, সেফটি, ইলেকট্রিক্যাল ও সিকিউরিটি ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ভলান্টিয়ার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অস্থায়ীভাবে আরও কিছু রাইড যুক্ত করা হবে।”
ঈদের দিন খোলা থাকবে ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লা। কাস্টোডিয়ান মোখলেসুর রহমান বলেন, “আগের সময়সূচি অনুযায়ীই ঈদের দিন দর্শনার্থীদের জন্য কেল্লা খোলা থাকবে। পথশিশুদের এ দিন কোনো প্রবেশ ফি লাগবে না।”
ঈদ ঘিরে নতুনভাবে বিন্যস্ত করা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানাও। পুরো এলাকায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রঙ লাগানোর কাজ চলছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চিড়িয়াখানার পরিচালক ড. মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘ঈদের দিন থেকে শুরু করে পরের কয়েক দিন এখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক লাখ দর্শনার্থীর সমাগম হতে পারে বলে আমরা আশা করছি। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নতুন কোনো প্রজাতির প্রাণী যুক্ত করা হয়নি, তবে সম্প্রতি জন্ম নেওয়া একটি জিরাফ শাবক দর্শকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে উন্মুক্ত করা হবে।’
তবে ঈদের দিন বন্ধ থাকবে পুরান ঢাকার আহসান মঞ্জিল এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে জানানো হয়েছে, ঈদের পরের দুই দিন সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এই দুই জাদুঘর খোলা থাকবে। তবে ঈদের দিন আহসান মঞ্জিল ও জাতীয় জাদুঘর খোলা রাখার দাবি জানিয়েছেন সেন্টার ফর সিটিজেনস রাইটসের (সিসিআর) মুখপাত্র ইকবাল কবির। তিনি বলেন, নগরবাসী ঈদের দিন ঘুরতে বের হয়। অনেকে আহসান মঞ্জিল ও জাতীয় জাদুঘরে গিয়ে ফেরত আসেন। সরকারের উচিত অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্রের মতো এই দুটি বিনোদন কেন্দ্র খোলা রাখা।
অন্যদিকে উন্নয়ন কাজের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে শহীদ জিয়া শিশুপার্ক ও ওসমানী উদ্যান। ফলে নগরবাসীর বিনোদনের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে অবসর পেলেই মানুষ ছুটে যেত এসব স্থানে, এখন সেই চাপ গিয়ে পড়ছে রমনা পার্কে। এদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বড় একটি অংশজুড়েও চলছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ।
তবে সম্ভাব্য বাড়তি ভিড় সামাল দিতে রমনা পার্কে কোনো অতিরিক্ত প্রস্তুতি নেই। এ বিষয়ে নগর গণপূর্তের প্রকল্প সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান বলেন, “রমনা পার্ক তার স্বাভাবিক নিয়মেই ঈদের সময় দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের সতর্ক থাকতে বলা হবে। প্রয়োজনে পুলিশের সহায়তা নেওয়া হতে পারে। এর বাইরে কোনো অতিরিক্ত প্রস্তুতি নেই।”
ঈদ সামনে আর সেই আনন্দ ঘিরে প্রস্তুতির এই ব্যস্ততায় একদিকে যেমন উচ্ছ্বাসের রঙ ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে তেমনি স্পষ্ট হয়ে উঠছে সীমাবদ্ধতার বাস্তবতাও। তবু নগরবাসীর কাছে এই বিনোদন কেন্দ্রগুলোই এখন পর্যন্ত স্বল্প সময়ের মুক্তির ঠিকানাÑ হাসি-আনন্দ, আড্ডা আর সাময়িক স্বস্তির একটুকরো ভুবন।