হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬ ১১:৫১ এএম
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে ‘হরমুজ প্রণালী’ প্রায় অচল, বন্ধ হয়ে গেছে ওই রুট দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলোদেশ
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে ‘হরমুজ প্রণালী’ প্রায় অচল, বন্ধ হয়ে গেছে ওই রুট দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। তবুও থেমে নেই দেশের জ্বালানি সরবরাহের চাকা। একের পর এক জ্বালানিবাহী জাহাজ ভিড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরে। গত ১৫ দিনে ২৩ জাহাজ জ্বালানি তেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝেও চট্টগ্রাম বন্দরে জ্বালানি সরবরাহের এই ধারাবাহিকতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় দিচ্ছে স্বস্তির বার্তা।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ইরান-ইসরাইয়েল-মার্কিন যুদ্ধ শুরুর পর গত ৩ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ২৪টি জাহাজ জ্বালানি তেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে। এর মধ্যে ১৮টি জাহাজ জ্বালানি খালাস করে ইতোমধ্যে ফিরে গেছে। বাকি ৫টি জাহাজে খালাস কার্যক্রম চলছে।
আগামী ৫ দিনের মধ্যে আরও চারটি জাহাজ জ্বালানি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে বলে তিনি জানান। সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ‘আগামী ৫ দিনের মধ্যে জ্বালানি তেল নিয়ে আরও চারটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসার কথা রয়েছে। চারটি জাহাজের মধ্যে একটিতে এলএনজি, দুটিতে এলপিজি এবং একটিতে বেস অয়েল আসবে।’
ইসরায়েল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলার উত্তেজনা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে একপর্যায়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে ইরান। জ্বালানি তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই রুট দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে তৈরি হয় অস্থিরতা। জ্বালানি তেল সরবরাহে দেখা দেয় অনিশ্চয়তা। তবে এই অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানিতে এখন পর্যন্ত খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। সংঘাত তীব্র হওয়ার আগেই হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করা জ্বালানি তেলবাহী বেশ কয়েকটি জাহাজ দেশে এসে পৌঁছায়। এতে জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণে এখনও স্বস্তিতে আছে বাংলাদেশ। যুদ্ধ শুরুর পর একের পর এক জাহাজ আসছে দেশে।
এদিকে জ্বালানি নিয়ে একের পর এক জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এলেও বন্ধ হয়ে গেছে ক্রুড অয়েল আমদানি। গড়ে প্রতি মাসে দেশে দেড় লাখ টনের মতো ক্রুড অয়েল আমদানি করা হলেও যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত একেবারেই আমদানি করা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় ক্রুড অয়েল নিয়ে আসতে পারছে না কোনো জাহাজ।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৩ মার্চ থেকে এই পর্যন্ত জ্বালানি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ২৩ জাহাজের মধ্যে ৫টিতে আনা হয়েছে এলএনজি। এর মধ্যে এলএনজিবাহী চারটি জাহাজ এসেছে কাতার থেকে। বাকি একটি আমদানি করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। কাতার থেকে যে এলএনজিবাহী জাহাজগুলো এসেছে সেগুলো যুদ্ধ তীব্র হওয়ার আগেই হরমুজ প্রণালী পার হয়েছে।
এলপিজি নিয়ে এসেছে ৬টি জাহাজ। এসব জাহাজের মধ্যে ২টি এসেছে মালয়েশিয়া, ২টি এসেছে ওমান এবং বাকি দুটি এসেছে ভারত থেকে।
জ্বালানি নিয়ে আসা বাকি ১২টি জাহাজের মধ্যে ৫টিতে করে আমদানি করা হয়েছে গ্যাস অয়েল। এর মধ্যে দুটি জাহাজ সিঙ্গাপুর থেকে, দুটি মালয়েশিয়া এবং একটি ইন্ডিয়া থেকে এসেছে। ৪টি জাহাজে আমদানি করা হয়েছে হাই সালফার ফুয়েল। চারটি জাহাজই এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে।
এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত দেশে কোনো ক্রুড অয়েল আমদানি করা সম্ভব হয়নি। চলতি মার্চ মাসে দেড় লাখ টনের কাছাকাছি ক্রুড অয়েল নিয়ে দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসার কথা থাকলেও হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় এখন পর্যন্ত একটি জাহাজও আসতে পারেনি। এতে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়াত্ত তেল পরিশোধন কারখানা ইস্টার্ন রিফাইনারি চালু রাখা নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
বিপিসির আমদানি করা ক্রুড অয়েল পরিবহনের দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (চার্টারিং অ্যান্ড ট্রাম্পিং) ক্যাপ্টেন মো. মুজিবুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য প্রতি মাসে গড়ে এক থেকে দেড় লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করতে হয়। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এখন সেটি সম্ভব হচ্ছে না। সর্বশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি জাহাজে করে ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো ক্রুড অয়েল আমদানি করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, চলতি মাসে দুটি জাহাজে করে ক্রুড অয়েল আমদনি সিডিউল ছিল। একটি জাহাজ সৌদি আরবের বন্দর থেকে ক্রুড অয়েল লোড করে গত ৪ মার্চ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা ছিল। অন্যটির সিডিউল ছিল ২০ মার্চ। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় এখন এই তেলগুলো আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। ৪ মার্চ যেই জাহাজটি ক্রুড অয়েল নিয়ে আসার কথা ছিল সেটি তেল লোড করে অলস বসে আছে।