রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬ ১২:৫৭ পিএম
রাজধানীতে সন্ধ্যা নেমে আসার মানেই মশার একচ্ছত্র দাপট শুরু হওয়া। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়মিত ফগিং বা কীটনাশক ছিটিয়েও কাহিল করতে পারছে না মশাদের। ফগিং মেশিনের ধোঁয়া আর লার্ভিসাইডিং যতই ছিটানো হোক, অলিগলি থেকে ঘরের ভেতর হয়ে কখনও কখনও মানুষের কাপড়চোপড়ের মধ্যেও ঢুকে পড়ছে মশা।
চাঞ্চল্যকর বিষয়
হলো, মশা দমনে ছিটানো ‘ম্যালাথিয়ন’ এবং লার্ভা ধ্বংসে ব্যবহৃত ‘টেমেফোস’ ল্যাবরেটরি
পরীক্ষায় শতভাগ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ল্যাবে মশা মরলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে কমছে
না এই ক্ষুদ্র কীটের দাপট। মশাদের এই টিকে থাকার ক্ষমতা নগরবাসীকে মারাত্মক স্বাস্থ্য
ঝুঁকিতে ফেলছে। কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি কীটনাশক লিকুইড (এডালটিসাইড) ম্যালাথিয়নের ২টি এবং টেমেফোসের ৩টি
সিলগালা করা নমুনা বায়োলজিক্যাল এফিকেসি পরীক্ষার জন্য রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও
গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) পাঠিয়েছিল। কিন্তু গত ২ মার্চ আইইডিসিআর পরীক্ষাগার
থেকে দেওয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে, মশা নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকটি শতভাগ কার্যকর ও গুণগত
বলে প্রমাণিত হয়েছে।
আইইডিসিআরের রিপোর্ট
বলছে, সংস্থাটির মেডিকেল এন্টোমোলজি বিভাগে ম্যালাথিয়নের দুটি নমুনা মহাখালী এলাকা
থেকে সংগ্রহ করা পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী কিউলেক্স কুইনকুইফ্যাসিয়াটাস মশার ওপর পরীক্ষা
করা হয়। ৩৩ ঘনমিটার কক্ষে দরজা ও জানালা বন্ধ করে কীটনাশক স্প্রে করা হয়। স্প্রে করার
পর তিনটি লোহার ফ্রেমের নেটে রাখা ৭৫টি মশার নকডাউন পরিস্থিতি ২০ মিনিট পর লিপিবদ্ধ
করা হয়। এরপর মশাগুলো ২৪ ঘণ্টা কীটনাশকমুক্ত কক্ষে রাখা হয় এবং মৃতের সংখ্যা গণনা করা
হয়।
পরীক্ষার ফলাফলে
উভয় নমুনার ক্ষেত্রেই মৃত্যুহার ও বায়োলজিক্যাল কার্যকারিতার শতভাগ ধরা পড়ে। লার্ভানাশক
টেমেফোস ক্ষেত্রেও একই সফলতা পাওয়া গেছে। মহাখালী এলাকা থেকে সংগৃহীত লার্ভা ২৪ ঘণ্টার
মধ্যে মৃত হয়েছে। পরীক্ষাগারে ছিল ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৭৬ শতাংশ আর্দ্রতা।
তবে মাঠে অনুসন্ধান
করতে গিয়ে মিলেছে এর উল্টো চিত্র। এসব কীটনাশক দমনে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে রাজধানীতে
নিয়ম করে ফগিং ও লার্ভিসাইডিং ব্যবহার করা হলেও মশা মরে না বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
ডিএসসিসির ৫২ নং ওয়ার্ডের মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা আহমদ আলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে
বলেন, ‘আমাদের এলাকা মশার উর্বর ক্ষেত্র। বিকালের পর থেকেই শুরু হয় মশার আনাগোনা। সিটি
করপোরেশন ফগিং করলে মশা কমা দূরে থাক, আরও বাড়ে। তাদের ওষুধে সম্ভবত ভেজাল আছে। তা
না হলে ওষুধে কাজ করে না কেন?’
ল্যাবের কীটনাশকের
এমন ‘সাফল্য’ নিয়ে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর
রহমান তালুকদার বলেন, ‘আইইডিসিআর ল্যাবে পরীক্ষিত কীটনাশক শতভাগ কার্যকর এবং গুণগত
মান সঠিক পাওয়া গেছে।’
ল্যাবে কার্যকর
হলেও মাঠপর্যায়ে কেন কাজ হয় না?’Ñ সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘মাঠ
পর্যায়ে কেন কাজ হয় না, এটাই এখন দেখার বিষয়। আমরা তদারকি বাড়াচ্ছি, ঠিকমতো ওষুধ দেওয়া
হচ্ছে কি না তা দেখছি। মশা দমনে আমরা অঞ্চলভিত্তিক কমিটিও গঠন করেছি। পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায়
জোর দেওয়া হচ্ছে।’
তবে ল্যাবের ফলাফল
মাঠে কার্যকর না হওয়ার পেছনে ভিন্ন মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কীটতত্ত্ববিদদের মতে, সিটি
করপোরেশনের কর্মীরা মাঠে কাজ করার সময় সঠিক নিয়ম মেনে চলছেন কি না তা তদারকি করা জরুরি।
ল্যাবে কার্যকর কীটনাশক মাঠে কেন কার্যকর হচ্ছে না, তার জন্য সিটি করপোরেশনের একটি
মনিটরিং ও ইভ্যালুয়েশন রিপোর্ট থাকা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘ল্যাবে যখন ম্যালাথিয়ন
বা টেমেফোস পরীক্ষা করা হয়, তখন এটি একটি বদ্ধ পরিবেশে করা হয়। তবে খোলা মাঠে বাতাসের
বেগ থাকে এবং জায়গা অনেক বড় হওয়ায় ফগিংয়ের মাধ্যমে ছড়ানো কীটনাশক বাতাসে মিশে যায়,
ফলে মশার ওপর সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারে না। অকার্যকর হওয়ার কারণে ফগিং পদ্ধতিটি বাদ
দেওয়াই উত্তম। লার্ভিসাইড বা টেমেফোস কার্যকর হতে পারে, তবে এর সফলতার জন্য চারটি বিষয়
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ-সঠিক মাত্রা, সঠিক সময়, সঠিক স্থান এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রয়োগ
নিশ্চিত করা। এগুলো না মানলে কীটনাশক কার্যকর হবে না।’
ল্যাবে পরীক্ষার
জন্য যে ওষুধের নমুনা পাঠানো হয়েছিল, ঠিক সেই ওষুধই যে মাঠে ছিটানো হচ্ছে, তা নিশ্চিত
করতে হবে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী । তিনি বলেন, ‘অনেক
সময় ল্যাবে পরীক্ষার জন্য দেওয়া উন্নত মানের নমুনাটি মাঠ পর্যায়ে সরবরাহকৃত ওষুধ থেকে
আলাদা বা নিম্নমানের হতে পারে। যার ফলে তা অকার্যকর হয়ে পড়ে। ল্যাবে পরীক্ষাটি কোন
ধরনের মশার ওপর করা হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি পরীক্ষাটি ল্যাবের নিজস্ব নিয়ন্ত্রিত
পরিবেশে পালিত মশার ওপর করা হয় এবং বাইরের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা মশার ওপর না
করা হয়, তবে ফলাফলে ভিন্নতা আসতে পারে। বাইরের মশা ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা
অর্জন করেছে কি না, সেটিও দেখার বিষয়।’
শুধু দক্ষিণ সিটি
করপোরেশন এলাকায় নয়, রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায়ও বেশ জ্বালাচ্ছে কিউলেক্স
মশা। এ প্রসঙ্গে মিরপুর-২-এর বাসিন্দা এসএম সায়েম বলেন, ‘সন্ধ্যা হলে মশার জ্বালায়
থাকা যায় না। প্রায়ই দেখি সিটি করপোরেশনের গাড়ি এসে ফগিং করে যায়। ধোঁয়া কয়েক মিনিট
থাকে, তারপর আবার আগের মতো মশা ফিরে আসে। ফগিং করলেই মশা আরও বেশি উৎপাদন করে। রাতে
মশারি না টানালে ঘুমানোই যায় না।’
কীটনাশক কেনার
আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলে দাবি করেছেন সংস্থাটির উপ-প্রধান
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইমদাদুল হক। তিনি বলেন, ‘মশা নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকগুলো
শতভাগ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরই ব্যবহার করা হয়। সিটি করপোরেশন
বছরে দুইবার এই কীটনাশক সংগ্রহ করে এবং প্রতিবার সংগ্রহের সময় যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে
এর গুণগত মান যাচাই করা হয়। বর্তমানে রুটিনমাফিক মশা নিধন কাজের পাশাপাশি কার্যক্রমকে
আরও জোরদার করা হয়েছে। প্রশাসন থেকে ৬০ দিনের একটি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
নগরবাসীর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মশা নিধন কার্যক্রমের সময় বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সন্ধ্যার
পর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, বিগত
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মশার ওষুধে ভেজাল ও কার্যকারিতা না থাকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা
ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণবিস্ফোরণের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সিটি করপোরেশনের
জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করলে নাগরিক সেবা সাময়িকভাবে ভেঙে পড়ে এবং মশার উৎপাত বাড়ে।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে নগর সেবা পুনরায় শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। রাজনৈতিক
প্রশাসক নিয়োগের পর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এখন মশা নিধনে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে।