ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬ ১২:৫২ পিএম
আগামী পহেলা বৈশাখ ‘কৃষক কার্ড’ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের প্রধান কর্মসংস্থান খাত কৃষি হলেও বরাবরই এই খাতটি অবহেলার শিকার। ক্রমবর্ধমান খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি প্রধান ভূমিকা রাখলেও এদিকে নজর দেওয়া হয় খুবই কম। কৃষক যখন অধিক ফসল ফলান তখন বাজারে পণ্যের দাম পড়ে যায়। আবার যখন বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, শৈত্যপ্রবাহ, তাপপ্রবাহসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হয় তখন কোনো ভর্তুকি পান না কৃষক। এমনকি সামান্য কয়েক হাজার টাকা কৃষিঋণের জন্য কৃষককে কোমরে রশি বেঁধে থানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও অহরহ। এ অবস্থা থেকে কৃষককে মুক্তি দিয়ে কৃষিকে লাভজনক ও রপ্তানিমুখী করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। এ লক্ষ্যে ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি যন্ত্রপাতি, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, মোবাইলে ফসলের চিকিৎসা সুবিধা, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, মোবাইলে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য, কৃষিবীমা সুবিধা ও কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধাসহ ১০টি সেবা নিয়ে সরকার চালু করতে যাচ্ছে স্মার্ট কৃষক কার্ড।
আগামী পহেলা বৈশাখ ‘কৃষক কার্ড’ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এদিন তিনি টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় কৃষকদের মধ্যে এই কার্ড বিতরণ করবেন। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রি-পাইলটিং প্রকল্পের আওতায় এই কার্ড বিতরণ করবে সরকার। মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কৃষক কার্ড প্রণয়ন সংক্রান্ত সেলের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্মার্ট কৃষক কার্ড বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম সভা করে কার্যক্রমটি শুরুর নির্দেশনা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, “এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি সরকারের সেবা পাবেন এবং কৃষি উপকরণ সংগ্রহে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে।” তিনি বলেন, “স্মার্ট কৃষক কার্ড চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নেওয়া হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রথম বৈঠক করেছেন। আমাদের অঙ্গীকার ছিল, ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষক কার্ড দেওয়া। সেই লক্ষ্যেই পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এর কাজ শুরু হতে যাচ্ছে।”
কৃষক কার্ডের ধারণা
কৃষক কার্ড প্রকৃতপক্ষে সরকারি কৃষিসেবাকে স্বচ্ছ, আধুনিক ও তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় কৃষকের কাছে সহজলভ্য করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের গৃহীত কৌশল। এটি হবে কৃষকের ডিজিটাল পরিচয়পত্র, কৃষি পেশার মর্যাদার প্রতীক সহজ, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য, সরকারি কৃষি সেবার নিশ্চয়তা, ক্লাইমেট স্মার্ট ও ফসল, মৎস্য ও প্রাণী খামারিদের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে এ কার্ড।
কেন এই কৃষক কার্ড
বিএনপি তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে কৃষিকে লাভজনক ও রপ্তানিমুখী এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করেছিল। তাদের কথা ছিলÑ বাংলাদেশের সনাতনী কৃষি ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতেই বর্তমান সরকারের পরিকল্পনায় নতুন কৌশল-কৃষক কার্ড। কেননা সরকার মনে করে- জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সম্মুখসারির যোদ্ধাদেরকে তথ্য প্রযুক্তিভিত্তিক আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সাথে সংযুক্ত করা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া দেশের ১৮ কোটি মানুষের মুখে যারা খাবার তুলে দেয় সেই কৃষকের উন্নয়নের জন্যও এটি একটি স্মার্ট কৌশল। কৃষক কার্ড প্রকৃতপক্ষে কোনো সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে নয় বরং কৃষকের ন্যায্য অধিকার আদায়ের চাবিকাঠি তাদের হাতে তুলে দেওয়ার অঙ্গীকার এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে সরকারি সেবা প্রাপ্তির পাশাপাশি কৃষক কার্ড কৃষকের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করবে। কৃষক কার্ডের সংরক্ষিত তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে সরকার জাতীয় কৃষি পরিকল্পনা প্রণয়নে সক্ষম হবে।
কৃষক কার্ডের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
স্মার্ট কৃষক কার্ড কেন এ ব্যাপারে তিনটি কেস স্টাডি হাজির করেছে নতুন সরকার। প্রথম কেস স্টাডিতে বলা হয়েছেÑ ডাল, তৈলবীজ ও চিনি আমদানি-নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে কৃষক কার্ড ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে সঠিক পরিসংখ্যান ও পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। দ্বিতীয় কেস স্টাডিতে বলা হয়েছেÑ কৃষক কার্ড ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত আলু, আম, প্রভৃতি উচ্চমূল্য ফসল দ্রুততার সাথে মাঠ থেকে সরাসরি রপ্তানির লক্ষ্যে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং তৃতীয় কেস স্টাডিতে বলা হয়েছেÑ প্রাথমিক পর্যায়ে ভূমিহীন কৃষকদের বসতবাড়িতে সবজি, মৌসুমি ফল, হাঁস-মুরগি ইত্যাদি পালনের জন্য কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সুপারভাইজড আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বাজেটে এই অর্থের সংস্থান হবে। এই বিনিয়োগ প্রকৃতপক্ষে বহুগুণে ভূমিহীন কৃষকের পারিবারিক অর্থনীতি এবং সমষ্টিকভাবে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। কেননা বসতবাড়িতে নিয়মিত সবজি উৎপাদন ও হাঁস-মুরগি পালন করলে কৃষক পরিবারের অতিরিক্ত আয় ৫ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে।
কৃষক কার্ড নিয়ে সরকারের প্রত্যাশা
কৃষক কার্ড চালু হলে কৃষি খাতে বেশকিছু অগ্রগতি সাধিত হবে বলে প্রত্যাশা করছে সরকার। সেসবের মধ্যে রয়েছেÑ ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের আয় বৃদ্ধি, কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন, দেশজ কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সামগ্রিক দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষক কার্ড ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে রিয়েল টাইম ডাটা ব্যবহার করেÑ কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনা। তা ছাড়া খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা পরিকল্পনা, দুর্যোগ মোকাবিলায় দ্রুততম সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রণয়ন এবং কৃষি পণ্য/উপকরণ আমদানি-রপ্তানি পরিকল্পনা গ্রহণ করা সহজ হবে।
বাস্তবায়ন কৌশল
কৃষক কার্ড ধারণাটি প্রকৃতপক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভিশন, যা পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের বৃহত্তম জাতীয় কর্মসূচিতে উত্তরণের লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে ৮টি ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপে কৃষক কার্ড কৃষকের শ্রেণিবিন্যাসকে (ভূমিহীন, প্রান্তিক, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় কৃষক) সামনে রেখে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে এবং অল্প সময়ের মধ্যে তা জাতীয় কর্মসূচিতে উত্তীর্ণ হবে। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে সবচেয়ে দরিদ্র ও অসহায় কৃষক অর্থাৎ ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক।
দ্বিতীয় ধাপে কৃষক কার্ড নীতিমালা ও বাস্তবায়ন গাইডলাইন চূড়ান্তকরণ। তৃতীয় ধাপে রয়েছেÑ অবকাঠামো-হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার তৈরি। চতুর্থ ধাপে রয়েছেÑ সাইবার সিকিউরিটি সুরক্ষাসহ ডাটা সেন্টার স্থাপন ও মোবাইল অ্যাপে কৃষক কার্ড সংযোগ। পঞ্চম ধাপেÑ শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী কৃষকের সঠিক পরিসংখ্যান প্রণয়ন। ষষ্ঠ ধাপে সীমিত আকারে পাইলটিং এবং তার ভিত্তিতে নির্ভুল অপারেশনাল গাইডলাইন তৈরি। সপ্তম ধাপে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ পুরুত্ব দিয়ে কৃষক কার্ড বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের কো-অর্ডিনেশন নিশ্চিত করা এবং অষ্টম ধাপে পর্যায়ক্রমে জারীয় কর্মসূচি হিসেবে বাস্তবায়ন করা।
কৃষক কার্ডের অবকাঠামো
কৃষক কার্ড ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। এজন্য ৬টি অবকাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। ১. হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার: নির্ভরযোগ্য, উন্নতমান এবং কার্যকর হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের ওপর ভিত্তি করে নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ সেবা প্রদানের লক্ষ্যে কৃষক কার্ড কর্মসূচি গড়ে তোলা হবে। ২. ডেটা সেন্টার: কৃষক কার্ডের জন্য সংগৃহীত তথ্য নির্ধারিত সরকারি ডেটা সেন্টারে নিরাপদে সংরক্ষণ করা হবে। ৩. সাইবার সিকিউরিটি: তথ্যের সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনার নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে সাতবার সিকিউরিটি জোরদার করা হবে। ৪. মোবাইল অ্যাপ সংযোগ: মোবাইল অ্যাপ অথবা এসএমএসের মাধ্যমে কৃষক কার্ড করা যাবে। ৫. অংশীদারত্ব: আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি সহায়তাকারী, এনজিও, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার মাধ্যমে কৃষক কার্ডের ব্যবহার সম্প্রসারিত করা। ৬. কল সেন্টার: কৃষকরা নির্ধারিত কল সেন্টারে বিনামূল্যে ফোন করে কৃষক কার্ডের সকল সেবা সম্পর্কে জানতে পারবে।
কারা সেবা পাবেন: স্মার্ট কৃষক কার্ডের মাধ্যে সেবা পাবেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, ভূমি, খাদ্য, আইসিটি, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, প্রাইভেট সেক্টর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান/ব্যাংক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এনজিও এবং মোবাইল অপারেটর এবং কৃষক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ভূমিহীন কৃষক আছে ৯১ লাখ, প্রান্তিক ৪২ লাখ, ক্ষুদ্র ১৯ লাখ ও মাঝারি ১৯ লাখ এবং বড় ২০ লাখসহ মোট ১ কোটি ৭৩ লাখ। প্রাথমিকভাবে কার্যক্রমটি দেশের ৮ বিভাগের ৮ জেলার ৮টি উপজেলায় পাইলটিং হিসেবে চালু হবে।
কৃষি কার্ড ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা
স্মার্ট কৃষক কার্ড নিয়ে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন-উর-রশীদ বলেন, “খুব দ্রুত কৃষক কার্ড চালু করা হবে। এতে কৃষকদের সঠিক ও হালনাগাদ তথ্যভান্ডার তৈরি হবে, যা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়ক হবে।” তিনি জানান, “মাঠপর্যায় থেকে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিভিন্ন অধিদপ্তর থেকে সঠিক তথ্য ও সুপারিশ পেলে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে।”