আরমান হেকিম ও কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬ ১২:৪৬ পিএম
আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬ ১৩:১২ পিএম
গ্রাফিক্স প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে দেশের অর্থনীতিতে মৌসুমি চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। পাশাপাশি পরিবহন, মোবাইল আর্থিক সেবা, ব্যাংকিং খাত এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহেও গতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঈদ কেন্দ্র করে প্রতিবছরই অর্থনীতিতে বড় অঙ্কের অতিরিক্ত লেনদেন যুক্ত হয়, যার প্রভাব পড়ে খুচরা বাজার থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে।
রাজধানীর বড় বিপণিবিতান ও মার্কেটগুলোতে
ইতোমধ্যে ঈদের কেনাকাটা জমে উঠেছে। নিউমার্কেট, গাউছিয়া, হাজারীবাগ লেদার মার্কেট,
গুলিস্তান, বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স, যমুনা ফিউচার পার্ক, মিরপুর ও উত্তরা এলাকার
বিভিন্ন মার্কেট ঘুরে দেখা যায়Ñ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ক্রেতাদের উপস্থিতি কয়েকগুণ
বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, ঈদের আগে শেষ দুই সপ্তাহই তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
সময়। বছরের মোট বিক্রির বড় অংশই এই সময়েই হয়ে থাকে।
ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, এবারের
ঈদবাজারে আড়াই লাখ কোটি থেকে পৌনে তিন লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হতে পারে। এর মধ্যে শুধু
পোশাকের বাজারেই লেনদেন হতে পারে ৮০ থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের
বাজারে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার মতো। এ ছাড়া ইলেকট্রনিকস
পণ্য, মিষ্টি, প্রসাধনী এবং বিভিন্ন উপহারসামগ্রীর বাজারেও বাড়তি লেনদেন হচ্ছে।
ঈদ কেন্দ্র করে বোনাস ও বিভিন্ন
উৎস থেকে আসা অর্থও বাজারে প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। দেশে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী
ঈদ বোনাস পেয়েছেন। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় দেড় কোটি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ
বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী মানুষের বোনাসও ঈদবাজারে যুক্ত হচ্ছে। এসব অর্থের বড় অংশই বাজারে
ব্যয় হচ্ছে।
এ ছাড়া জাকাত ও ফিতরা বাবদও বিপুল
অঙ্কের অর্থ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এবার জাকাত ও ফিতরা বাবদ
৪০ থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকা অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পারে। এই অর্থের একটি বড় অংশ নিম্ন
আয়ের মানুষের হাতে পৌঁছয়, যা তাদের ভোগব্যয় বাড়াতে সহায়তা করে।
যদিও ঈদ উৎসবের মোট অর্থনৈতিক প্রভাবের
সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব নেই, বিভিন্ন গবেষণা ও ব্যবসায়ী সংগঠনের সমীক্ষা থেকে একটি
ধারণা পাওয়া যায়। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি হেলাল
উদ্দিন কয়েক বছর আগে একটি সমীক্ষা করেন। সেই সমীক্ষায় দেখা যায়, রোজা ও ঈদ উপলক্ষে
অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। হিসাব অনুযায়ী,
পোশাকের বাজারে বাড়তি প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা, নিত্যপণ্যের বাজারে প্রায় ২৭ হাজার
কোটি এবং জাকাত ও ফিতরা বাবদ প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়। পাশাপাশি
পরিবহন খাতে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা এবং ভ্রমণ ও বিনোদন খাতে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা
ব্যয় হয়।
ঈদ সামনে রেখে পরিবহন খাতেও ব্যস্ততা
বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়ছে। বাস,
ট্রেন ও লঞ্চে যাত্রীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত ট্রিপ পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন
পরিবহন মালিকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের আগে ও পরে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিবহন খাতে
উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত আয় হয়।
মোবাইল আর্থিক সেবা খাতেও লেনদেন
বাড়তে শুরু করেছে। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো সেবাগুলোয় ঈদের আগে সাধারণ সময়ের তুলনায়
অনেক বেশি টাকা লেনদেন হয়। পরিবারকে কেনাকাটার টাকা পাঠানো, ঈদে দেওয়া কিংবা বিভিন্ন
বিল পরিশোধের কারণে এই সময় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ে। খাতসংশ্লিষ্টরা
জানান, ঈদের সময় অনেক ক্ষেত্রে দৈনিক লেনদেন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে
বৃদ্ধি পায়।
ব্যাংকিং খাতেও নগদ উত্তোলন ও লেনদেন
বাড়ছে। বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ঈদের আগে গ্রাহকরা বেশি পরিমাণ নগদ অর্থ
তুলছেন। এটিএম বুথগুলোতে লেনদেন বাড়ার পাশাপাশি ব্যাংকের শাখাগুলোতেও নগদ টাকার চাহিদা
বেড়েছে। এজন্য ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত নগদ সরবরাহের ব্যবস্থা করছে।
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও ঈদের আগে
ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান,
গত বছরের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে । চলতি মার্চের প্রথম
১৪ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২২০ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ১৬২ কোটি
ডলার। বছরের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
এরমধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৩৭ কোটি ২৪ লাখ ডলার।
পাশাপাশি বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে ২৭ কোটি ২৮ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন
প্রবাসীরা।
এদিকে মার্চের প্রথম ১৪ দিনে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে
রেমিট্যান্স এসেছে ১৫৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। এছাড়াও এ সময়ে বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর
মাধ্যমে দেশে ৪৫ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।
ঈদ কেন্দ্র করে প্রবাসীরা দেশে
থাকা আত্মীয়স্বজনদের কাছে বেশি পরিমাণ অর্থ পাঠাচ্ছেন বলেই এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে
বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোগ্যপণ্যের বাজারেও ঈদের প্রভাব
স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেমাই, চিনি, দুধ, মসলা, ফল ও মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের চাহিদা
বাড়ছে। পাইকারি ও খুচরা বাজারে এসব পণ্যের বিক্রি বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসায়ীদের লেনদেনও
বাড়ছে। বিশেষ করে ভোজ্য তেল, ডাল, ছোলা, খেজুর ও পেঁয়াজের চাহিদা এই সময় উল্লেখযোগ্য
হারে বেড়ে যায়। ফলে এসব পণ্যের আমদানিও বাড়ে।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, রোজা ও ঈদের
সময় ভোজ্য তেলের চাহিদা প্রায় আড়াই লাখ টন, চিনি সোয়া দুই লাখ থেকে পৌনে তিন লাখ টন,
ডাল প্রায় ৬০ হাজার টন, ছোলা প্রায় ৫০ হাজার টন এবং খেজুর প্রায় ১৩ হাজার টন। পেঁয়াজের
চাহিদা দাঁড়ায় সাড়ে তিন লাখ টনের কাছাকাছি। এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা নিজস্ব
অর্থের পাশাপাশি ব্যাংকঋণও ব্যবহার করেন।
জানতে চাইলে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ
ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী
বলেন, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদ। এই সময় পোশাক, খাদ্যপণ্য,
ভ্রমণ ও বিনোদনসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ে। এতে উৎপাদনকারী, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা
সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত গতি সৃষ্টি হয়। তবে বাজারে টাকার
প্রবাহ বাড়লে কিছু ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির চাপও তৈরি হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।