× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিলুপ্তপ্রায় মাছ

চাষে পাতে ফিরছে ‘মহাশোল’

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, ময়মনসিংহ থেকে ফিরে

প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬ ১০:৪৩ এএম

পাহাড়ি নদী-ঝরনার মাছ মহাশোল এখন বিলুপ্তপ্রায়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

পাহাড়ি নদী-ঝরনার মাছ মহাশোল এখন বিলুপ্তপ্রায়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মাছ বাঙালির খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশকে বলা হয় ‘মাছ ও ভাতের দেশ’। দেশের মিঠাপানির জলাশয়ে প্রায় ২৬১ প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪৩টি ছোট মাছ রয়েছে। এসব দেশীয় মাছ দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সহজলভ্য পুষ্টির উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

মলা, ঢেলা, পুঁটি, ট্যাংরা, পাবদা, খলিশা, শিং, মাগুর, কেচকি, চাঁদা কিংবা মহাশোলÑ প্রতিটি মাছই শুধু স্বাদের জন্য নয়, পুষ্টিগুণের কারণেও মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলাশয় সংকোচন, নদী দখল ইত্যাদি কারণে অনেক দেশীয় মাছ এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬৪ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তপ্রায়।এসব মাছের মধ্যে পাহাড়ি নদীর বিখ্যাত সোনালি মাছ মহাশোল অন্যতম।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) গবেষণা ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ফলে এখন এই বিলুপ্তপ্রায় মাছ আবার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে ফিরে আসছে মাছ চাষে।

পুষ্টি ও অর্থনীতিতে দেশীয় মাছের গুরুত্ব

বাংলাদেশে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হচ্ছে মাছ। এ ছাড়া মাছের মধ্যে থাকা ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন ও আয়োডিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং রক্তশূন্যতা, গলগণ্ড ও অন্ধত্বসহ নানা রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ অর্থবছরের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন প্রায় ৮৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণের পরিমাণ ৬০ গ্রাম থেকে বেড়ে প্রায় ৬৮ গ্রামে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২২’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুক্ত জলাশয়ের স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বে মোট স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশ আসে বাংলাদেশ থেকে। এই তালিকায় বাংলাদেশের আগে রয়েছে চীন ও ভারত। এই অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে নতুন নতুন মাছের প্রজাতি চাষের আওতায় আনা জরুরি। সেই সম্ভাবনাময় প্রজাতির একটি হলো মহাশোল মাছ।

পাহাড়ি নদীর সোনালি মাছ মহাশোলের পরিচয়

দক্ষিণ এশিয়ার উপমহাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় মাছ মহাশোলকে অনেক সময় ‘স্পোর্ট ফিশ’ বলা হয়। মহাশোল মাছের শরীর উজ্জ্বল সোনালি রঙের এবং আঁশ তুলনামূলক বড় ও শক্ত। পাখনা ও লেজ লালচে বর্ণের। নাকের সামনে ছোট দুটি গোঁফ রয়েছে, যা মাছটিকে অন্য মাছ থেকে আলাদা করে চেনায়। স্বাদের দিক থেকেও এটি মিঠাপানির অন্যতম সেরা মাছ হিসেবে বিবেচিত। 

প্রাপ্তবয়স্ক মহাশোল সাধারণত ৮ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত ওজনের হতে পারে এবং দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়। বাজারে এই মাছের দামও বেশ বেশি। প্রজাতি অনুযায়ী প্রতি কেজি ১৫০০ থেকে ৪০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে পারে।

কেন কমে গেল মহাশোল

একসময় বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলের নদী, ঝরনা ও হ্রদে এই মাছের প্রাচুর্য ছিল। ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সিলেট, দিনাজপুর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি খরস্রোতা নদীতে মহাশোল সহজেই পাওয়া যেত। বাংলাদেশে মহাশোলের তিনটি প্রজাতি পাওয়া গেলেও বর্তমানে এগুলোর সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাশোল মাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ পাহাড়ি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, নদীর উৎসমুখে বাঁধ বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, নদী শুকিয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত মাছ ধরা ও প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হয়ে যাওয়া। মহাশোল মূলত পাথর ও নুড়িপাথরযুক্ত পাহাড়ি নদীতে বাস করে। এসব পাথরের ওপর জন্মানো ‘পেরিফাইটন’ নামের শ্যাওলাই তাদের প্রধান খাদ্য। নদীর পরিবেশ পরিবর্তিত হলে এই খাদ্য উৎসও নষ্ট হয়ে যায়।

আরেকটি বড় সমস্যা হলোÑ এই মাছের ডিম ধারণক্ষমতা তুলনামূলক কম। ফলে প্রাকৃতিকভাবে দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে না। নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটি পাহাড়ি নদীতে এখনও কিছু মহাশোল পাওয়া যায়।

গবেষণায় নতুন সাফল্যে কৃত্রিম প্রজননে আশা

এই মাছকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে আসছে। গবেষণার মাধ্যমে ইতোমধ্যে মহাশোলের একটি প্রজাতির কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন এবং চাষ কৌশল উদ্ভাবনে সফলতা পাওয়া গেছে। গবেষকরা পাহাড়ি নদী থেকে কিছু পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে লালনপালন করেন এবং সেখান থেকে কৃত্রিম প্রজননের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। পরে উৎপাদিত পোনা দেশের বিভিন্ন নদী ও উন্মুক্ত জলাশয়ে অবমুক্ত করা হয়। এখন দেশের অনেক হ্যাচারি মালিক ও মাছচাষি মহাশোলের পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে চাষ করছেন।

পুকুরে মহাশোলের মিশ্র চাষ হচ্ছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্পজাতীয় মাছ যেমন কাতলা, রুই ও মৃগেলের সঙ্গে মিশ্র চাষে মহাশোল ভালো ফল দেয়। এতে পুকুরের বিভিন্ন স্তরের খাদ্য সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করা যায়। মিশ্র চাষে সাধারণত প্রতি হেক্টর পুকুরে-কাতলা ৩ হাজার, রুই ২ হাজার ২৫০টি, মৃগেল ১ হাজার ১২৫টি, সিলভার কার্প ১ হাজার ১২৫টি, মহাশোল প্রায় ৭ হাজার ৫০০টি পোনা ছাড়া হয়। সাধারণত ৮-১০ মাসের মধ্যে মহাশোলের ওজন ৬০০-৮০০ গ্রাম হয়ে যায়। সঠিক ব্যবস্থাপনায় প্রতি হেক্টর পুকুরে-কাতলা ২২০০-২৪০০ কেজি, রুই ১৫০০-১৭০০ কেজি, মৃগেল ৭০০-৭৫০ কেজি, মহাশোল ৬৫০-৭০০ কেজি মাছ উৎপাদন সম্ভব।

ভোক্তাদের সচেতন হওয়া জরুরি

মহাশোল মাছের দাম বেশি হওয়ায় বাজারে অনেক সময় গ্রাস কার্প বা ব্ল্যাক কার্প মাছকে মহাশোল বলে বিক্রি করা হয়। সাধারণ ক্রেতারা মাছ না চিনতে পারায় প্রতারিত হন। প্রধান মৎস্য বিজ্ঞানী ড. হারুন অর রশিদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মহাশোলের শরীর সোনালি বর্ণের এবং আঁশ বড় ও চকচকে। পাখনা ও লেজ লালচে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো দেখলে সহজেই মহাশোল চিনে নেওয়া যায়। গবেষণালব্ধ প্রযুক্তি সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে মহাশোল আবারও বাংলাদেশের জনপ্রিয় মাছ হয়ে উঠতে পারে।

দেশের নদী, হাওড়-বিল ও উন্মুক্ত জলাশয়ে পোনা অবমুক্ত করা, অভয়াশ্রম স্থাপন এবং পরিবেশবান্ধব মৎস্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বিলুপ্তপ্রায় অনেক মাছের মতো মহাশোলও নতুন করে ফিরে আসবে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পুষ্টির চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে মৎস্য খাতের অবদান আরও বাড়াতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর মাছ চাষের বিকল্প নেই। নতুন বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে টেকসই মৎস্য উৎপাদনের জন্য মহাশোল মাছ হতে পারে এক নতুন সম্ভাবনার নাম।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা