নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৫ এএম
জ্বালানি সংকটের ভয় দেখিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সুযোগসন্ধানী একটি চক্র। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জ্বালানি সংকটের ভয় দেখিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে সুযোগসন্ধানী একটি চক্র। ঈদ সামনে রেখে চক্রটি কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে এরই মধ্যে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সক্রিয়। এতে ঈদ শেষে ঢাকায় ফিরতি মানুষের যাত্রাতেও চরম দুর্ভোগে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, রেশনিং পদ্ধতি, বাসের ট্রিপ কমিয়ে দেওয়া এবং ভাড়া নৈরাজ্যের কারণে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সম্প্রতি এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারকে সতর্কও করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে সরকারকে আগাম পদক্ষেপ নেওয়ারও তাগিদ দিয়েছে বিশেষ ওই সংস্থাটি। এদিকে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন আমলে নিয়ে সে অনুযায়ী সরকারের তরফে কাজ শুরুর কথা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আর এই আশঙ্কা ঘিরেই দেশের পরিবহন খাতে তৈরি হয় অস্থিরতা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার জ্বালানি সরবরাহে রেশনিং পদ্ধতি চালু করে। প্রতিদিনই পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা দেয় যানবাহনের দীর্ঘ সারি। অভিযোগ রয়েছে, এ অবস্থায় অনেক বাস মালিক তাদের নির্ধারিত ট্রিপ কমিয়ে দেন, কেউ কেউ আগাম টিকিট বিক্রিও সীমিত করেন। ফলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষ কোনোভাবে যাত্রা করতে পারলেও ঈদের পর তাদের ঢাকায় ফেরা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে কিছু চক্র কৃত্রিম জ্বালানি সংকট তৈরির মাধ্যমে বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এতে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, পরিবহন সংকট এবং ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্যের ঝুঁকি রয়েছে। এসব পরিস্থিতি তৈরি হলে তা শুধু যাত্রীদের দুর্ভোগই বাড়বে না, সরকারের ওপরও চাপ তৈরি করবে।
জানা যায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গোয়েন্দা পরামর্শ অনুযায়ী সরকার গত রবিবার থেকে জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং বা পরিমাণের সীমাবদ্ধতা তুলে নেয়। যদিও অনেক পাম্পেই এখনও তেল সংকট ও ভোগান্তি পুরোপুরি কমেনি। জানা গেছে, গতকাল সোমবার ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অধিকাংশ পাম্পেই চাহিদামাফিক তেল মেলেনি। পাম্প মালিকরা বলছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় চাহিদামতো জ্বালানি দেওয়া যাচ্ছে না। তারা আরও বলছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রেশনিং পদ্ধতি বন্ধ করা ঠিক হবে না।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ফিরতি যাত্রায় পাম্প মালিকদের জ্বালানি সরবরাহ ছাড়াও নানা অজুহাতে সংকট সৃষ্টির পাঁয়তারা ঠেকাতে সকল পুলিশ সুপারদের নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সদর দপ্তর থেকেও বিষয়টি মনিটরিং করা হচ্ছে। জানা যায় জ্বালানি সংকট, ভাড়া নৈরাজ্যসহ সব বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকবে জেলা পুলিশ। সূত্রটি বলছে, ফিরতি যাত্রায় ভোগান্তি এড়াতে জেলা পুলিশের পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, কমিউনিটি পুলিশও কাজ করছে।
এদিকে ঈদ-পরবর্তী ফিরতি যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বিকল্প ব্যবস্থার ওপরও জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গোয়েন্দারা। তারা বিদ্যুৎ চালিত ইজিবাইক, এলপিজি গ্যাসচালিত পরিবহন, নৌপথ এবং রেলপথের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জ্বালানি সংকট যতটা না বড় সমস্যা, তার চেয়েও বড় সংকট হলো পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাব। অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত সামাল দেওয়ার মতো পরিবহন অবকাঠামো দেশে এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে ঈদ এলেই পরিবহন খাতে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং এর সুযোগ নেয় অসাধু চক্র।
এদিকে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আশ্বাস অনুযায়ী রবিবার থেকে পাবলিক পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। তেলের দাম বাড়ানো হবে না এবং সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে আদায় করা যাবে না।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যেই যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। সংকট কেবল ফিরতি যাত্রায় দেখা দেবেÑ বিষয়টি এমনও নয়, বরং এর লক্ষণ এখনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।’
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘অনেক বাস ঢাকা থেকে কুমিল্লা পৌঁছে আবার জ্বালানি নিতে বাধ্য হচ্ছে। এরপর ফেনীতে গিয়ে আবার তেল নিতে হচ্ছে। এতে যাত্রা দীর্ঘ হচ্ছে এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।’ এর প্রভাব নিত্যপণ্যের পরিবহনেও পড়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে ঈদের ফিরতি যাত্রায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। অনেক রুটে বাস পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে এবং ট্রিপ কমে যাওয়ায় ভাড়া কয়েকগুণ পর্যন্ত বাড়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে শুধু জ্বালানি সরবরাহ বাড়ালেই হবে না। ট্রেন ও নৌপথে অতিরিক্ত সার্ভিস চালু করা, বিশেষ ট্রেন পরিচালনা, নদীপথে লঞ্চ ও ফেরির সংখ্যা বাড়ানো এবং সড়কে বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে। পাশাপাশি ভাড়া নৈরাজ্য ঠেকাতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এখনই সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।