মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০২৬ ১২:০৬ পিএম
যানজট এড়াতে গাড়িতে ভরার ডিজেল পাম্প থেকে বিভিন্ন পাত্রে নেওয়া হচ্ছে । ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সরকার গত রবিবার থেকে তেলের রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নিলেও সংকট পিছু ছাড়ছে না। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তেল সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত তেলের অভাবে ঢাকার প্রধান বাস টার্মিনালগুলো থেকে শিডিউল অনুযায়ী বাস ছাড়ছে নাÑ এমনকি কয়েকটি পরিবহন কোম্পানির বাস চলাচল বন্ধ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে আসন্ন ঈদযাত্রায় ফের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন গত রবিবার গাবতলী বাস টার্মিনালে
গিয়ে জানা যায়, সকাল থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত উত্তরবঙ্গগামী গ্রামীণ ট্রাভেলসের একটি
বাসও ঢাকা ছাড়তে পারেনি। কাউন্টার সহকারী টিপু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, গত শনিবার
রাতে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় তাদের কোনো গাড়ি টার্মিনাল থেকে বের হয়নি। কারণ জানতে
চাইলে তিনি বলেন, পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় তেল দেওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে।
সুপার সনি পরিবহন কাউন্টারের সহকারী
ম্যানেজার জানান, গত শনিবার তেল সংকটে ৩টি গাড়ি ঢাকা ছাড়তে পারেনি। আর গতকাল দুপুর
২টা পর্যন্ত তাদের ১টা গাড়ি টার্মিনাল ছাড়তে পারেনি। তিনি বলেন, ‘পরিবহন সেক্টরে গত
২৫ বছরের কর্মজীবনে তেলের এমন সংকট দেখিনি।’ ঈদযাত্রায় অনিশ্চয়তার আশঙ্কা করছেন তিনি।
শ্যামলী পরিবহনের গাবতলীর একজন
কাউন্টার সহকারী জানান, চাহিদামতো তেল না পাওয়ায় তাদের ১২টি বাসের গত রবিবার শিডিউল
বিপর্যয় ঘটেছে। এতে যাত্রীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি। গাবতলীর একাধিক
কাউন্টার সহকারী নাম না প্রকাশ করার শর্তে এই প্রতিবেদককে জানান, তেলের সংকট কৃত্রিম
হতে পারে। এছাড়া তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের কারসাজি বলে সন্দেহ করছেন
তারা।
মহাখালী
সিএম পাম্পের হিসাবরক্ষক জাহাঙ্গীর
জানান, তাদের পাম্পে ৭০ হাজার লিটার তেল দরকার প্রতিদিন। কিন্তু ডিপো থেকে পাচ্ছেন
চাহিদার অর্ধেক। গতকাল সোমবার ৩৯ লিটার তেল পেয়েছেন। রেশনিং তুলে দেওয়ার পর ঘাটতি থেকেই
যাচ্ছে। মহাখালী স্বাধীন বাংলা পেট্রোল পাম্পের ব্যবস্থাপক তাপস বিশ্বাস জানান, সরকার
রেশনিং তুলে দেওয়ার পরও তেল সংকটের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ডিপো থেকে চাহিদার অর্ধেক পাচ্ছেন
তারা। গত ১৫ দিনে এমনও দিন গেছে যে, এ পাম্পে ৭ দিন রিজার্ভার প্রায় খালি ছিল। গত ১৫
মার্চ সর্বশেষ ২২৫০ লিটার তেল দিয়েছে ডিপো থেকে। ঈযাত্রায় গণপরিবহনে চলাচল নির্বিঘ্ন
রাখতে রাজধানীর ৩টি প্রধান টার্মিনালে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা উচিত বলে জানান তিনি।
গতকাল
মহাখালী বাস টার্মিনালে একতা পরিবহনের
সুপারভাইজার ইয়ামিন জানান, তাদের একটি দ্বিতল বাসের জন্য সোমবার সকাল ৭টায় সিরিয়াল
দিয়েছেন। তেল পেয়েছেন দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে। তেল সংগ্রহের এই দীর্ঘ বিলম্বের ফলে তার
মতো প্রায় সকল পরিবহন কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজশাহীগামী একতা পরিবহনের আরেকটি
বাসের চালক জামিরুল। তিনি জানান, সকাল ৭টায় সিরিয়াল দিয়ে বেলা ৩টার দিকে তেল পেয়েছেন।
মহাখালী বাস টার্মিনালে ঢুকতেই
সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের দপ্তরে কথা হয় কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে। সংগঠনের সহসাধারণ
সম্পাদক মোতালেব জানান, টাঙ্গাইলগামী ৩৫টি বাসের মধ্যে ১৭টি গতকাল বিকাল পর্যন্ত তেল
পায়নি। টার্মিনালে কাজী পরিবহনের সহকারী জানান, তেল সংকটের কারণে তাদের ট্রিপ অর্ধেকে
নেমেছে। অনন্যা ক্লাসিক পরিবহনের কাউন্টার থেকে জানানো হয়, তাদের ৬২টি গাড়ির মধ্যে
তেল সংকটে ৪৫টি গতকাল পর্যন্ত চলাচল করতে পারেনি। বৈশাখী পরিবহনের সহকারী জানান, তাদের
৯টা গাড়ির মধ্যে ৫টা বন্ধ। রাজিব পরিবহনের সুপার ভাইজার নুরুল ইসাল জানান, গতকাল সকালে
৫০ লিটার তেল দিয়ে গাড়ি পাঠিয়েছি মাদারগঞ্জে, ফিরে আসার তেল না পেলে গাড়ি জামালপুরেই
বন্ধ করে রাখতে বলেছি।
মহাখালী বাস টার্মিনালের বিপরীত
পাশে অবস্থিত রয়্যাল ফিলিং স্টেশন তেল সংকটের কারণে গতকাল দুপুর ২টা থেকে বন্ধ করে
দেওয়া হয়েছে। ক্যাশিয়ার ফাহিম বলেন ‘এতদিন চাহিদার (৭ হাজার লিটার) অর্ধেক পেতাম, আজ
থেকে তাও পাচ্ছি না।’
চলমান তেল সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে
মহাখালী বাস টার্মিনালের সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বিষয়টি অস্বীকার
করে বলেন, আপাতত সংকট নেই। পাম্প কর্মচারী ও অন্যান্য পরিবহন মালিকদের উদ্বেগের কথা
জানালে তিনি কিছুটা সুর পাল্টে বলেন, তেল সংকট থাকবে না। তবে বৈশ্বিক তেলের সংকটে দাম
না বাড়ানোর কারণে সরকারকে ধন্যবাদ দেন তিনি।
পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক
সাইফুল আলম গত রবিবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গত শনিবার সড়ক ও যোগাযোগমন্ত্রী
আশ্বস্ত করেছিলেন, রেশনিং তুলে দিলে তেল সংকট থাকবে না। তবে পরিবহনের বিড়ম্বনা এখনও
কাটেনি। বিষয়টি নিয়ে আমাদের উদ্বেগ কাজ করছে। তবে সরকারের ওপর ভরসা রাখতে চাই।