দীপক দেব
প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩৩ এএম
জাতীয় সংসদে রবিবার অনির্ধারিত আলোচনায় সংস্কার পরিষদ নিয়ে এই বিতর্ক হয়।
আশঙ্কা ছিল জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ আহ্বান নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠবে সংসদ অধিবেশন। ঠিক সেরকম না হলেও তা নিয়ে সংসদে বেশ বিতর্ক হয়েছে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রথম অধিবেশন এখনও না ডাকায় জাতীয় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানে এ ধরনের পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রীও রাষ্ট্রপতিকে এ বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারেন না, রাষ্ট্রপতিও অধিবেশন ডাকতে পারেন না। বিরোধীদলীয় নেতাকে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। গতকাল রবিবার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় সংস্কার পরিষদ নিয়ে এই বিতর্ক হয়।
অন্যদিকে বিষয়টিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না দিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, নোটিস পেলে তিনি সিদ্ধান্ত জানাবেন।
এই অবস্থায় জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট তাদের রাজপথে আন্দোলনের পূর্বঘোষিত হুঁশিয়ারি অনুযায়ী কোনো পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ওই আদেশের ওপর ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট হয়। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে, সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার জন্য বেঁধে দেওয়া ৩০ দিন সময়সীমার শেষ দিন ছিল গতকাল রবিবার। এই আদেশে আরও বলা হয়েছে, সংসদ অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হবেন। নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তিদের একই দিনে এমপি ও পরিষদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা থাকলেও বিএনপি ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। সংবিধানে এ বিষয়ে কিছু না থাকার যুক্তিতে তারা তখন শপথ গ্রহণ করেননি।
এরপর থেকেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ আহ্বান নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। যার ধারাবাহিকতায় গতকাল বিরোধী দলের জোট থেকে আন্দোলনের হুঁশিয়ারির পরও সরকারি দল এই পরিষদ গঠনের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এই অবস্থায় আন্দোলনে নামা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকছে না বিরোধী দলের সামনে। তবে শুরুতেই কঠোর কর্মসূচি না দিয়ে ধাপে ধাপে সংসদ ও রাজপথ দুই ফ্রন্টেই কর্মসূচি পালন করার পরিকল্পনা করছে ১১-দলীয় জোট।
সরকারি ও বিরোধী দলের বিতর্ক
গতকাল রবিবার বেলা ১১টায় সংসদ অধিবেশনের শুরুতেই অনির্ধারিত আলোচনার জন্য দাঁড়ান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে বিরোধীদলীয় নেতাকে সুযোগ দেওয়া হবে। প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে শফিকুর রহমানকে মাইক দেন স্পিকার।
এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদ স্বাভাবিকভাবে তার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আসেনি। এটি রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এসেছে। এটি জারি করা হয়েছে ১৩ নভেম্বর ২০২৫।”
এ সময় সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের পুরোটাই পড়ে শোনান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, “এই আদেশ অনুযায়ী নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে এই অধিবেশন ডাকা হয়নি। আমার উদ্বেগের বিষয়টি এখানেই।”
শফিকুর রহমান বলেন, এবারের সংসদ সদস্যরা দুটি আলাদা ভোটের মাধ্যমে দুটি ‘ক্যাপাসিটিতে’ নির্বাচিত হয়েছেন। জুলাই আদেশ অনুযায়ী বিরোধী দলের ৭৭ জন সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এ আদেশ অনুসারে তারা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতে চান।
বিরোধীদলীয় নেতার এ বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, তিনি সরকারি দল থেকে বক্তব্য আশা করছেন।
এরপর সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “সংসদের অধিবেশন না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। কিন্তু সংবিধানের ধারা পরিবর্তন হবে বা সংবিধান পরিবর্তন হবে, এ রকম কোনো বিষয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে আসতে পারে না। সেটা জায়েজ নয়।”
তিনি বলেন, “কিন্তু এই যে আদেশ (জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ), এই আদেশটা না অধ্যাদেশ, না আইন। মাঝামাঝি জিনিস, সেদিন আমি বলেছিলাম, এটা হয়তো নিউট্রাল জেন্ডার হতে পারে।”
এই আদেশটিকে ‘আরোপিত’ আদেশ উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রীও সে বিষয়ে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও সেই অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন না বিধায় তা করেননি।”
তিনি বলেন, “এখন যদি বিরোধী দলের প্রশ্ন অনুসারে রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশটা সাংবিধানিক হয়, সেটা নিয়ে এখানে আলোচনা হতে পারে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশÑ এইটা এবং গণভোট অধ্যাদেশের নির্দিষ্ট অংশ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না মর্মে আদালত রুল জারি করেছেন। এখানে হয়তো বিচার বিভাগ মতামত দেবেন। কিন্তু তাদের মতামত এই সার্বভৌম সংসদের ওপর কখনও বাইন্ডিং (বাধ্যতামূলক) না। কিন্তু সার্বভৌম সংসদ আবার এমন কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না, যেটা জুডিশিয়ারিতে গিয়ে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাবে বা ভায়োলেশন অব কনস্টিটিউশন হয়ে যাবে। সুতরাং উভয়দিকে লক্ষ রেখে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আইনানুগভাবে এবং সাংবিধানিকভাবে যেতে হবে।”
গণভোটের চারটি প্রশ্নের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “একটা জবরদস্তিমূলক আরোপিত আদেশ করে সেই আদেশের একটা প্রশ্ন গণভোটের মধ্যে দেওয়া হয়। চারটা প্রশ্ন হলেও মানুষ কোন প্রশ্নে হ্যাঁ আর কোন প্রশ্নে না বলবেÑ সে বিকল্প ছিল না।”
তিনি বলেন, “তারপরও গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, সংবিধানে আগে সংস্কার আসতে হবে।”
তিনি বলেন, “এই অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল আনা যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ ১৩৩টা অধ্যাদেশ এখানে উত্থাপিত হয়েছে প্রথম দিনে।” তিনি বলেন, “কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে যদি সিদ্ধান্ত হয়, সংসদ যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বাজেট অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল উত্থাপন হতে পারে।”
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই প্রস্তাবের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “আমরা এটাকে কার্য উপদেষ্টা কমিটির বিষয় মনে করি না। এটি সরাসরি সংসদের বিষয়। আমরা চাই সংসদেই এর চূড়ান্ত সমাধান হোক।”
রাজপথে ছড়াতে পারে উত্তাপ
এদিকে সরকার সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করায় জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট পূর্বঘোষিত হুঁশিয়ারি অনুযায়ী আন্দোলনে নামার চিন্তা করছে। জোট সূত্র জানাচ্ছে, সরকারি দল বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিরোধীরা সংসদে সুবিধা করতে পারবে নাÑ এটা ধরে নিয়েই রাজপথে আন্দোলনের কথা বলা হয়েছে। তবে আগামী ২১ মার্চ ঈদের কথা বিবেচনায় নিয়ে ২৮ মার্চ জোট শরিকদের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করার পর কর্মসূচি ঘোষণা বা আন্দোলনে যাওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। ঈদের ছুটির পর ২৯ মার্চ বেলা ৩টায় আবারও সংসদ অধিবেশন বসবে। তাই আগের দিন কর্মসূচি ঠিক করা হবে। শুরুতে সংসদে এমপিদের প্রতিবাদ, রাজপথে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি দেওয়া হবে। ধাপে ধাপে কঠোর থেকে কঠোরতর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “স্পিকারের অনুরোধ অনুযায়ী আমরা নিয়ম অনুযায়ী নোটিস দেব। আমরা আন্তরিকভাবেই চাই এই সমস্যার সমাধান সংসদের ভেতরেই হোক। কিন্তু কোনো কারণে যদি সংসদের ভেতরে স্বাভাবিক সমাধান না পাওয়া যায়, তবে বাধ্য হয়ে আমাদের রাজপথে আন্দোলনে যেতে হবে। যদিও আমরা তা চাই না।”
তিনি বলেন, “যেহেতু বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে এবং স্পিকার নোটিস দিতে বলেছেন, তাই সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।”