হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৮ এএম
অমর একুশে বইমেলায় শনিবার একটি স্টলে পছন্দের বই দেখছেন দর্শনার্থীরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
অবশেষে শেষ হতে চলেছে নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এবারের প্রাণের মেলাÑ বইমেলা। আজ রবিবার রাত ৯টা বাজলেই শেষ হবে এবারের ১৮ দিনব্যাপী বইয়ের মেলা। মেলায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টজন বলছেন, গত ১৭ দিনে তাদের প্রাপ্তি যেমন আছে, তেমনি রয়েছে অপ্রাপ্তিও। আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি স্টল ভাড়া মওকুফ ছাড়াও স্টলের পরিধিসহ নানা ইস্যুতে ছাড় দিয়ে মেলা জমাবার চেষ্টা করেছে। আজ না হোক, আগামীকাল নিশ্চয়ই মেলা জমবেÑ এমন প্রত্যাশা করলেও শেষ পর্যন্ত তা আর জমে ওঠেনি।
তবে রমজান মাসে অনুষ্ঠিত বইমেলায় আর্থিক ক্ষতি হলেও ৬টি শিশু প্রহর, আলোচনা, শিশুদের গান, আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে সফলতা দেখছে বাংলা একাডেমি। তাদের ভাষ্য, জাতীয় নির্বাচন, নতুন সরকার গঠনসহ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অমর একুশে বইমেলা যে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পেরেছে, এটিই বড় সফলতা।
এদিকে আশানুরূপ ক্রেতা না পাওয়ায় হতাশা দেখা দিয়েছে প্রকাশকদের মধ্যে। উপরন্তু গত শুক্রবার রাতের বৃষ্টিতে অন্তত পঞ্চাশটির বেশি স্টলের বই ভিজে গেছে। এ অবস্থায় আগামীবার মেলা করবেন কি না, তা নিয়েও এখন থেকেই ভাবছেন প্রকাশকরা। এ বিষয়সহ এবারের মেলার সার্বিক বিষয় নিয়ে গতকাল বিকালে বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান হলে প্রকাশক ঐক্য এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
এতে লিখিত বক্তব্যে ইউপিএল-এর প্রকাশক মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ৬০ শতাংশ বই বিক্রি কমেছিল এবং ২০২৬ সালের অমর একুশে বইমেলায় বই বিক্রি গত বছরের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, রমজান মাসে মেলা আয়োজন এবং পাঠক উপস্থিতি কম থাকার কারণে এবারের মেলায় অধিকাংশ প্রকাশক বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে অন্যান্য স্বাভাবিক বছরের তুলনায় এবারের বই বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ কমেছে। অংশগ্রহণকারী প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশকের স্টল নির্মাণের প্রাথমিক খরচটুকুও ওঠেনি। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রকাশকের স্টলে পাঁচ হাজার টাকার বইও বিক্রি হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলা হয়, প্রকাশকদের স্টল ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। একই সঙ্গে বাংলা একাডেমির প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। যদিও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ ইউনিটের বেশি স্টল দেওয়ায় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়। তবে প্রকাশক ঐক্যের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্যাভিলিয়ন প্রথা বাতিল করায় বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানানো হয়।
এ অবস্থায় প্রকাশনা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি জানিয়েছে প্রকাশক ঐক্য। এর মধ্যে রয়েছেÑ সরকারিভাবে প্রতিটি অংশগ্রহণকারী প্রকাশকের অন্তত একটি করে মানসম্পন্ন বইয়ের ৩০০ থেকে ৫০০ কপি কেনা, প্রকাশনা খাতের জন্য সরকারি বই কেনার বাজেট বাড়ানো এবং প্রকাশনা-সম্পর্কিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অনন্যা প্রকাশনীর প্রকাশক মনিরুল হক, অনুপম প্রকাশনীর মিলন কান্তি নাথ, আদর্শ প্রকাশনীর মাহবুবুর রহমান এবং অ্যাডর্ন পাবলিকেশনের সৈয়দ জাকির হোসাইনসহ প্রকাশক ঐক্যের নেতারা।
এদিকে, গতকাল মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছেÑ বহু স্টলের সামনে বৃষ্টিতে ভেজা বই বিছিয়ে রাখা হয়েছে। বইউদ্যান, বিদ্যাপ্রকাশ, চন্দ্রাবতী, ইন্তামিন প্রকাশনী, প্রসিদ্ধ পাবলিশার্স, অন্বেষা প্রকাশন, উড়কি, আদর্শ, টাঙ্গন, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, বুনন, নাগরী, প্রতিভা প্রকাশ, চারুলিপি, শাপলা প্রকাশ, পুথিনিলয়, বিজ্ঞান একাডেমি, স্বপ্ন ৭১, অমর প্রকাশনী, মুক্তধারাসহ বেশ কিছু প্রকাশনা সংস্থার বই ভিজে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পুথিনিলয় ও বিজ্ঞান একাডেমি। ঝড়োবাতাসের সঙ্গে বৃষ্টি বিজ্ঞান একাডেমির স্টলের ছাউনি ভেঙে পড়েছে এবং প্রায় সব বই ভিজে গেছে। আর পুথিনিলয়ের স্টলে রাখা ৭০ শতাংশের মতো বই ভিজে নষ্ট হয়েছে।
বিজ্ঞান একাডেমির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, শনিবার রাতে ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে মুষলধারের বৃষ্টিতে এই বইগুলো ভিজে গেছে। আমাদের স্টলের ছাউনি ভেঙে পড়েছে। এখন ভেজা বই শুকাচ্ছি। আর বিক্রির জন্য নতুন করে বই নিয়ে এসেছি; সেগুলো স্টলে সাজিয়ে রেখেছি।
পুথিনিলয়ের স্টল ম্যানেজার জিসান ফেরদৌসী জানান, তাদের স্টলে থাকা বইয়ের মধ্যে ৭০ শতাংশ বই ভিজে নষ্ট হয়েছে, যা একেবারেই বিক্রির অযোগ্য। এমনিতেই এবারের বইমেলায় তেমন বিক্রি নেই; তার ওপরে এই ক্ষতি আমাদের প্রকাশনার জন্য বড় ধাক্কা।
এর আগে শনিবার সকালে মেলার শেষ শিশু প্রহরে বেলা ১১টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় কবিতা আবৃত্তি। কবিতাপাঠে অংশ নেন প্রায় ৩০ জন কবি ও আবৃত্তিশিল্পী এবং ২টি আবৃত্তি সংগঠন (এনামুল হক জুয়েলের পরিচালনায় জাতীয় আবৃত্তি পরিষদ এবং মো. রবিউল আলম রবির পরিচালনায় শিশুনন্দন)। শিশু-কিশোর ও তাদের অভিভাবকরা এই আয়োজন উপভোগ করেন। এ ছাড়া মেলার অন্য প্রাঙ্গণ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিশুরা বিগত শিশু প্রহরের মতোই পুতুল নাচ, বায়োস্কোপ ও শিশুতোষ বই সংগ্রহের মধ্য দিয়ে মেলা প্রাঙ্গণকে আনন্দমুখর করে রেখেছিল।
এরপর বেলা ৩টায় একই মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জন্মশতবর্ষ : মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মোরশেদ শফিউল হাসান। আলোচনায় অংশ নেন মমতাজ জাহান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। পরে অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন কবি জাকির আবু জাফর, কথাসাহিত্যিক-অনুবাদক শাকির সবুর, প্রবন্ধিক রাজীব সরকার এবং গবেষক খান মাহবুব।
গুণিজন স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬ ঘোষণা : ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কথাপ্রকাশকে বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার-২০২৬ দেওয়া হবে। বাংলা একাডেমি পরিচালিত মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার পাবে ঐতিহ্য। এ ছাড়া রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার পাবে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার পাবে সহজ প্রকাশ। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার পাবে ক্রিয়েটিভ ঢাকা পাবলিকেশন্স, মাত্রা প্রকাশ ও বেঙ্গলবুকস। আজ রবিবার মেলামঞ্চে এসব পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।
আজকের বইমেলা
আজ বইমেলার সমাপনী দিনে মেলা শুরু হবে দুপুর ২টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। বেলা ৩টায় সমাপনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এর সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। প্রধান অতিথি থাকবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেবেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পাওয়া পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে পুরস্কার প্রদান করা হবে।