নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬ ০৮:২১ এএম
মহাসড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় তৎপর হাইওয়ে পুলিশ। ফাইল ফটো
গত বছর ঈদযাত্রার শুরুতেই সড়ক-মহাসড়কে একের পর এক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। সে অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে হাইওয়ে পুলিশ এবার রমজানের শুরু থেকেই ডাকাতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে। ইতোমধ্যে জোরদার করা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ও টহল ব্যবস্থা। হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, চিহ্নিত সব স্পটে টহল জোরদারের পাশাপাশি গঠন করা হয়েছে কুইক রেসপন্স টিম। কেন্দ্রীয়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলোতে বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং বাড়ানো হয়েছে ড্রোন নজরদারিও। একই সঙ্গে সড়কে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বরদাশত করা হবে না বলেও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলছেন, এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক-মহাসড়কে ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ সকল অনিয়ম-অপরাধের বিরুদ্ধে অল আউট অ্যাকশন অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
এদিকে হাইওয়ে পুলিশের কঠোর নজরদারির কারণে এখন পর্যন্ত দেশের কোথাও ডাকাতির কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে সংস্থাটি প্রতিবারের মতো এবারও ঈদযাত্রা সামনে রেখে দেশের সড়ক-মহাসড়কে কড়া নজরদারিতে নেমেছে। দুর্ঘটনা ও যানজট ঠেকাতে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে ২৮৫টি দুর্ঘটনাপ্রবণ ‘ব্ল্যাকস্পট’ এবং ২০৭টি সম্ভাব্য যানজট স্পট। পাশাপাশি পরিবহন খাতে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি ঠেকাতেও নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা।
গতকাল শুক্রবার রাতে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (অ্যাডমিন) ইমতিয়াজ আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা ও যানজট নিয়ন্ত্রণে আগেভাগেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সড়কের সার্বিক পরিস্থিতি সিসিটিভি ও ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সড়ক-মহাসড়কে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি রোধেও কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ।’
হাইওয়ে পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) মুনতাসিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এবারের ঈদযাত্রায় দেশের ২৮৫টি দুর্ঘটনাপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোকে ‘ব্ল্যাকস্পট’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮৭টি ব্ল্যাকস্পট রয়েছে কুমিল্লা অঞ্চলে। এ ছাড়া গাজীপুর অঞ্চলে ৭১টি, মাদারীপুরে ৩৫টি, বগুড়ায় ৩০টি, সিলেটে ২০টি, খুলনায় ১৮টি, ময়মনসিংহে ১৬টি এবং রংপুর অঞ্চলে ৮টি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে।’
এদিকে দুর্ঘটনার পাশাপাশি যানজট এড়াতেও চিহ্নিত করা হয়েছে ২০৭টি স্পট। এর মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে রয়েছে সর্বোচ্চ ৫৫টি স্পট। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪৫টি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ৪৩টি, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ২১টি, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ১৪টি, ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে ১৪টি, যশোর-খুলনা মহাসড়কে ৬টি এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে ৯টি যানজটপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।
অতিরিক্ত যানবাহন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে এসব এলাকায় দুর্ঘটনা ও যানজটের ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে এবারের ঈদযাত্রায় এসব ঝুঁকি কমাতে আগে থেকেই নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে জানিয়ে হাইওয়ে পুলিশের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও চাঁদাবাজি বন্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন কোনোভাবেই সড়কে নামতে দেওয়া হবে না এবং অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে থাকবে পুলিশ।’
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, প্রতি ঈদের আগেই হাইওয়ে পুলিশ যানজটপ্রবণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে। গত ঈদুল ফিতরে এমন স্থানের সংখ্যা ছিল ১৫৯টি। আগের ঈদের তুলনায় এবার ৪৮টি স্থান বেড়েছে। সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকেও ঈদের আগে-পরে এসব স্থানে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এবারের ঈদে প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়বে বলে জানিয়ে সড়ক ও যোগাযোগমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘যাত্রীর এই চাপ সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, হাইওয়ে পুলিশ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত সড়কে নজরদারি জোরদার করবে। যেসব যানবাহন চলাচলের অযোগ্য বা বিকল হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলো সড়কে চলতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে চলমান সড়ক মেরামতের কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (অ্যাডমিন) ইমতিয়াজ আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এবার ঈদে ২০৭টি স্পটে যানজটের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি স্পটে উন্নয়ন কাজ চলছে।’ ৪৯টি স্পটে হাট-বাজার বসে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এসব জায়গায় জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্রামপুলিশ, বাজার কমিটি বা কমিউনিটি পুলিশের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে, যাতে সড়কের ওপর হাট-বাজার না বসে।’
গত রমজানে মহাসড়কে বেশ কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল উল্লেখ করে ডিআইজি ইমতিয়াজ বলেন, ‘গত বছর রমজানের প্রথম সপ্তাহেই ৪০-৪৫টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল। তবে এবার এখন পর্যন্ত কোনো ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। রমজানের আগেই আমরা নিরাপত্তা জোরদার করেছি এবং পুলিশ সদর দপ্তর থেকে অতিরিক্ত ফোর্স নিয়েছি। বিশেষ করে রাতে মহাসড়কে ডাকাতি ঠেকাতে আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘কোনো স্থানে যানজট হলে মোটরসাইকেলে করে কুইক রেসপন্স টিম দ্রুত সেখানে পৌঁছাবে। দুর্ঘটনা, গাড়ি নষ্ট হওয়া বা অন্য কোনো কারণে যানজট তৈরি হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হবে।’ সড়ক-মহাসড়কে নজরদারি বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায় দেড় হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রায় ২৫০ কিলোমিটার সড়কের প্রতিটি অংশই আমরা নজরদারির মধ্যে রাখতে চাই। চন্দ্রা, হাটিকুমরুলসহ গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতেও সিসিটিভি বসানো হয়েছে। এসব ক্যামেরা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুমও স্থাপন করা হয়েছে, যাতে কেন্দ্রীয়ভাবে যানজট পরিস্থিতি মনিটর করা যায়।’
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘রাস্তায় আমরা কোনো চাঁদা ওঠাতে দেব নাÑ বৈধ হোক বা অবৈধ, কোনো চাঁদাই নয়। মালিক সমিতি বা শ্রমিক সংগঠনের নামেও সড়কে চাঁদা তোলা যাবে না। যদি তোলার প্রয়োজন হয়, তা টার্মিনাল থেকে তুলতে হবে। রাস্তায় লাঠিসোটা নিয়ে ভয় দেখিয়ে চাঁদা তোলা হলে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবে। সেই নির্দেশনাও দেওয়া আছে।’