× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অবৈধ ভাড়াবাণিজ্য চক্রের নিয়ন্ত্রণে সরকারি মার্কেট

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ১৩:০০ পিএম

ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মালিকানাধীন রাজধানীর গুলিস্তানের কাপ্তান বাজার কমপ্লেক্স ভবন-১ বর্তমানে নতুন দখলচক্রের কবলে পড়েছে। ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বড় বাজার হিসেবে পরিচিত এই মার্কেটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অবৈধ ভাড়াবাণিজ্যের একটি শক্তিশালী চক্র। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ফড়িয়া ও অপরাধী চক্র মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অবৈধ দোকান বসিয়ে নিয়মিত ভাড়া আদায় করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মার্কেটের খোলা জায়গায় নকশাবহির্ভূত দোকান নির্মাণ, জেনারেটর রুমসংলগ্ন স্থান দখল করে ভাড়া দেওয়া এবং সরকারি সিলগালা ভেঙে দোকান চালু রাখার মতো কার্যক্রম প্রকাশ্যেই চলছে। সবকিছু ঘটছে ডিএসসিসির নাকের ডগায়। তবে আইনি জটিলতার কারণে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

এই মার্কেটের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হকার্স মার্কেট সমিতির সদস্যদের জন্য ৮৮টি দোকান সংরক্ষিত ছিল। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ওই দোকানগুলোর তালা ভেঙে ভাড়া দেওয়া শুরু করে একটি চক্র। সমিতি একাধিক গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। প্রকৃত হকদারদের কাছে দোকান বুঝিয়ে দিতে পারেনি সিটি করপোরেশন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দখলচক্র সমিতির একটি পক্ষকে ব্যবহার করে অবৈধ ভাড়াবাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পালাবদলের পর বিএনপি পরিচয় ব্যবহার করে বিএম সাগর নামে এক ব্যক্তি মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেন। কোনো নিয়মনীতি অনুসরণ না করে তিনি ‘ব্যবসায়ী সমিতি’ নামে একটি স্বঘোষিত কমিটি গঠন করেন। ওই কমিটির সাধারণ সম্পাদক করা হয় মোস্তাফিজুর রহমান শ্যামল নামে একজনকে, যিনি আওয়ামী লীগঘেঁষা এবং সাবেক কাউন্সিলর গৌরবের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। পরে ২০২৪ সালের ২৬ অক্টোবর তারা ‘কাপ্তান বাজার কমপ্লেক্স ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়িক সমিতি’ গঠন করে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মার্কেটের উত্তর পাশের দেয়াল ঘেঁষে নকশাবহির্ভূতভাবে ২৬টি দোকান নির্মাণ করে দলটির নেতারা। প্রতিটি দোকান থেকে তখন ৮ হাজার টাকা করে ভাড়া নেওয়া হতো। সরকার পরিবর্তনের পর সেই ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায়। এছাড়া জেনারেটর রুমসংলগ্ন জায়গা, সিঁড়ির নিচের স্পেসসহ বিভিন্ন স্থানে নতুন দোকান বসানো হয়েছে। নিচতলার ছয়টি টং দোকান থেকে মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকা এবং সিঁড়ির নিচের দোকানগুলো থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এই অর্থের কোনো হিসাব ডিএসসিসির খাতায় নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্বঘোষিত ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি বিএম সাগরের কাছে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই বিষয়ে সিটি করপোরেশন আমাকে জিজ্ঞাসা করতে পারে। আপনি তো জিজ্ঞাসা করতে পারেন না। মার্কেটের মালিক সিটি করপোরেশন। দোকান ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে সিটি করপোরেশনই বলবে। আমি ভাড়া দেওয়ার কে? ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হিসেবে সদস্যদের ভালো-মন্দ দেখার কাজটাই করছি।’

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যবসায়ী সমিতি গঠনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আপনি মনগড়া কথা বলছেন। এ কথার কোনো ভিত্তি নেই। আপনার পত্রিকার নাম আমি জানি না। আপনি সামনে এসে কথা বলুন।’

চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মার্কেট দোকান মালিক সমিতির একটি পক্ষ ডিএসসিসি প্রশাসকের কাছে দখলদারদের উচ্ছেদের দাবি জানিয়ে আবেদন করে। আবেদনে বলা হয়, ভবনের প্রথম তলায় ৪৪টি এবং দ্বিতীয় তলায় ৪৪টিসহ মোট ৮৮টি দোকান প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হকার সদস্যদের নামে বরাদ্দের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু একটি কুচক্র প্রতিটি দোকানের বিপরীতে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা করে সালামি নিয়ে পরিচিতজনদের কাছে বন্দোবস্ত দিয়েছে এবং প্রতি দোকান থেকে মাসে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করছে।

আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১২ সালের ২২ মার্চ দোকান বরাদ্দ কমিটির সভায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে দোকান বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে দোকানগুলোতে তালা লাগানো হয়। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আবার দখল হয়ে যায়। পরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে আবার দখলমুক্ত ও সিলগালা করা হলেও একই চিত্র পুনরাবৃত্তি হয়েছে।

সমিতির আবেদনের পর ১১ জানুয়ারি প্রশাসকের দপ্তর বিষয়টি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সম্পত্তি শাখাকে নির্দেশ দেয়। সম্পত্তি শাখা নথিটি প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়ে জানায়, দোকান বরাদ্দসংক্রান্ত কার্যক্রম রাজস্ব বিভাগ পরিচালনা করে। পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নথিটি রাজস্ব বিভাগে পাঠানো হলো। 

ডিএসসিসির নথি অনুযায়ী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হকার্স মার্কেট সমিতির সদস্যদের জন্য নিচতলায় ৪৪টি এবং দ্বিতীয় তলায় ৪৪টিসহ মোট ৮৮টি দোকান সংরক্ষিত রয়েছে। বরাদ্দ কার্যকর না হলেও সমিতির ৬৮ জন সদস্যের কাছ থেকে জনপ্রতি ২ লাখ টাকা করে সালামি আদায় করা হয়েছে। ২০১৮ সালে লটারির প্রক্রিয়া শুরু হলেও মামলা ও রিটের কারণে তা থেমে যায়। ২০২২ সালে ‘পরবর্তী সভায়’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হলেও সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। এই দীর্ঘসূত্রতাকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে বর্তমান দখলচক্র।

ডিএসসিসির তথ্য অনুযায়ী, মার্কেটে মোট দোকান ৬৪২টি। মার্কেটের ভাড়া আদায়ের দায়িত্বে থাকা রেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট কাকলি খানম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমাদের তালিকা অনুযায়ী ৫৩৭টি দোকান থেকে নিয়মিত ভাড়া আদায় করা হয়। তালিকাভুক্ত ৮৮টি দোকান তালাবদ্ধ রয়েছে। কেউ যদি কোনো দোকানের তালা খুলে থাকে, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।’

এদিকে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরুর আগেই একটি পক্ষ হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) আদেশ এনে নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। গত বছরের ৭ জানুয়ারি দোকান বরাদ্দের বিষয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হকার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির (রেজি নং: ঢাকা-১১৯৪) আরেকটি পক্ষ হাইকোর্টে রিট আবেদন করে (রিট পিটিশন নং-১৪৪৮২/২০২৫)। আবেদনে বলা হয়, ঢাকার কাপ্তান বাজার কমপ্লেক্স-১ নম্বর ভবনের প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ৮৬টি দোকান বরাদ্দ না দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে নাÑ তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ওই দোকানগুলোর দখল ও বর্তমান অবস্থার ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। আদালত বিবাদীদের আগামী ৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের মধ্যে রুলের জবাব দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে সিটি করপোরেশনে নথি এসে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। একই সঙ্গে আবেদনকারীর ৭ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখের আবেদনটি আদেশের অনুলিপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে। রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ৮৬টি দোকানের বর্তমান দখল অবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না বলেও আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, রাজস্ব কর্মকর্তা (বাজার-১), এস্টেট অফিসার (বাজার শাখা), প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা ও আইন কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই মার্কেট নিয়ে হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের স্ট্যাটাস কো এসেছে। তাই উচ্ছেদ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে আমাদের আইন শাখা থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা