মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ১০:৪০ এএম
তেল সরবরাহের সাপ্লাই-চেইন এরই মধ্যে ভেঙে পড়েছে, যা ঈদযাত্রায় গুরুতর প্রভাব তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
টানা সাত দিনের সরকারি ছুটিতে স্বস্তির ঈদযাত্রার প্রস্তুতির প্রাক্কালে বিরূপ প্রভাব নিয়ে হাজির হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। বিশ্বব্যাপী তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট দেশের সব খাতকেই কিছুটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে চলমান কৃত্রিম তেল সংকট পরিবহন খাতে ভাড়া বৃদ্ধিসহ নৈরাজ্যকে উৎসাহিত করার পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে তেলসমৃদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে। এমন পরিস্থিতিতে তেল সংকটের গুজব সামনে এনে দেশের তেল সরবরাহকারীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফায়দা নিতে চাইছেন, এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেকে বলছেন, তেলের প্রকৃত সংকটকে কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দেখাতে পারলে আসন্ন ঈদে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অজুহাত খুঁজে পাওয়া যাবে। এতে পরিবহন ব্যবসায়ীদের মুনাফা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। পাম্প মালিকদের মুনাফা বাড়বে সমানহারে। তবে তেল সরবরাহের সাপ্লাই-চেইন ইতোমধ্যে ভেঙে পড়েছে, যা ঈদযাত্রায় গুরুতর প্রভাব তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সরেজমিন ঢাকার কয়েকটি পেট্রোল পাম্পে দেখা গেছে মোটরবাইক, চার চাকার বাহনের দীর্ঘ লাইন। তেজগাঁওয়ের সাউদার্ন পেট্রোল পাম্পে ২ লিটার করে তেল পাচ্ছেন মোটরবাইক চালকরা। আর ১০ লিটার করে জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে চার চাকার বাহনকে। মোটারবাইক চালকরা এটিকে ভোগান্তি হিসেবে দেখছেন। সরকারের একটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বাহনের চালক বলেন, ৬০ লিটার তেল চেয়েছি, ১ লিটার দিয়েছে। এতে আবারও অন্য পাম্পে যেতে হবে তেলের জন্য।
মহাখালীর সিএম পেট্রোল পাম্পের কর্মচারী মিজান জানান, ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না ডিপোগুলো। অনেক গাড়িকে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। ৫০ লিটার তেলের জায়গায় ২০ লিটার দিতে হচ্ছে। তেঁজগাওয়ের সাউদার্ন পাম্পের সহকারী হিসাব রক্ষক প্রসেনজিৎ দাশ জানান, প্রতিদিন সাড়ে ১৩ হাজার লিটার তেল বহনকারী দুটি গাড়ি আসে। এটা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। শুক্র ও শনিবারÑদুদিন তেল আসা বন্ধ থাকে।
তবে সরকারের দায়িত্বশীলরা তেমন কোনো সংকটের কথা স্বীকার করছেন না। বরং তেল সংকট নিয়ে গুজবের কথা বলছেন। এ বিষয়টি আসন্ন ঈদযাত্রায় ব্যবসায়িক ফায়দা লোটার কৌশল হিসেবে দেখছেন অনেকে। সাধারণ যাত্রীরা বলছেন, এখন ভাড়া না বাড়লেও ঈদ ঘনিয়ে এলে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অনেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের পাঁয়তারা করবে।
যদিও সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, বাড়তি ভাড়া আদায় করলে সেসব পরিবহনের রুট পারমিট বাতিল করা হবে। তবে বাড়তি ভাড়ার আশঙ্কাটি ঝেড়ে ফেলার নয়।
ঢাকারর নর্দায় রয়েল এক্সপ্রেসের বাস কাউন্টারে কথা হয় গণমাধ্যমকর্মী তারিকুল ইসলাম নিলয়ের সঙ্গে। তিনি ঢাকা থেকে মেহেরপুরের ঈদযাত্রার টিকিট কেটেছেন। নিলয় জানান, নর্মাল ভাড়ার চেয়ে তার কাছ থেকে ১০০ টাকা বেশি নেওয়া হয়েছে। আর কাউন্টার থেকে শর্ত দিয়েছে সরকারের সঙ্গে নেগোসিয়েশনে ঈদে পরিবহনের ভাড়া বাড়ানোর চেষ্টা চলছে; বাড়লে বাড়তি টাকাও পরিশোধ করতে হবে। আর জ্বালানির জন্য পরিবহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে, ফোন করে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, এরকম বাড়তি ভাড়া নেওয়ার তথ্য তত বেশি মিলবেÑ এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পেট্রোল ও অকটেন মজুদ আছে
চাহিদার প্রায় সিংহভাগ পেট্রোল আর অকটেন দেশেই উৎপাদিত হওয়ার কারণে এই দুই জ্বালানি তেল নিয়ে গ্রাহকদের আতঙ্কিত হতে নিষেধ করেছেন সরকার সংশ্লিষ্টরা। মূলত দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত উপজাত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল উৎপাদন হয়। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে চাহিদার তুলনায় কনডেনসেট উৎপাদন অনেক বেশি এবং কনডেনসেট থেকে পেট্রোলের পরিমাণ দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি। দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) ও কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি সূত্রে জানা যায়, এদের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন। আর আমাদের পেট্রোল ও অকটেন বার্ষিক চাহিদা ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যক্তিগতভাবে পরিবহন জ্বালানি মজুদ করে সংকট তৈরি করতে তৎপর একটি গোষ্ঠী। এ কারণেও দ্রুত সংকটের একটা আবহ তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেইÑ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী
ফিলিং স্টেশনে ভিড় করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে মনে করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, মানুষের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ আছে। তবে সরবরাহ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। মার্চে কোনো সরবরাহ সংকট নেই। এপ্রিল ও মে মাসের সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের। জ্বালানি তেল সংক্রান্ত সমসাময়িক বিষয় নিয়ে মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ফিলিং স্টেশনে মূলত পেট্রোল ও অকটেনের জন্য ভিড় করছে। অথচ পেট্রোলের শতভাগ দেশে উৎপাদন হয় আর অকটেনের হয় সিংহভাগ। শিগগির সবার উৎকণ্ঠা কেটে যাবে। মোটরসাইকেল দিয়ে যারা রাইড শেয়ার করেন, তাদের ২০০ টাকার পরিবর্তে (দুই লিটার) তেল সরবরাহের সীমা পাঁচ লিটার করে দেওয়া হয়েছে।
বাড়তি ভাড়া নিয়ে পরিবহন মালিক সমিতির ভাষ্য
সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী জোবায়ের মাসুদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমরা কাউকে বাড়তি ভাড়া আদায় করতে উৎসাহিত করি না। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরকার যদি ভাড়া না বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়, তাহলে পরিবহন মালিক সমিতি ভাড়া বাড়াবে না। তবে তিনি আরও জানান, তাদের সর্বশেষ ভাড়া নিধারণ করা হয়েছিল ২০২২ সালে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি অনুয়ায়ী তারা সরকারকে বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের অনুরোধ করেছেন। ঈদের সময় ফিরতি যাত্রা খালি আসতে হয় বলে লোকসান সমন্বয় করতে সরকারকে তারা অনুরোধ করছেন।
তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও উত্তেজনা ঘটার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ সেবার দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এবারও সে আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ কিছুদিন পরই লাখো মানুষ রাজধানী ছেড়ে যাবে ও দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ নিজ নিজ বসতবাড়িতে ফিরবে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা এই সুযোগ নিতে তৎপর হতে পারে, যা সাধারণ ও সীমিত আয়ের মানুষের ঈদযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলবে।
তেলের সংকটের অজুহাত তুলে পরিবহন ব্যবসায়ীরা এর ফায়দা নিতে পারেন। কারণ আমাদের অতীত অভিজ্ঞা তা-ই বলে।
তেলের প্রধান ডিপোগুলোয় সেনা মোতায়েনের নির্দেশ
জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের তেলের প্রধান ডিপোগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার এক বার্তায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, জ্বালানি তেল বিপণনে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন ডিপো হতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিলারদের আকস্মিক বর্ধিত চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানা যায়। ফলে জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গায় প্রধান স্থাপনাসহ প্রধান প্রধান ডিপোগুলোতে অর্থাৎ খুলনার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর এবং বরিশাল ডিপোতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
জ্বালানি তেলের ডিপোগুলো কেপিআইভুক্ত স্থাপনা হওয়ায় জরুরিভিত্তিতে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিপণন কোম্পানিগুলোর উল্লিখিত স্থাপনার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রয়োজন। এমতাবস্থায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিপণন কোম্পানিগুলোর চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গার প্রধান স্থাপনা, খুলনা জেলার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জ জেলার বাঘাবাড়ী, নারায়ণগঞ্জ জেলার গোদনাইল ও ফতুল্লা, দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর এবং বরিশাল ডিপোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।