× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পুলিশ প্রশাসনে ‘তালিকার রাজনীতি’

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২৬ ০৮:১৯ এএম

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫১ এএম

অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ প্রশাসনে আবারও ‘রাজনৈতিক ছাপ’ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।  গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ প্রশাসনে আবারও ‘রাজনৈতিক ছাপ’ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রিত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভার কার্যক্রম শুরুর পর প্রত্যাশা ছিল, প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ও পেশাদারত্ব ফিরে আসবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই প্রত্যাশা পূরণের ইঙ্গিত দেখা দিলেও সম্প্রতি পুলিশ প্রশাসনের কিছু ঘটনায় এ সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ প্রশাসনে আবারও ‘রাজনৈতিক ছাপ’ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। একাধিক সূত্র জানাচ্ছে, কিছু অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের নিয়ে তথাকথিত তালিকা তৈরি করছেন। অনেককে আবার ‘আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ঘরানা’ বা পূর্ববর্তী শাসনকালের সঙ্গে সম্পৃক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এসব তালিকা বিভিন্ন মহলেও সরবরাহ করার চেষ্টা চলছে। যার উদ্দেশ্য হচ্ছে নীতিনির্ধারকদের বিভ্রান্ত করে পেশাদার ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের অকালীন অবসরে পাঠানো বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া।

এতে করে পুলিশ বাহিনীর ভেতর নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা বলছেন, এর ফলে স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে আবারও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়নের সংস্কৃতি ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তালিকায় জাতীয়তাবাদী ঘরানার কর্মকর্তারাও

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যে তালিকাগুলো ঘুরছে সেখানে শুধু কথিত আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তারাই নন- জাতীয়তাবাদী ঘরানার বলে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তার নামও রয়েছে। অর্থাৎ তালিকা তৈরির পেছনে প্রকৃত রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বা পদপদবির প্রতিযোগিতাই বড় ভূমিকা রাখছে বলে অনেকের ধারণা। 

পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা দেখছি কিছু কর্মকর্তা বিভিন্ন ব্যাচের নাম দিয়ে আলাদা আলাদা তালিকা বানাচ্ছেন। রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে যাদের নাম দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছেন।”

তার মতে, এ ধরনের তালিকা তৈরির ফলে পুলিশ বাহিনীতে সন্দেহ ও বিভাজনের পাশাপাশি পেশাদারত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

ভোল পাল্টে সক্রিয় একটি সুবিধাভোগী চক্র 

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হচ্ছেÑ যেসব কর্মকর্তা সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি অনুগত হয়ে কাজ করেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন অবস্থান পাল্টে তালিকা তৈরিতে সক্রিয় হয়েছেন।

পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, “এই চক্রের লক্ষ্য মূলত নতুন ক্ষমতার কাঠামোর কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তোলা। তারা নিজেদের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড আড়াল করতে অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পথ বেছে নিয়েছেন।”

পুলিশ প্রশাসনের একজন মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা বলেন, “যারা অতীতে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তারাই এখন নিজেদের অবস্থান বাঁচাতে অন্যদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন।” অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন কর্মকর্তা অতীতে দুর্নীতি বা বিতর্কের কারণে পদোন্নতি পাননি। সেই ক্ষোভ থেকেও তারা নতুন পরিস্থিতিতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন।

সরকারপ্রধানের বার্তার সঙ্গে বাস্তবতার দ্বন্দ্ব

নতুন সরকারের শুরুতেই সরকারপ্রধান তারেক রহমান সচিবালয়ে সরকারের সচিবদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রশাসনের উদ্দেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি বলেন, “অতীতের মতপথ ভুলে গিয়ে দেশের উন্নয়নে নির্ভয়ে ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।” সেই বক্তব্যে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আশাবাদী হয়েছিলেন। অনেকেই মনে করেছিলেন, এবার প্রশাসনে রাজনৈতিক বিভাজনের সংস্কৃতি কমবে। কিন্তু পুলিশের ভেতরে নতুন করে তালিকা তৈরির অভিযোগ সেই আশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন প্রশাসন বিশ্লেষকরা।

একজন সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, সরকারপ্রধান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনাই অগ্রাধিকার। কিন্তু নিচের স্তরে এভাবে রাজনৈতিক ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা সেই বার্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

‘অজানা আতঙ্কে’ পেশাদার কর্মকর্তারা

এই পরিস্থিতিতে পুলিশ বাহিনীর অনেক মেধাবী ও পেশাদার কর্মকর্তার মধ্যে অজানা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, হঠাৎ করে তাদের নামও কোনো তালিকায় উঠে যেতে পারে।

ঢাকার এক গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে কর্মরত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করতে চাই। কিন্তু যদি হঠাৎ করে বলা হয়, আপনি অমুক দলের ঘনিষ্ঠ, তাহলে পেশাদারত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। নিজের স্বচ্ছতা প্রমাণ করাও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন। এই ভয়টা অনেকের মধ্যেই কাজ করছে।’ কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, এ ধরনের অনিশ্চয়তা থাকলে মাঠপর্যায়ের কাজেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

নতুন আইজিপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছেও এসব বিভ্রান্তিকর তালিকা বা তথ্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, কিছু ব্যক্তি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ব্যাচ বা কর্মকর্তাদের নিয়ে অভিযোগ পাঠাচ্ছেন। তারা এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করছেন যেন প্রশাসনে বড় ধরনের রাজনৈতিক সমস্যা রয়েছে।

তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকা বা অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না। যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘পুলিশ একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী। এখানে যদি রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়বে।’ তার মতে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই তদন্ত করে দেখা উচিত, কিন্তু সেটি যেন রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে না হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ভালো হলো পেশাদার প্রশাসন। সরকারকেও সেই বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।’

প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের প্রশাসনে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক মেরুকরণের অভিযোগ রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের সময় সেটি নতুন করে সামনে আসে। এ প্রসঙ্গে সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘প্রতিটি সরকারই একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন চায়। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় দেখা যায়Ñ কিছু গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে রাজনৈতিক পরিচয়ের ইস্যু ব্যবহার করে।’

তার মতে, এ ধরনের তালিকা রাজনীতি বন্ধ করতে হলে স্বচ্ছ মূল্যায়ন ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।

বাহিনীর ঐক্য রক্ষাই বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশ বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে ঐক্য ও শৃঙ্খলা। যদি ভেতরে বিভাজন তৈরি হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সাবেক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশ অনেক কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। কিন্তু ভেতরের বিভাজন তৈরি হলে সেটা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে যায়।’ তার মতে, সরকার ও পুলিশ নেতৃত্বকে দ্রুত এই অভিযোগগুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। সবাইকে নিশ্চিত করতে হবে, বাহিনীর ভেতরে যেন রাজনৈতিক বিভাজন না বাড়ে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয় জরুরিÑ যেমন, অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে কর্মদক্ষতা বিবেচনা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে পুলিশ নেতৃত্বের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট বার্তা দেওয়া উচিত যে, প্রশাসনের ভেতরে যেকোনো ধরনের তালিকা রাজনীতি ও বিভাজনের প্রবণতা কঠোরভাবে দমন করা হবে। কারণ নতুন সরকারের শুরুতেই যদি এ সমস্যার সমাধান করা যায়, তাহলে প্রশাসনে স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা