ঈদযাত্রা
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬ ১১:৪৪ এএম
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ছবি: বাসস
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য বড় ধরনের দুর্ঘটনায় দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সড়ক বা রেলপথে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করতে হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যানজটপ্রবণ ১৫৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে সার্বক্ষণিক নজরদারি জোরদার করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রবিবার সকালে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভার কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় ঈদকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি, ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ, সড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
দুর্ঘটনা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে হেলিকপ্টার : ঈদের সময় সড়ক, রেলপথ ও নৌপথে যাত্রীচাপ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। অতীতে বিভিন্ন সময়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে এবার নতুন উদ্যোগ হিসেবে দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধার তৎপরতা শুরু করতে হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, মহাসড়ক বা রেলপথে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় দ্রুত পৌঁছতে আকাশপথ ব্যবহার করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ইউনিট। পাশাপাশি উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করতে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি দল, রেসকিউ বোট, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে উদ্ধার অভিযানে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সহায়তাও নেওয়া হবে।
যানজট নিয়ন্ত্রণে ১৫৫ স্পটে ক্যামেরা
ঈদযাত্রায় যাত্রীদের অন্যতম বড় ভোগান্তি দীর্ঘ যানজট। এ সমস্যা মোকাবিলায় এবার প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
সভায় জানানো হয়, সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের চিহ্নিত ১৫৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে যান চলাচল সার্বক্ষণিক মনিটর করা হবে। ঈদের আগে ও পরে এসব স্থানে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ ছাড়া যানজটপ্রবণ এলাকায় অতিরিক্ত রেকার (অচল যানবাহন অপসারণের যন্ত্র) প্রস্তুত রাখা হবে। কোনো যানবাহন বিকল হয়ে সড়কে পড়ে থাকলে দ্রুত তা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেতুর টোল প্লাজাগুলোতে দ্রুত টোল আদায়ের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঈদে নিরাপত্তায় বাড়বে টহল
ঈদের ছুটিতে রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলো অনেকটা ফাঁকা হয়ে যায়। এ সময়ে তালাবদ্ধ বাসাবাড়িতে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। এজন্য বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় পুলিশের টহল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সভায় আরও জানানো হয়, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কূটনৈতিক এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। রাজধানীসহ বড় শহর এবং বন্দরে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবের টহল বাড়ানো হবে। সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
টিকিট কালোবাজারি ও অতিরিক্ত ভাড়া বন্ধে নজরদারি
ঈদে বাস, ট্রেন ও লঞ্চের টিকিট নিয়ে কালোবাজারি দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। এ বিষয়ে সভায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত ভাড়ার বেশি টাকা আদায় সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হবে। টিকিট কালোবাজারি প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানো হবে এবং বাস, ট্রেন ও লঞ্চ টার্মিনালে বিশেষ পর্যবেক্ষণ চালানো হবে। পাশাপাশি তথ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গণমাধ্যমে সচেতনতা প্রচারও চালানো হবে।
যাত্রীদের সতর্ক করতে প্রচার
ঈদযাত্রায় প্রায়ই অজ্ঞান পার্টি বা প্রতারণার ঘটনা ঘটার অভিযোগ পাওয়া যায়। এ কারণে যাত্রীদের অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করার বিষয়ে সতর্ক করতে প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল ও লঞ্চঘাটে মাইকিংসহ বিভিন্ন ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে যাত্রীদের সচেতন করা হবে।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে নির্দেশনা
ঈদের আগে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিশ্চিত করার বিষয়েও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সভায় বলা হয়, মার্চ মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস ঈদের আগেই পরিশোধ করতে হবে। শ্রমিকদের ছুটি নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দিতে হবে। কোনো কারখানা যাতে শ্রমিক ছাঁটাই না করে, সে বিষয়ে নজরদারি থাকবে। এ বিষয়ে মালিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে শিল্প পুলিশ সমন্বয় করে কাজ করবে।
মার্কেট ও শপিং এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা
ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটার চাপ বাড়ার কারণে মার্কেট ও শপিং এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সভায় বলা হয়, মার্কেট এলাকায় ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন থাকবে। নারী পুলিশের উপস্থিতিও বাড়ানো হবে। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র্যাবের টহল জোরদার করা হবে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য পুলিশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কন্ট্রোল রুম চালু করবে। এসব কন্ট্রোল রুমকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সমন্বয় করা যায়।
সীমান্ত এলাকায় বাড়তি নজরদারি
ঈদের সময় সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এজন্য সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা জোরদার করতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও কোস্ট গার্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিবছর ঈদের সময় বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানীসহ বড় শহর থেকে নিজ নিজ এলাকায় যান। এ সময় যানজট, দুর্ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এবার আগাম পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে সরকার