বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬ ০৯:৩৬ এএম
জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদদারি এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও পাচার ঠেকাতে সারা দেশে অভিযান শুরু করেছে সরকার। প্রতীকী ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদদারি এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও পাচার ঠেকাতে সারা দেশে অভিযান শুরু করেছে সরকার। তারপরও থামছে না তেলেসমাতি। সরকারি নির্দেশনার বাইরে বাড়তি তেল নিতে পাম্প থেকে পাম্পে ছুটছেন অনেকে। ফলে বাড়তি চাপের কারণে কোথাও কোথাও পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সংকটের অজুহাতে পাম্প মালিকরা বেশি দাম নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি সামলাতে কোথাও কোথাও পুলিশ পাহারায় জ্বালানি তেল বিক্রি করা হচ্ছে। এর মধ্যেও ঝিনাইদহে মোটরসাইকেলের তেল নিতে গিয়ে বাগ্বিতণ্ডার জেরে পাম্প কর্মচারীদের পিটুনিতে যুবক নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন পাম্পে লাইন ধরা নিয়ে হাতাতাতি-তর্কাতর্কিও হচ্ছে অহরহ। সংকটের সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন অসাধু ব্যবসায়ীরাও। নাটোরে বাঁশঝাড়ের মাটির নিচে পানির ট্যাংক বসিয়ে ১০ হাজার লিটার তেল মজুদের অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। তবু থেমে নেই মজুদদারি। এই প্রেক্ষাপটে রাজধানী ঢাকাসহ মাঠপর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রবিবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে কিছু ‘অসাধু ব্যবসায়ী’ জ্বালানি তেলের বাজারে ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরির উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে মজুদ করছেনÑ এমন খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতোমধ্যে সরকার যানবাহনভিত্তিক জ্বালানি তেল বিক্রির পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছে। তারপরও কিছু পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশনে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশিতে জ্বালানি তেল বিক্রি, অতিরিক্ত মজুদ করা, খোলাবাজারে বিক্রি এবং পাচারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি, খোলাবাজারে বিক্রি বন্ধ এবং পাচার রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে চিঠিতে।
যোগাযোগ করা হলে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তেলের মজুদ ঠেকাতে নজরদারি কঠোর করা হয়েছে। দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। মার্চের ৩১ তারিখের মধ্যে ১১টি তেলবাহী জাহাজ চট্রগ্রাম বন্দরে আসছে। এগুলো দেশে এলে আশা করছি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। কাজেই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। মজুদধারীদের সতর্ক করে তিনি আরও বলেন, কোনো ফিলিং স্টেশন বাড়তি দামে তেল বিক্রি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত এখন নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম আসে, সেসব অঞ্চলে যুদ্ধ চলায় সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং মজুদ তেল সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহারের জন্য রেশনিং চালু করা হয়েছে। আমাদের কাছে জ্বালানি তেলের মজুদ আছে। কিন্তু যুদ্ধ কতদিন চলবে তা আমরা জানি না। তাই সব একসঙ্গে খরচ না করে রেশনিং করে ব্যবহার করলে দীর্ঘ সময় চলা সম্ভব হবে।
মন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে সমুদ্রে থাকা কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছতে শুরু করেছে। গতকাল বেলা ১১টার দিকে একটি জাহাজ নোঙর করেছে এবং আরও একটি জাহাজের নোঙর করার কথা। এসব জাহাজ থেকে তেল সরবরাহ শুরু হলে মজুদ আরও বাড়বে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পেট্রোল পাম্পে কিছু জায়গায় দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। তবে আতঙ্কিত হয়ে তেল মজুদ করার কোনো প্রয়োজন নেই। তেলের দাম বাড়ানোরও আপাতত কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের। বাড়বে না বিদ্যুতের দামও।
বন্দরের জলসীমায় জ্বালানিবাহী আট জাহাজ
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে এলএনজি, এলপিজি ও এমইজিবাহী আটটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমায় পৌঁছেছে। এই আট জাহাজের মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনকারী পাঁচটি এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) পরিবহনকারী দুটি জাহাজ রয়েছে। এর বাইরে অপর জাহাজটি শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত রাসায়নিক মনোইথিলিন গ্লাইকল (এমইজি) নিয়ে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম এ তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগেই জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছিল।
বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে এলএনজি নিয়ে গত মঙ্গল ও গত বৃহস্পতিবার ‘আল জোর’ ও ‘আল জাসাসিয়া’ নামের দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে। জাহাজ দুটির একটিতে ৬৩ হাজার ৩৮৩ টন এলএনজি রয়েছে। অন্যটিতে রয়েছে ৬৩ হাজার ৭৫ টন। একই বন্দর থেকে ‘লুসাইল’ ও ‘আল গালায়েল’ নামের আরও দুটি এলএনজিবাহী আসছে। জাহাজ দুটিতে ৬২ হাজার ৯৮৭ টন এবং ৫৭ হাজার ৬৬৫ টন এলএনজি রয়েছে। এর মধ্যে লুসাইল সোমবার এবং গালায়েল বুধবার বন্দরে এসে পৌঁছবে। কাতারের একই বন্দর থেকে আগামী শনিবার ‘লেব্রেথাহ’ নামের আরেকটি জাহাজও বন্দরে আসবে। জাহাজটিতে ৬২ হাজার টন এলএনজি রয়েছে। অন্যদিকে ওমান থেকে ২২ হাজার ১৭২ টন এলপিজি নিয়ে রবিবার বন্দরে পৌঁছেছে ‘এলপিজি সেভান’ নামের একটি জাহাজ। এছাড়া একই দেশ থেকে ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজি নিয়ে আগেই বন্দরে আসে ‘জি ওয়াইএমএম’ নামের একটি জাহাজ। অপরদিকে আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দর থেকে ৫ হাজার ১৯ টন এমইজি নিয়ে বৃহস্পতিবার বন্দরে এসেছে ‘বে ইয়াসু’ নামের আরেকটি জাহাজ।
লিটারে ১৭ টাকা বাড়ল জেট ফুয়েলের দাম
উড়োজাহাজ চলাচলে ব্যবহৃত জ্বালানি জেট ফুয়েলের জন্য মার্চ মাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১১২ টাকা ৪১ পয়সা। গত মাসে যা ছিল ৯৫ টাকা ১২ পয়সা। অর্থাৎ লিটারপ্রতি দাম বাড়ানো হয়েছে ১৭ টাকা ২৯ পয়সা। এছাড়া আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার ফুয়েলের দাম শূন্য দশমিক ৬২৫৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ৭৩৮৪ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল রবিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন দাম ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন দাম রবিবার রাত ১২টা থেকেই কার্যকর বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।