হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬ ১০:৩২ এএম
আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬ ১০:৩৩ এএম
অমর একুশে বইমেলায় এ বার নারীদের অনেক বই আলো ছড়াচ্ছে, সঙ্গে তরুণ নারী লেখকদের বই গ্রন্থমেলাতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রতি বছরের মতো এবারও অমর একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয়েছে দেশে ও দেশের বাইরে বসবাসরত বিভিন্ন ধারার খ্যাতনামা নারী লেখকদের পাশাপাশি অনেক তরুণীদের বইও। বইমেলার বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা ঘুরে নারী লেখকদের কতটা বই প্রকাশিত হয়েছেÑ তার সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও প্রতিদিনের বাংলাদেশ শতাধিক বইয়ের তালিকা সংগ্রহ করেছে। যেসব বইয়ের কোনোটা ভালো বিক্রি হচ্ছে, কোনোটা কম। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছেÑ যেগুলো কম বিক্রি হচ্ছে সেগুলো কেবল লেখকের পরিচিতরাই কিনছেন; এর বাইরে তেমন কেউ কিনছেন না।
নারী লেখকদের বই প্রকাশ ও বিক্রি নিয়ে কথা হয় বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার প্রকাশক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে। তারা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানানÑ নারী লেখক বা পুরুষ লেখক এই দৃষ্টি থেকে বই প্রকাশ করেন না তারা। বই প্রকাশ করে লেখা দেখে। বিক্রির বিষয়টিও দেখে। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, সেলিনা হোসেন, আনোয়ারা সৈয়দ হক, নাসরিন জাহান, তসলিমা নাসরিন, ঝর্ণা চৌধুরী, অদিতি ফাল্গুনি, মৌলি আজাদ, রুমানা বৈশাখীসহ হাল আমলের নারী লেখকদের বই বেশ ভালোই বিক্রি হচ্ছে।
বইমেলার সোহরাওয়ার্দী প্রাঙ্গণের প্রকাশনা সংস্থা ‘বিদ্যাপ্রকাশ’-এর স্টলে কথা হয় আমেরিকা প্রবাসী লেখিকা পলি শাহীনার সঙ্গে। তিনি লেখক হওয়া ও বইমেলা নিয়ে বলেন, আমি ২৬ বছর ধরে আমেরিকায় থাকি। ছোট থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। মাঝখানে সংসার-চাকরি আর বিদেশের নতুন পরিবেশে খাপখাওয়াতে লেখালেখি বন্ধ হয়ে যায়। পরে সবকিছু গুছিয়ে উঠে আবার লেখালেখিতে ফিরে আসি। বই প্রকাশ হোক আর না হোকÑ কয়েক বছর ধরে আমেরিকা থেকে বইমেলায় ছুটে আসছি। এখানে এলে অনেকের সঙ্গে লেখালেখিসহ নানা বিষয়ে আলাপ হয়, ভালো লাগে।
তিনি আরও বলেন, শুরুতে আমি কবিতা লিখতাম; এখন গল্প লিখছি। কারণ আমার মনে হয়েছে আমি একজন নারী; আমার অনেক গল্প আছেÑ যা অনেকে জানে না। আমার পরিচিত-অপরিচিত অন্য নারীদেরও গল্প আছে; সেগুলো তুলে ধরা প্রয়োজন। সেই চিন্তা থেকে গল্পে আসা। আমার গল্পে নারীদের পাশাপাশি পুরুষকে যেভাবে চিনতে পারি, জানতে পারি, বুঝতে পারিÑ সেভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
‘অন্বেষা প্রকাশন’-এর স্টলের সামনে এডুকেশন লিডারশিপ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা ড. নাজমুন নাহারের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, লেখকদের মধ্যে আসলে নারী বা পুরুষ নেই; হয় না। লেখাই আসল বিষয়। তবে আমাদের নানা প্রতিকূলতা আছে। যেমন ধরেন- পুরুষশাসিত সমাজে আমি নারী লেখক বলে অনেক পাঠক আছে, যারা শুধু আমাকে জাজ করার জন্য আমার বই কেনে। আমি কী লিখেছি, কেন লিখেছিÑ সেসব যাচাই করার জন্য বই কেনে এবং তারা অন্য কোনো লেখকের লেখার সঙ্গে মিলিয়ে একটা আলোচনা টানে। কিন্তু একজন পুরুষ লেখকের সঙ্গে তেমনটা ঘটে না বললেই চলে।
এসব লেখকদের অনেক বই যেমন আলো ছড়াচ্ছে, নারী লেখকদের বই গ্রন্থমেলাতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। এর মধ্যে প্রকাশনা সংস্থা ‘বিদ্যাপ্রকাশ’ থেকে প্রকাশিত হয়েছেÑ পলি শাহীনার গল্পগ্রন্থ ‘না জীবন না মৃত্যু’, তাসলিমা জাহান পান্নার উপন্যাস ‘কাছে থেকেও দূরে তুমি’। ‘অন্বেষা প্রকাশন’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ড. নাজমুন নাহরের কাব্যগ্রন্থ ‘মনের সমুদ্রে তৃষ্ণা’ ও নিশাত ইসলামের উপন্যাস ‘কখনো মেঘ কখনো রোদ্দুর’সহ আরও বেশ কয়েকজন নারী লেখকের বই। ‘অন্যপ্রকাশ’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে সেলিনা রহমান শেলীর উপন্যাস ‘গল্পের উঠোনে জোনাকিদের বৈঠক’, শবনম চৌধুরীর গল্পের বই ‘বনে বনে গাঁথা গল্প’ এবং শানজানা আলমের উপন্যাস ‘নিঝুমপুর’সহ আরও বেশকিছু নারী লেখকের বই। ‘ইউপিএল’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে আকিমুন রহমানের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘পৌরাণিক পুরুষ’ ও রাহনুমা দিশার ‘গাছেরা কী বলে’ শীর্ষক দুটি বই। ‘আগামী’ প্রকাশ করেছে সামসাদ ফেরদৌসীর ভ্রমণ বিষয়ক বই ‘তুরস্কের পথে পথে’, পুষ্পিতা সেনের কাব্যগ্রন্থ ‘বৃষ্টিগুলো তবু ঝরুক’ ও শামীমা জাইদি ফ্যান্সির গল্পগ্রন্থ ‘জলে ভাষা মেঘ’।
‘জলধি’ প্রকাশ করেছে নাহিদা আশরাফীর কবিতার বই ‘নীরবতার নোটবুক’, ফারাহ আজাদ দোলনের ভ্রমণ বিষয়ক বই ‘মেঘ, মন্ত্র আর নেপাল’ এবং লাজ্বাতুল কাওনাইন লীনার ‘অবতল কপাল উত্তল মারুত’ ইত্যাদি। ‘প্রতিভা প্রকাশ’ থেকে বেরিয়েছে ফাতেমা সাইফুল বীনুর উপন্যাস ‘স্বপ্ন সময়’, মৌসুমী সুমির গল্পগ্রন্থ ‘নীলছায়া’ ও সওকত আরা বীথির গল্পগ্রন্থ ‘জীবন সায়াহ্নে’। পাঞ্জেরি থেকে প্রকাশিত হয়েছে- কিযী তাহ্নিনের উপন্যাস ‘মসলার কৌটা’, শেলী সেনগুপ্তার ‘বিসমিল্লাহ শেষ বিদায় স্টোর’ ও শারমিন সুমীর কাব্যগ্রন্থ ‘স্বর্ণলতা’। ‘বইউদ্যান’ প্রকাশ করেছে কবি সাফিনা আক্তারের বাংলা ও ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘কাঠ কয়লার যৌবন’, রঞ্জনা বিশ্বাসের ‘এঁকে দাও আকুল জলস্রোত’ এবং রেপ্লিকা রতনের ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য লেটার্স আই নেভার সেন্ট’; সবগুলো বইয়ের অংলকরণ করেছেন শিল্পী নাজীব তারেক।
‘অনুস্বর’ প্রকাশ করেছে জোহরা পারুলের ‘বিস্মৃত স্বপ্নের মোহনায় দাঁড়িয়ে’ ও মাকসুদা ইয়াসমিন রিপার ‘নিঃশব্দ জোছনা’। প্রকাশনা সংস্থা ‘বাতিঘর’ এনেছে তানিয়া উর্মির স্মৃতিকথা মূলক বই ‘সেতারে স্বাধীনতার সুর : বীর গেরিলাযোদ্ধা শহীদ হাফিজ’ ও তানজিনা হোসেনের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর বই ‘সময় এক আশ্চর্য ভবঘুরে’সহ আরও বেশ কয়েকজন নারী লেখকের বই। ‘অনিন্দ্য প্রকাশ’ এনেছে শাহানাজ ইয়াসমিনের ‘শেষ কথাটি বলা হলো না’, সাবিনা ইয়াসমিন রত্না ও উদাসীন পথিকের যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘বন্ধ দুয়ারের ওপারে’।
‘আবিষ্কার’ থেকে এসেছে ফাতেমা আইয়ূবের কাব্যগ্রন্থ ‘নীরব অশ্রুর রাত’, ‘ভিন্নচোখ’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কলি বড়ালের কাব্যগ্রন্থ ‘নক্ষত্রের দেয়াল’, ‘জলপরি’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে সাফিয়া খন্দকার রেখার শিশুতোষ বই ‘ছড়ায় ছড়ায় বর্ণমালা’, ‘স্বপ্ন ৭১’ প্রকাশ করেছে এলিজা বিনতে এলাহীর ভ্রমণ বিষয়ক বই ‘দেশে দেশে ঐতিহ্য ভ্রমণ’, ‘জয়তী’ প্রকাশ করেছে শাহীনা সোবহানের গল্প বই ‘বালিকার জ্বলন্ত সময়’, ‘অনন্যা’ বের করেছে নিশাগ ইসলামের উপন্যাস ‘চলে যাবো বহদূর’ ও মারশিয়া জাহান মেঘের উপন্যাস ‘মাই সানশাইন’, ‘মুক্তধারা’তে পাওয়া যাচ্ছে বিখ্যাত লেখক মৈত্রেয়ী দেবীর ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’, ‘টাঙ্গন’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে কল্পনা রানী বিশ্বাস ও নিধির কুমার মন্ডলের যৌথ কবিতার বই ‘বিদীর্ণ হৃদয়’, ‘অনুপ্রাণন’ বের হয়েছে শাপলা সাদির উপন্যাস ‘স্বপ্ন পুরুষ’ ও জয়শ্রী সরকারের ‘ইশ্বরকে বল দুঃখী ডাকছে’, ‘শব্দশিল্প’ নিয়ে এসেছে মাহফুজা অনন্যার উপন্যাস ‘ছায়াজ্বাল’, রচনা পারভীনের ‘ঋষি শূন্যতায় সমর্পণ’ ও শারমিন সুলতানা রুনার কবিতার বই ‘সাঁঝের স্বরলিপি’, চন্দ্রাবতী একাডেমি প্রকাশ করেছে আসমা উল হোসনা চৌধুরীর গবেষণা গ্রন্থ ‘বাংলা গদ্যসাহিত্য বিবিধ বিকিরণ’, জাগতিক থেকে এসেছে তানিয়া সুলতানার বাংলা ও ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ ‘যমুনার বুকে অন্তরিক্ষ’ ও কাজী আনারকলির উপন্যাস ‘বৈশাখী’, ‘আজব প্রকাশ’ থেকে বেরিয়েছে অভিনেত্রী শানারেই দেবী শানুর ‘মেইতেই পুরাণ’, ‘মিজান পাবলিশার্স’ নিয়ে এসেছে নাট্যাভিনেত্রী ফারজানা রহমান ছবির গল্পগ্রন্থ ‘অ-দৃশ্যে?’।
এদিকে গতকাল শনিবার ছিল এবারের বইমেলার দশম দিন ও তৃতীয় শিশুপ্রহর। এ উপলক্ষে সকাল থেকেই শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল ১০টা থেকে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে ছিল সাংস্কৃতিক আয়োজনÑ চিত্রাংকন ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা। বেলা ১১টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পুতুল নাচ ও বায়েস্কোপ ঘিরে শিশুদের অনুষ্ঠান। এতসব ঘিরে দিনের প্রথমভাগে শিশুরা নিজের মতো করে আনন্দে মেতে ওঠে। বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত দুদিন এসেছে অনেকগুলো বই। শনিবার এসেছে ১৮৫টি বই। শুক্রবার বই এসেছে ১৯৯টি। প্রকাশকরা জানান, ছুটির দিন হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই দর্শনার্থীদের সংখ্যা বেশি ছিল। এতে বই বিক্রিও তুলনামূলক ভালো হয়েছে। বিশেষ করে নতুন প্রকাশিত বই ও আলোচিত লেখকদের বইয়ের প্রতি পাঠকদের আগ্রহ বেশি দেখা গেছে।