তানভীর হাসান ও নূর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০২৬ ০৮:২২ এএম
পুলিশের লোগো। ছবি: বাসস
রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মিলছে একের পর এক অপরাধের খবর। এসব খবরের ভিত্তিতে একটি পক্ষ সামাজিক মাধ্যমে সরকারকে দায়ী করে সার্বক্ষণিক অপপ্রচার চালাচ্ছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডগুলো পুলিশ সদর দপ্তর পর্যালোচনা করেছে। তাতে দেখা গেছে সাম্প্রতিক ঘটনার বেশিরভাগই সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধ থেকে সৃষ্ট ও সংঘটিত।
এই পর্যালোচনায় আরও একটি বিষয় উঠে এসেছে। তা হলো সামগ্রিকভাবে চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলায় তুলনামূলকভাবে বেশি অপরাধ ঘটছে। সেখানে ৫ আগস্টের পর থেকে বর্তমান সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত অন্তত ২১টি খুনের তথ্য পাওয়া গেছে। আরও অন্তত ১৩ জেলায় বিভিন্ন অপরাধের তথ্য পাওয়া গেলেও সেসব স্থানে খুনের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তবে রাউজানের পাশাপাশি ওইসব জেলায়ও সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রথম অবস্থায় চট্টগ্রাম জেলায় অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে এরই মধ্যে ১৬০০ পুলিশ সদস্যকে নিয়ে আসা হচ্ছে। যেকোনো সময় রাউজান ও জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান শুরু করা হবে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান সরকার গঠনের পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে সরকারবিরোধী নানা গুজব ছড়ানো হচ্ছে। যেমনÑ নরসিংদীতে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর একটি মেয়ে হত্যার ঘটনায় বিএনপির নেতাকর্মীকে দায়ী করে নানা প্রচার চলে। সরকার ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করে। এ সংক্রান্ত মামলার ৯ আসামির মধ্যে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করার পর তদন্তের মোড় ঘুরে যায়। এরপর গ্রেপ্তার হয় খুনের শিকার মেয়েটির সৎ বাবা। তিনি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আদালতে জবানবন্দি দেন। তখন জানা যায়, তিনি নিজেই ধর্ষণের পর মেয়েটিকে হত্যা করেছেন। একইভাবে পাবনার ঈশ্বরদীতেও দেখা যায় পরিবারের সদস্যদের হাতে দাদি ও নাতনি খুন হন। এ দুটি ঘটনাই নির্বাচনের পর ব্যাপক আলোচনায় আসে। যে কারণে এ নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের উপস্থিতিতে জরুরি বৈঠকও হয়। ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বৈঠকে গত ৫ আগস্টের পর থেকে দেশের সব অপরাধ বিষয়ে পর্যালোচনা করেন পুলিশেরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে অপরাধ পর্যালোচনার ভিত্তিতে ঢাকার একটি জোন ও অন্তত ১৩ জেলায় বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে আলোচিত জঙ্গল সলিমপুর ও রাউজানে শুরু হচ্ছে সাঁড়াশি অভিযান। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, মাদক সিন্ডিকেট, ভূমিদস্যু ও পাহাড়কাটা চক্রের দৌরাত্ম্যে থামাতে ওই অভিযানে নামছে ১৬০০ পুলিশ সদস্য। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি), আরআরএফসহ পার্বত্য তিন জেলা ও আশপাশের জেলা পুলিশের সমন্বয়ে শুরু হচ্ছে ‘এসিড টেস্ট’ অভিযান। পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের নির্দেশে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ওই অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ এ অভিযানের জন্য গতকাল শনিবার দুপুর ২টায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ লাইনসে যোগ দেন ১৬০০ অফিসার ও ফোর্স। এ অভিযানে সিএমপির (চট্টগ্রাম) ৮০০ সদস্য, আরআরএফের (চট্টগ্রাম) ৪০০ সদস্য এবং ফেনী, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা পুলিশের ১০০ জন করে সদস্য অংশ নিচ্ছেন। সব সদস্যই প্রয়োজনীয় সব অস্ত্র, গুলি, রায়ট সামগ্রী, রেইনকোট, বাঁশি, হালকা বিছানাপত্র ও পকেট মানিসহ প্রস্তুত রয়েছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশের পক্ষে পুলিশ সুপার (অ্যাডমিন অ্যান্ড ইএন্ডডব্লিউ) সঞ্জয় সরকার এ আদেশ দেন।
সূত্র জানায়, বিশেষ এ অভিযান চলবে কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, গাইবান্ধা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়াসহ পর্যায়ক্রমে মোট ১৩টি জেলায়। পুলিশের একটি সূত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানায়, তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে এ অভিযান চলবে। যেসব এলাকায় সামাজিক অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার ও নিয়মিত অপরাধ বেড়ে চলেছে, সেসব এলাকাকেই অভিযানের টার্গেট করা হয়েছে। বিশেষ এই অভিযানের প্রথম ‘অ্যাসিড টেস্টই’ হচ্ছে চট্টগ্রাম।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ১০ নম্বর সলিমপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড জঙ্গল সলিমপুর খুনি, মাদক কারবারি, ডাকাত ও ফেরারি আসামিদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। সেখানে আস্তানা গড়ে তুলেছে বরিশাল, বগুড়া, নোয়াখালী, হাতিয়া ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার দাগী অপরাধীরাও। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি ওই এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা খুঁজে পাওয়া কঠিন। বসবাসকারীদের বড় অংশই বহিরাগত ও হত্যা, ডাকাতি ও মাদক মামলার আসামি। কয়েকটি সংঘবদ্ধ গ্যাংয়ের সশস্ত্র অবস্থানের কারণে সেখানে দিনের আলোতেও আতঙ্ক বোধ করেন খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। অভিযোগ রয়েছে, অপরাধী চক্রগুলো পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি, অবৈধ প্লট বাণিজ্য ও জমি দখলের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকাও হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদেরও কব্জা করে ফেলেছে তারা।
জঙ্গল সলিমপুর ও সংলগ্ন লিংক রোড এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। পুরো এলাকার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। বিপুল এই অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই সেখানে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, ধারাবাহিক খুনোখুনি ও গ্যাং যুদ্ধ চলছে। দুটি প্রধান গ্রুপ এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ করছে। এলাকার ছিন্নমূল অংশটিকে নিয়ন্ত্রণ করছে রোকন গ্রুপ; অন্যদিকে আরিফিন নগর ও আলী নগরের নিয়ন্ত্রণ করছে ইয়াসিন গ্রুপ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আধিপত্য নিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে অন্তত চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গত বছরের ২ জানুয়ারি সলিমপুর ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি মীর আরমানকে ঘর থেকে ডেকে এনে রগ কেটে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৯ ফেব্রুয়ারি ছিন্নমূল এলাকার মাটি ও বালু ব্যবসার দখল নিয়ে মোহাম্মদ মাসুদকে প্রকাশ্যে হত্যা, ২৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সমর্থক বৃদ্ধ আবুল কালামকে পিটিয়ে গাছে ঝুলিয়ে হত্যা এবং ৪ অক্টোবর দুই গ্রুপের সংঘর্ষে কাল্লু (২৮) নিহতের ঘটনা ঘটে। এর আগে ১৯ জানুয়ারি অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের মারধরে নিহত হন র্যাব-৭-এর নায়েব সুবেদার মোতালেব হোসেন। তারও আগে গত ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জঙ্গল সলিমপুরের দুর্গম পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে দেশীয় অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান পায়। সেখান থেকে ৬টি দেশীয় অস্ত্র, ৩৫ রাউন্ড খালি কার্তুজ, ৫ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, চাইনিজ কুড়াল, ওয়াকিটকি ও বিপুল অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়।
এদিকে রাউজানেও অপরাধ পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। সেখানে বেড়েছে পাহাড় কাটা, খাস জমি দখল, চাঁদাবাজি ও বন্দরের অবৈধ মালামাল পাচারের ঘটনা। রাউজানকে অনেক অপরাধী চক্র বন্দরের মালামাল পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিতে স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যেও সম্প্রতি চরম উত্তেজনা ও সংঘর্ষ ঘটতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতি মাসেই ৩-৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটছে ওই এলাকায়।
একটি সূত্র জানায়, ২০২১ সালে সরকার জঙ্গল সলিমপুরের ২ হাজার একর খাস জমিতে বড় একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছিল। সেখানে স্পোর্টস কমপ্লেক্স, কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর, আইকনিক মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটার ও ইকোপার্ক করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়। সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা এলাকাটি পরিদর্শনও করেন। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অসাধু চক্রের বাধার কারণে সেই প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়েছে। এখানে আবারও শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে অপরাধীরা।