রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬ ১২:১৯ পিএম
ভারতীয় মুসলিম জাতিসত্তার অধিকার আদায়ে দীর্ঘ ৪১ বছর বিরামহীন আন্দোলন-সংগ্রামে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল মুসলিম লীগ। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সময়টা ছিল বিংশ শতাব্দীর শুরু দিকে, ভারত উপমহাদেশে চলছিল ব্রিটিশ রাজত্ব। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হতে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলছে ভারতবাসী। এ সময় তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে মুসলিমের সংখ্যা নগণ্য হওয়ায় নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পারছিল না তারা। এ প্রেক্ষাপটে মুসলিমরা গড়ে তোলে পৃথক রাজনৈতিক দল-মুসলিম লীগ।
১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহর উদ্যোগে ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলে জন্ম হয় মুসলিম লীগের। এ দলটির স্লোগানে একসময় কেঁপে উঠত ব্রিটিশ রাজপথ। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী দোর্দণ্ড প্রতাপশালী দল মুসলিম লীগ।
ইতিহাস বলছে, ভারতীয় মুসলিম জাতিসত্তার অধিকার আদায়ে দীর্ঘ ৪১ বছর বিরামহীন আন্দোলন-সংগ্রামে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল এ দলটি। জন্মের অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম লীগ পরিণত হয় ব্রিটিশ ভারতের মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে। ১৯৩৫ সালে মুহম্মদ আলি জিন্নাহ দলটির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাখাগুলো পুনর্গঠিত হয় ও নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে হয় সক্রিয়। ১৯৩৭ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক মুসলিম লীগে যোগ দেন। এ সময় দলটির মঞ্চ থেকেই উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন আবাসভূমির দাবি উত্থাপন করেন শেরেবাংলা।
মুহম্মদ আলি জিন্নাহর ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের’ ওপর ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে পূর্ব ও পশ্চিমÑদুই পৃথক ভূখণ্ড নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় মুসলিম লীগ। কিন্তু সেই রাষ্ট্রে দলটির শাসন স্থায়ী হয় মাত্র ১১ বছর। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র দুই বছরের মধ্যেই জনসমর্থন হারাতে থাকে দলটি, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে এর প্রভাব দ্রুত কমে। এই রাজনৈতিক ক্ষয়ের মধ্য দিয়েই পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৪৯ সালে প্রথম বড় ভাঙনের সূচনা হয় ও গঠিত হয় ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’। যা পরবর্তীতে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “রাজনৈতিক দল নানাবিধ কারণে সৃষ্টি হয়ে আবার বিলুপ্তও হয়ে যেতে পারে। যেমন মুসলিম লীগ; ১৯০৬ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এর পতনের বড় কারণ ছিল দলটি সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণের চেয়ে জমিদার বা উচ্চবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় ছিল বেশি মনোযোগী। এই জনবিচ্ছিন্নতা ও অভ্যন্তরীণ ভাঙনের ফলেই পরবর্তীতে গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ।”
১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের কাছে শোচনীয় পরাজয় বরণ করে মুসলিম লীগ; ওই নির্বাচনে দলটি আসন লাভ করে মাত্র ৯টি। নানা ঘটনাপ্রবাহে ১৯৫৮ সালে মুসলিম লীগের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করলে চূড়ান্ত পতন ঘটে দলটির। এরপরই দলটি অভ্যন্তরীণ কোন্দল, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও প্রশাসনিক ব্যর্থতায় জর্জরিত হয়। পাকিস্তান আমলে ‘কনভেনশন’, ‘কাউন্সিল’ ও ‘কাইয়ুম’Ñএভাবে নানা ভাগে বিভক্ত হওয়ার ফলে পূর্ব পাকিস্তানে দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি ক্রমে ধসে পড়ে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের এই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে সময় দলটির বেশকিছু নেতা আওয়ামী লীগে যোগ দেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভূমিধস জয় পায়। বিজয়ী দলকে ক্ষমতা হস্তান্তরে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা টালবাহানা করে। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা স্বাধীনতার প্রস্তুতি নিতে থাকে। কিন্তু মুসলিম লীগের নেতারা অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয়। এ বিষয়ে দলটির একাংশের বর্তমান মহাসচিব কাজী আবুল খায়ের প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর বারবার পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের কাছে নির্বাচিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এর দলিল রয়েছে। খান এ সবুরের উদ্দেশ্য ছিল যাতে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা পায়। তবে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের অনীহা ও ছাত্রনেতাদের স্বাধীন বাংলাদেশের দাবির কারণে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।”
প্রায় ১১৯ বছর আগে ঢাকায় জন্ম নেওয়া দলটির অস্তিত্ব এখন ঢাকাতেই অনেকটা নিভু নিভু। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মুসলিম লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে দলটির কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। এ সময় খান এ সবুরের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ পুনর্গঠিত হয় এবং ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে ২০টি আসন পেয়ে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দলে পরিণত হয়। তবে এই সাফল্যের পরপরই ফের আসে বিভক্তি। ১৯৭৯ সালে মুসলিম লীগ নেতা শাহ আজিজুর রহমান বিএনপিতে যোগ দিয়ে হন প্রধানমন্ত্রী। সে সময় দলের একটি বড় অংশ বিএনপিতে যোগ দেয়। একই সময় মুসলিম লীগ নেতা বি এ সিদ্দিকী ও সালাউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ পৃথক হয়ে যায়। ক্রমশই দুর্বল হতে থাকে দলটি। তবে এই বিভক্ত অবস্থাতেই ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ ৪টি আসনে জয় পায়, যা স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদে দলটির সর্বশেষ প্রতিনিধিত্ব। পরবর্তীতে দলটির একটি বড় অংশ জাতীয় পার্টি গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলে এর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা কার্যত শেষ হয়ে যায়।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী মুসলিম লীগের চেতনা ধারণ করে বর্তমানে ‘বাংলাদেশ মুসলিম লীগ’ ও ‘বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল’ নামে দুটি রাজনৈতিক রয়েছে। ২০০৮ সালে একটি ও অন্যটি ২০১৩ সালে নিবন্ধন পায়। বাংলাদেশ মুসলিম লীগের প্রতীক ‘হারিকেন’, যা দলটির ঐতিহাসিক প্রতীক, আর প্রতীক ‘হাত-পাঞ্জা’ হচ্ছে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল’র। নিবন্ধন থাকলেও এ দুটি দলের কার্যকর সাংগঠনিক তৎপরতা রাজনীতির মাঠে দৃশ্যমান নয়। জাতীয় ইস্যুতেও তাদের উপস্থিতি এখন ‘প্রেস বিজ্ঞপ্তি’তেই সীমাবদ্ধ। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মুসলিম লীগের এই দুই অংশ পৃথকভাবে অংশ নেয়। হারিকেন মার্কায় ভোটে অংশ নেন ১৭ জন, আর হাত-পাঞ্জা প্রতীকে ৩ জন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুলতান মাহমুদ রানা মনে করেন, নেতৃত্বের সংকট, আদর্শিক চর্চার অভাব ও জনগণের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাই মুসলিম লীগের পতনের মূল কারণ। এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন দলটির হাত-পাঞ্জা প্রতীক অংশের সভাপতি অ্যাডভোকেট শেখ জুলফিকার চৌধুরী বুলবুল। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “মুসলিম লীগের পতনের মূলে রয়েছে তৎকালীন নেতাদের ব্যর্থতা, অদূরদর্শিতা, হঠকারিতা ও সময়োপযোগী রাজনৈতিক কৌশলের অভাব। যার কারণে ধীরে ধীরে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে মুসলিম লীগ। প্রতিপক্ষ তাদের কৌশলে সফল হলেও মুসলিম লীগের তৎকালীন নেতাদের সময়োপযোগী পদক্ষেপের অভাব ছিল।”
অন্যদিকে মহাসচিব কাজী আবুল খায়ের দাবি করেন, ১৯৪৯ সাল থেকে শুরু হওয়া বিভক্তির পেছনে ভারতীয় ‘আধিপত্যবাদী’ প্রভাব কাজ করেছে, যা এখনও অব্যাহত। ভারত চায় না মুসলিম লীগ ঘুরে দাঁড়াক। কারণ মুসলিম লীগই প্রথম ভারত ভেঙে মুসলমানদের জন্য রাষ্ট্র গঠন করে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দলটির এই অংশটি সক্রিয় ছিল বলেও তিনি দাবি করেন।