ঈদের কেনাকাটা
কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬ ১১:২৯ এএম
রাজধানীর পান্থপথে বসুন্ধরা শপিংমলের বাইরে ঈদের কেনাকাটার জন্য আসা নারী-পুরুষের ভিড়। ছবি: আলী হোসেন মিন্টু
ঈদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস ঘিরে থাকে নতুন পোশাক। সেই উচ্ছ্বাসে সাড়া দিয়ে জমে উঠেছে ঈদবাজার। উৎসবকে রঙিন করে তুলতে দম ফেলার ফুরসত নেই বিপণিবিতানের কর্মীদের। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত প্রতিটি দোকানে ক্রেতার উপচে পড়া ভিড়। সরেজমিন শপিংমলগুলো ঘুরে দেখা যায়, বেশি কেনাবেচা হচ্ছে বিভিন্ন সিরিয়াল থেকে নামকরণ পাওয়া পোশাক। টেলিভিশন সিরিয়াল, নাটক কিংবা সামাজিক মাধ্যমে দেখা নতুন ফ্যাশন মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে বাজারে। ফলে প্রতি বছরই ক্রেতাদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে কোনো-না কোনো বিশেষ পোশাক। বিক্রেতারা জানান, এ বছর ঈদ সামনে রেখে শিশুদের পছন্দে অভিভাবকরা ঝুঁকছেন ওয়েস্টার্ন পোশাকের দিকে।
রাজধানীর খিলক্ষেত ও মিরপুর ঘুরে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি দোকানই ঝলমলে ওয়েস্টার্ন কালেকশনে সাজানো হয়েছে শিশুদের জন্য। ফ্রক, গাউন, স্কার্ট-টপ, কিডস কামিজ, টু-পিস ও থ্রি-পিসÑ বিভিন্ন ডিজাইন ও রঙে শোভা পাচ্ছে শোকেস। কোথাও ঝিলমিল নেটের কাজ, কোথাও আবার কার্টুন প্রিন্ট কিংবা পার্টি ওয়্যারের আভিজাত্য। এসব পোশাকের দামও কম নয়, ৬৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকাচ্ছেন দোকানিরা। দরদাম মিললে তবেই কিনছেন ক্রেতারা।
মিরপুরে দুই মেয়ের জন্য ঈদের জামা কিনতে এসেছেন রাসেল আহমেদ। কয়েকটি দোকান ঘুরে একটি দোকানে ট্রায়ালসহ ওয়েস্টার্ন পোশাক দেখেন। মেয়েদের পছন্দও হয়। তবে দাম শুনে থমকে যেতে হয় তাকে। তিনি বলেন, ‘এক জোড়া জামার দাম চাইছে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। দরদাম করলাম, কমাল না। শেষে না কিনেই বের হয়ে এলাম।’ পরে অন্য একটি দোকান থেকে ২ হাজার টাকায় এক জোড়া জামা কিনেছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দামাদামি না করলে ঠকতে হয়।’
বিক্রেতারা বলছেন, শিশুদের পোশাকের বাজার এখন পুরোপুরি ট্রেন্ডনির্ভর। একজন বিক্রেতা জানান, এখন শিশুরা নিজেরাও ইউটিউব-ফেসবুক দেখে পছন্দ করে। অভিভাবকরা সেই অনুযায়ী কিনতে চান। তবে ওয়েস্টার্ন ডিজাইনের চাহিদা বেশি। বিশেষ করে পাঁচ থেকে দশ বছর বয়সী শিশুদের জন্য পার্টি টাইপ ড্রেসের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিক্রেতারা জানান, শিশুদের ফ্রক ২ থেকে ৫ হাজার টাকা, ওয়েস্টার্ন ২ থেকে ৩ হাজার, লেহেঙ্গা ৪ থেকে ৯ হাজার এবং পাকিস্তানি ফার্সি ড্রেস বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে। এ ছাড়াও ছেলেশিশুদের পাঞ্জাবি, শার্ট ও প্যান্ট বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকার ধারেকাছে।
ছেলেকে নিয়ে শপিং করতে আসা চুমকি বেগম আগের দিনের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘একসময় বাচ্চাদের জন্য থান বা শিট কাপড় কিনে দর্জির কাছে জামা বানিয়ে নিয়েছি। এখন আর তার চল নেই। সবাই রেডিমেড আর ওয়েস্টার্ন জামা চায়। দর্জির কাছে বানানো জামা পরতে চায় না।’ শিশুদের পোশাকের দামও অনেক বেড়েছে বলে জানান ক্রেতারা। বাচ্চাদের সাধারণ ফ্রক, পাঞ্জাবি-পায়জামা সেট ৮০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
মিরপুরে সাত বছরের কন্যাকে নিয়ে কেনাকাটা করতে এসেছে লায়না-সুমন দম্পতি। তারা জানান, ‘ঈদের আগে ভিড় বাড়লে পছন্দের জিনিস পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই আগেই চলে এসেছি। বাসা থেকে মোবাইলে কয়েকটা ডিজাইন দেখে এসেছি, কিন্তু এখানে খুঁজে পাচ্ছি না। তাই এক দোকান থেকে আরেক দোকান ঘুরছি।’
অন্যদিকে গজ কাপড়ের দোকানগুলোতে নেই ঈদের আগের সেই পুরনো ইমেজ। এসব দোকানে ভিড় করা ক্রেতাদের অধিকাংশই মধ্যবয়সী কিংবা বয়স্ক। দোকানিরাও জানান, গজ কাপড়ের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ কম। ম্যাক্সির কাপড় কিনতে আসা জাহানারা বেগম নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘তিন ধরনের কাপড় দেখিয়েছেÑ গজপ্রতি ৮০, ১১০ আর ১২০ টাকা। ১২০ টাকা দামের ১৩ গজ কাপড় কিনেছি।’ দামের পার্থক্য সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগেও এমন দামেই কিনেছি। খুব বেশি বাড়েনি।’
দোকানিরা জানান, সুতি কাপড় গজপ্রতি ১০০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। জর্জেট ১৮০ থেকে ৭০০ টাকা। জুট কটন ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকার মধ্যে। তবে আগের তুলনায় গজ কাপড়ের বিক্রি কিছুটা কমেছে। কারণ হিসেবে তারা বলেন, ‘দর্জির মজুরি বৃদ্ধি এবং সময় সংকট। অনেকেই ঝামেলা এড়াতে চান, তাই রেডিমেডই তাদের পছন্দ।’
তবে পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক লুঙ্গির বাজার বেশ চড়া। দেশের বড় পাইকারি বাজার গাউছিয়া মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, ‘বিভিন্ন মান ও ডিজাইনের লুঙ্গি সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির লুঙ্গি ৪০০ টাকা থেকে শুরু করে ১২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কিছু সাধারণ মানের লুঙ্গি ৩৫০ টাকায়ও পাওয়া যাচ্ছে। দোকানি হায়দার মাহমুদ বলেন, ঈদের আগে লুঙ্গির বিক্রি বাড়ে। অনেকে নিজের জন্য, আবার উপহার দেওয়ার জন্যও কেনেন। ভালো মানের সুতির লুঙ্গির দাম বেশি হলেও ক্রেতারা মান দেখেই কিনে থাকেন।
গাউছিয়া মার্কেটের একটি দোকানে দেখা যায়, ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি মনোযোগের সঙ্গে সাদা রঙের লুঙ্গি দেখছেন। কাপড়ের বুনন, পাড়ের কাজ, মোটা না চিকনÑ সবকিছু খুঁটিয়ে যাচাই ও দরকষাকষি করছেন। বিক্রেতা সুমন বলেন, লুঙ্গি ভালো হলে টেকসই হয়, তাই অনেকে একটু বেশি দামে কিনতেও রাজি।