কাউসার আহমেদ
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৬ ১৪:০৮ পিএম
ঈদের কেনাকাটা জমজমাট হয়ে উঠেছে। বৃহস্পতিবার নিউমার্কেট থেকে তোলা । ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মুসলিম ধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। ঈদ ঘিরে নতুন পোশাক, জুতা, প্রসাধনী কিংবা শিশুদের ছোটখাটো চাহিদাÑ সব মিলিয়ে জমে ওঠে কেনাকাটার উৎসব। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তানের ফুটপাতও এর বাইরে নয়। তুলনামূলকভাবে কম দামে পছন্দের পণ্য পাওয়ার আশায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে এই ফুটপাতের বাজার।
শুক্রবার রাজধানীতে ঈদের কেনাকাটা যে আরও জমজমাট হয়ে উঠবে পাওয়া যাচ্ছে এমন আভাস। নতুন মাসের প্রথম ছুটির দিন। এরই মধ্যে বেতন পেয়েছেন চাকরিজীবীরা। তার প্রভাব যে ঈদের বাজারে পড়বে তা বলাই বাহুল্য।
এদিকে রমজানের দ্বিতীয় সপ্তায় গুলিস্তানের ফুটপাত যেন রঙিন এক মেলায় পরিণত হয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, রাস্তার ওপর সারি সারি জুতার দোকান, ভ্যানে সাজানো শার্ট-প্যান্ট, শিশুদের ফ্রক, থ্রিপিস, টি-শার্টÑ সবকিছুতেই ঈদের ছোঁয়া। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার মতো জায়গা নেই। ক্রেতাদের ভিড় ঠেলে সামনের দিকে এগোতে হয়। কেউ দাঁড়িয়ে দরদাম করছেন, কেউ পছন্দের কাপড় হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন সেলাই।
বড় বড় শপিং মলের তুলনায় এখানে
ভিড় যেন আরও বেশি। কারণ একটাইÑ দাম তুলনামূলক কম, আর দরদামের সুযোগ আছে।
গুলিস্তান স্পোর্টস মার্কেটের পাশে রাস্তার একপাশে কাগজে মোড়ানো ছোট্ট
একটি দোকানে নতুন কাপড় তুলেছেন রাজিব মোল্লা। মাথার ওপরে অস্থায়ী ছাউনি, সামনে সাজানো
বিভিন্ন রঙের শার্ট ও পাঞ্জাবি। তিনি বলেন, ঈদ সামনে রেখে নতুন মাল তুলছি। আগে শীতের
কিছু মাল ছিল, সেগুলা কিছু আছে। এখন গরমের কালেকশন বেশি রাখছি। ১০ রমজান চলে গেছে,
তাই মানুষজনও বেশি আসতেছে। বিক্রিও ভালো।
পাশেই বসে আছেন হাফিজ উদ্দিন। সামনে সারি সারি জুতা সাজানোÑ স্যান্ডেল,
স্নিকার্স, লোফার। তিনি জানান, অধিকাংশ জুতাই ‘ঈদ কালেকশন’। বিক্রি কেমন জানতে চাইলে
হাসিমুখে বলেন, আজকে ইফতারের আগ পর্যন্ত ১০ জোড়া বিক্রি করছি। দিনের লাভ চলে আসছে।
ক্রেতাদের ভিড়ের মধ্যে দেখা যায় রমেজ উদ্দিনকে। হাতে একটি কালো রঙের
জুতা নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখছেন। পেশায় দারোয়ান। স্ত্রী ও সন্তানের জন্য জুতা কিনতে এসেছেন।
অনেকটা সময় দরদামের পর ১০০ টাকা কমিয়ে দুই জোড়া জুতা ৭০০ টাকায় কিনলেন। খানিকটা আক্ষেপের
সুরে বললেন, ঈদ আসছে বলে দাম বেশি চায়। প্রায় ১৫০ টাকা বেশি মনে হয় দিছে।
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর নিয়ে অনেক ঘোরাঘুরি করে নাতির জন্য নতুন
জামা কেনার আনন্দ লাইলা বেগমের চোখে মুখে। জানালেন, যেখানে কাপড় পছন্দ হয়, সেখানে দাম
বেশি। আবার যেখানে দাম মেলে, সেখানে রঙ বা কাপড় ভালো লাগে না।
বিক্রেতা মোহাম্মদ হানিফ জানান, এ বছর নতুন স্টাইলের জামা এসেছে।
বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের জন্য টি-শার্ট, জিন্স ও পাঞ্জাবির চাহিদা বেশি। তবে দাম কিছুটা
বেড়েছে। তিনি বলেন, পাইকাররা আমাদের কাছ থেকে এখনই বেশি দাম রাখছে। ১৫ রোজার পর আরও
বাড়তে পারে। তাই অনেকেই এখন কিনে নিচ্ছে।
শামসুল আলম। রিকশা চালান গুলিস্তান এলাকায়। তিনি বলেন, আমার আয় সীমিত।
দিনে কাজ করি হাজার / পনেরশ টাকা। তাই এখান থেকে ছেলেমেয়েদের জন্য জামা কাপড় কিনেছি।
বড় দোকানে গেলে দাম বেশি। তার সঙ্গে কথা বলার সময় আইনুল নামের অন্য এক রিকশাচালক এগিয়ে
এসে বলেন, আমরা দিনে আনি দিনে খাই। সবার মার্কেট ঠিকমতো করতে পারি না। এর মধ্যে ছোট
ছেলেমেয়ে বায়না করে আছে। নতুন জুতা কিনে দিতে। এটা কীভাবে জোগাড় করব সে চিন্তায় আছি।
চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের দোকানি আরিফুল ইসলাম বলেন, বিক্রি মাত্র
শুরু হচ্ছে। এখনও পুরোদমে শুরু হয়নি। কয়েক দিনের মধ্যেই বাড়বে আশা করছি।
মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, নারীদের থ্রিপিস বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪ হাজার টাকার মধ্যে। দেশীয় কটন ও লনের চাহিদা বেশি। জমকালো কাজের পোশাকের দাম তুলনামূলক বেশি। শাড়ি মিলছে ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৮-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
তবে মাঝামাঝি দামের কাপড়ের চাহিদা বেশি বলে জানিয়েছেন দোকানিরা। এ ছাড়া,
পুরুষদের পাঞ্জাবি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। শিশুদের
পোশাকের দামও কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা। বাচ্চাদের ফ্রক, পাঞ্জাবি-পায়জামা
সেট ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
কাপড় কিনতে আসা সায়রা আক্তার বলেন, ঈদের আগে ভিড় বাড়বে, তাই আগেই
কেনাকাটা করতে এসেছি। দেখা যাবে পরে আসলে মানুষের ভিড়ে কেনা কঠিন হয়ে যাবে। রাজধানীর
কল্যাণপুর থেকে নিউমার্কেটে কেনাকাটা করতে আসেন লায়লা বেগম ও রাজীব দম্পতি। তারা বলেন,
সন্তানদের জন্য মার্কেটের ভেতর থেকে কেনাকাটা করলেও নিজেদের জন্য তারা ফুটপাতের দোকানে
পণ্য খুঁজছেন। পোশাকের দাম এবার অনেক বেশি। দুই সন্তানের জন্য ৩ হাজার টাকা বাজেট থাকলেও
খরচ হয়ে গেছে ৫ হাজার টাকারও বেশি। তাই এখন স্ত্রীর থ্রিপিস আর নিজের জন্য প্রয়োজনীয়
জিনিসগুলো সাধ্যের মধ্যে ফুটপাত থেকেই কেনার চেষ্টা করছি। নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির
যুগ্ম আহ্বায়ক ইউসুফ আলী শামীম বলেন, এবার পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকায় দাম নাগালের
মধ্যেই আছে। গতবার পোশাকের দাম ৩০ শতাংশ বাড়লেও এবার বেড়েছে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ।