× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

যাচাই-বাছাই করে আবারও টিসিবির ডিলার নিয়োগ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬ ০৯:১৪ এএম

ভোক্তা অধিকারকর্মীদের ভাষ্য, ডিলারশিপকে রাজনৈতিক পুরস্কারে পরিণত করায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। যে ডিলার রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকে, সে জবাবদিহি এড়িয়ে যেতে পারে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ভোক্তা অধিকারকর্মীদের ভাষ্য, ডিলারশিপকে রাজনৈতিক পুরস্কারে পরিণত করায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। যে ডিলার রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকে, সে জবাবদিহি এড়িয়ে যেতে পারে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দীর্ঘ সতের বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ডিলার নিয়োগে দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছিল। এমন অভিযোগের সূত্র ধরে সম্প্রতি নতুন সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে টিসিবির সব আঞ্চলিক ও ক্যাম্প অফিসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ও পরে নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারদের হালনাগাদ তথ্য নিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ৫ আগস্ট-পূর্ব ও পরবর্তী নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকা মিলিয়ে টিসিবি ডিলারদের নতুন করে কাঠামোগত সংস্কার ও পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ডিলার নিয়োগের সংক্ষিপ্ত পরিসংখ্যান : নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, টিসিবির পাঠানো সমন্বিত তালিকা অনুযায়ী, সারা দেশে মোট কর্মরত ডিলার সংখ্যা ৭২০০। এর মধ্যে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর আগে নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলার সংখ্যাই বেশি; ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত নতুন করে নিয়োগ পেয়েছে ৫১৭ জন ডিলার। একই সঙ্গে নিয়োগ অবশিষ্ট/শূন্য ডিলার পদ রয়েছে ২৫৬১টিÑ যা মোট কাঠামোর একটি বড় অংশ। 

টিসিবি সূত্র জানাচ্ছে, ‘নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিগত সময়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক সুপারিশ বড় ভূমিকা রাখত। এখন তালিকা পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে সেটি যাচাই করা হচ্ছে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও ‘পরিচয়ই’ ছিল মানদণ্ড

মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ী ও সাবেক আবেদনকারীদের অভিযোগ, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা বা আর্থিক সক্ষমতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ই ছিল প্রধান মানদণ্ড। একাধিক জেলায় একই পরিবারের দুই-তিন সদস্যের নামে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দলীয় পদধারীদের আত্মীয়স্বজনের অগ্রাধিকার, এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ‘সুপারিশপত্র’ ছাড়া আবেদন অগ্রসর না হওয়ার নজিরও পাওয়া গেছে।

এক জেলা শহরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যবসায়ী জানান, তার গুদাম আছে, ট্রাক আছে, ২০ বছর ধরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালানোর অভিজ্ঞতা আছেÑ তবুও পাননি ডিলারশিপ। কারণ তিনি দলীয় কর্মী নন। তার অভিযোগ, আবেদন জমা দেওয়ার পরও ফাইল ‘ওপরে’ ওঠেনি।

ভোক্তা অধিকারকর্মীদের ভাষ্য আরও কঠিন। তাদের মতে, ডিলারশিপকে রাজনৈতিক পুরস্কারে পরিণত করায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। যে ডিলার রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকে, সে জবাবদিহি এড়িয়ে যেতে পারে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য বিতরণ না করা, পরিচিতদের অগ্রাধিকার দেওয়াÑ এসব অনিয়ম বাড়ে। 

তবে ৫ আগস্ট-পরবর্তী বিলুপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও গোষ্ঠীপ্রীতির বিতর্ক থামেনি। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় বিভিন্ন জেলায় সাবেক উপদেষ্টাদের পরোক্ষ সুপারিশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংগঠনের সমর্থকদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। এতে করে ‘দখলদারত্বের’ দ্বৈত চিত্র তৈরি হয়েছেÑ পুরনো বলয় অটুট, তার ওপর নতুন বলয়ের স্তর। ফলে নিয়োগ-প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়নিÑ এমন ধারণা প্রশাসনের ভেতরেও রয়েছে।

বিএনপি-সমর্থিত ব্যবসায়ীদের একটি অংশ দাবি করছে, আওয়ামী লীগ আমলে তাদের আবেদন উপেক্ষিত হয়েছে। এ কারণে নতুন সরকারের উচিত এসব নিয়োগ যাচাই-বাছাই করে দেখা এবং পুনর্বিন্যাস করা। এমন প্রেক্ষাপটে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছেÑ দলীয় বিবেচনা নয়, সক্ষমতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে তালিকা হালনাগাদ করতে হবে। 

তালিকা যাচাই-বাছাই করে নতুন নিয়োগ

সরকার গঠনের পরপরই আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় টিসিবির নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলারদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চাওয়া হয়। সব আঞ্চলিক ও ক্যাম্প অফিস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একটি সমন্বিত তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং তা খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

সূত্রমতে, বর্তমানে শূন্য ২৫৬১টি পদ দ্রুত পূরণের পাশাপাশি অচিরেই ৫ আগস্ট-পূর্ব ও পরবর্তী নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা, আর্থিক সক্ষমতা, গুদামজাতকরণ সুবিধা ও বিতরণ দক্ষতা যাচাই করা হবে। প্রয়োজনে অযোগ্য বা অনিয়মে জড়িতদের বাদ দিয়ে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, টিসিবির ডিলারশিপ শুধু ব্যবসায়িক লাইসেন্স নয়। এটি নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকিপণ্যের সরবরাহ, শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এসব নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব থাকলে বাজারে কৃত্রিম সংকট বা বণ্টনে বৈষম্য তৈরি হতে পারে।

মাঠপর্যায়ে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও ভোক্তার ভোগান্তি

কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিছু ডিলার নির্ধারিত সময়ে পণ্য বিতরণ করেন না বা পরিচিত গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দেনÑ এমন অভিযোগ রয়েছে। আবার কোথাও কোথাও ক্ষমতাধরদের একই পরিবারের সদস্যদের নামে লাইসেন্স নেওয়ার নজির পাওয়া গেছে। ভোক্তা অধিকার কর্মীরা বলছেন, ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা না থাকলে বাজার নিয়ন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। স্বচ্ছতার লক্ষ্যে অনলাইন আবেদন ও প্রকাশ্য স্কোরিং পদ্ধতি চালু করা, জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে উন্মুক্ত শুনানি ও নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন অবশ্যক। 

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক জেলা প্রশাসক বলেন, “ডিলার নিয়োগ যদি প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতর থেকে পর্যবেক্ষণ না করা হয়, তবে রাজনৈতিক প্রভাব ঠেকানো কঠিন।”

কাঠামোগত সংস্কার নাকি প্রতিস্থাপনের রাজনীতি

বিএনপির নতুন সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, টিসিবির ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। তবে অনেকের প্রশ্ন, এটি কি কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ, নাকি পূর্ববর্তী প্রভাব বলয় সরিয়ে নতুন রাজনৈতিক বলয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া?

অর্থনীতিবিদদের মতে, ৭২০০ জন ডিলারের নেটওয়ার্ক দেশের ভোক্তা-বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। ২৫৬১টি শূন্য পদ পূরণ এবং বিদ্যমান ডিলারদের পুনর্মূল্যায়নÑ দুটি প্রক্রিয়াই যদি নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়, তবে বাজার স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। না হলে রাজনৈতিক প্রতিস্থাপনের চক্র অব্যাহত থাকবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘“এবারের লক্ষ্য হলো দলীয় নয়, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ডিলার নেটওয়ার্ক গড়া। বাস্তবে সেই লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা নির্ভর করবে তালিকা যাচাই ও নতুন নিয়োগের স্বচ্ছতার ওপর।”

সব মিলিয়ে টিসিবি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। কারণ নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা যদি দলীয় দখলদারত্বে আবদ্ধ থাকে, তবে বাজার স্থিতিশীলতার লক্ষ্য পূরণ হবে না।

এখন তাই দেখার বিষয়, নতুন সরকারের যাচাই-বাছাই কতটা নিরপেক্ষ হয়। যদি এটি কাঠামোগত সংস্কারে রূপ নেয়, তবে টিসিবি জনস্বার্থে কার্যকর হতে পারে। আর যদি কেবল প্রভাবের রঙ বদলায়, তবে ডিলারশিপ থাকবে রাজনৈতিক পুরস্কার আর ভোক্তার ভোগান্তি চলবে আগের মতোই। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা