মাসুদ রানা
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬ ১২:০০ পিএম
১৯৭১ সালের ৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
১৯৭১ সালের ৪ মার্চ ছিল বৃহস্পতিবার। পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিমান-রেল-বাস-স্টিমার, ব্যাংক-স্টক এক্সচেঞ্জসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।
পাকিস্তান সামরিক বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। ২ ও ৩ মার্চ সামরিক বাহিনীর গুলিতে ঢাকায় ১২১ জন, চট্টগ্রামে ১২১ জন, খুলনায় ৭ জনসহ সারা বাংলায় কয়েকশ মানুষ নিহত হয়।
এই গণহত্যার নিন্দা জানিয়ে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, “পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই সামরিক ও বেসামরিক সরকারগুলো বাংলার নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে। নির্যাতন ও গণহত্যা করেছে।” এবারের পরিণাম ভয়াবহ হবে বলে তিনি পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের হুঁশিয়ারি দেন। তিনি শাসকদের সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, “পাকিস্তানিদের নির্যাতনে ৮৫% বাঙালি ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর মুখোমুখি এসে পৌঁছেছে। সুতরাং হত্যাকারীদের সঙ্গে যারাই আঁতাত করবে বা করতে যাবে তাদের জানমাল বিপন্ন হবে।”
এই দিন মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সাত কোটি বাঙালির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের দাবি জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও ৫৫ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ‘পাকিস্তান অবজারভার’-এর গণবিরোধী ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানান।
অ্যাডমিরাল আহসান পশ্চিম পাকিস্তানে রওনা হয়ে যান। টেলিফোনে লে. জে. টিক্কা খানকে পূর্বাঞ্চলের গভর্নর নিয়োগ করা হচ্ছে; সংবাদ পেয়ে লে. জে. সাহেবজাদা ইয়াকুব খান পদত্যাগ করতে চান। রাত ১১টায় শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে রাও ফরমান আলী কিছু প্রস্তাব নিয়ে যান। সেখানে রাও ফরমান আলী বলেন, “সেনাবাহিনীর সাথে সংঘাতে লিপ্ত হওয়া খুব ভালো হবে কি?”
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন আয়োজিত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের জনসভায় নেতারা বলেন, “সাম্প্রদায়িক সপ্রীতি বজায় রাখতে হবে। বাংলার স্বাধিকারের সংগ্রামকে ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। আর এ জন্যই পাড়ায়-পাড়ায়, গ্রাম-গঞ্জে সংগ্রাম কমিটি ও মুক্তিবাহিনী গড়ে তুলতে হবে। শ্রমিক কৃষক ছাত্র জনতাকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।”
বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র শিল্পীরাও আন্দোলনে একাত্বতা জানান। রেডিও ও টেলিভিশন হরতালের সমর্থনে জয় বাংলার বন্দনাগীতি প্রচার করে। ফলে রেডিও পাকিস্তান ‘ঢাকা বেতার কেন্দ্রে’ পরিণত হয়।
এই দিন ফরিদপুরে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। সর্বসাধারণ এই হরতালের প্রতি একাত্মতা জানান। ফরিদপুরের প্রতিটি এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল হয়। যেটি ছিল ফরিদপুরে স্মরণকালের ইতিহাসে বৃহত্তম প্রতিবাদ মিছিল।
রাজশাহীতে ৪ ঘণ্টা সান্ধ্য আইন বিরতি দিয়ে সকাল ১০টা থেকে পরের দিন সকাল ৭টা পর্যন্ত পুনরায় জারি করা হয়। সামরিক আইন প্রশাসনের সেনা দপ্তর থেকে টেলিফোনে ভাইস চ্যান্সেলরকে বলা হয়, “যেকোনো ছাত্রকে রাস্তায় দেখা মাত্র গুলি করার নির্দেশ রয়েছে।” পাকিস্তানি সৈন্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ছাত্রকে রাজশাহী শহর থেকে গ্রেপ্তার করে।
এই দিন খুলনায় কারফিউ বহাল থাকে। কারফিউ উপেক্ষা করে প্রায় ২৫ হাজার ছাত্র-জনতা শহিদ হাদিস পার্কে একত্রিত হয়ে জনসভা করে। সেখানে মিছিলে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি চালালে তিন জন শহিদ হন। ট্রেনের লাইন বিচ্ছিন্ন করতে খুলনায় রেললাইনের পাটি তোলার সময় পুলিশের গুলিতে চার জন শহিদ হন। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় খুলনায় নিহত ৬ জন ও আহত ৩৩ জনের কথা উল্লেখ করা হয়। যদিও এ দিন খুলনায় ৭ জন শহিদ হন।
চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অনেকটা থমথমে ছিল, বাঙালি-অবাঙালি সংঘর্ষে কয়েকজন হতাহত হন। এই দিন চট্টগ্রামে ১১৩নং সামরিক আইন জারি করা হয়। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় বলা হয়, “বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী গতকাল (বুধবার) ও আজকে (বৃহস্পতিবার) গোলাগুলী, অগ্নিসংযোগ ও সংঘাতে নিহতের সংখ্যা ১২১-এ উন্নীত হয়েছে এবং আরও নিহত হওয়র আশঙ্কা করা হয়েছে।”
যশোরে মিছিলে পাকিস্তানি বাহিনী গুলি চালায়, তাদের গুলিতে চারুবালা ধর প্রথম শহিদ হন। সামরিক বাহিনীর হাতে নিহত হওয়া বিক্ষোভকারীদের স্মরণে বিভিন্ন জেলায় গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়।