দুর্নীতি
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৪ মার্চ ২০২৬ ১১:২৮ এএম
সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রদবদল হলেও খাদ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন ঢাকা বিভাগের একাধিক লোকাল সাপ্লাই ডিপো (এলএসডি) ঘিরে পুরনো প্রভাববলয়ের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে রদবদল হলেও খাদ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন ঢাকা বিভাগের একাধিক লোকাল সাপ্লাই ডিপো (এলএসডি) ঘিরে পুরনো প্রভাববলয়ের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন গুদাম কর্মকর্তা এখনও বহাল তবিয়তে আছেন। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন এলএসডিতে ঘুরেফিরে তারাই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছেন। সূত্র বলছে, ঢাকা বিভাগের কিছু এলএসডি দীর্ঘদিন ধরেই ‘সোনার হরিণ’ হিসেবে পরিচিত। এসব স্থানে পোস্টিং মানেই অতিরিক্ত সুবিধা ও প্রভাব। তবে অভিযোগের বিষয় খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে বলেও জানানো হয়।
ঢাকা বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুদাম সাভার এলএসডি। বর্তমানে এর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেলিম খন্দকার। তিনি সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। বিগত আওয়ামী লীগ আমলে তিনি একবার জয়দেবপুর এবং দুবার সাভার এলএসডির দায়িত্ব পালন করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘একই ব্যক্তি বারবার লাভজনক স্টেশনে দায়িত্ব পাওয়াটা স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
অভিযোগ রয়েছে, সেলিম খন্দকারের প্রভাবেই বিভিন্ন এলএসডিতে পোস্টিং-বাণিজ্য চলেছে। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
জয়দেবপুর এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমও একই প্রভাববলয়ের অংশ। সরকার পতনের পরপরই বিপুল অর্থের বিনিময়ে তাকে সেখানে পদায়ন করা হয়েছে। জয়দেবপুর এলএসডি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। এখানে দায়িত্ব পেতে লবিং চলেÑ এটা সবার জানা।
কালিয়াকৈর এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মিলন মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সাবেক সরকারের প্রভাবশালী উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ওই সময়ের রাজনৈতিক প্রভাবেই তিনি সেখানে পোস্টিং পান। ধামরাই এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. এনায়েত হোসেনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, সাবেক এক উপদেষ্টার সুপারিশে তার পদায়ন হয়েছিল।
কালিহাতী এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজিজুল হক দুলাল সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী গাজী গোলাম দস্তগীরের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি বহাল থাকায় অধিদপ্তরের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে। এ ছাড়া শ্রীপুর খাদ্য গুদামে বর্তমান নতুন সরকারের শপথের মাত্র দুদিন আগে হঠাৎ পোস্টিং হওয়া নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, ‘এখানেও একই প্রভাববলয়ের হাত রয়েছে।’
সূত্র মতে, শুধু ঢাকা বিভাগ নয়, টাঙ্গাইল, সিন্দিয়াঘাট, ভৈরবসহ একাধিক এলএসডিতেও একই ব্যক্তিরা ঘুরেফিরে দায়িত্ব পাচ্ছেন। যাদের হাতে অর্থ ও প্রভাব আছে, তারাই সুবিধা নিচ্ছেন। ভবনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় এ চক্র সক্রিয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, পদায়ন ও বদলি প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ীই হয়। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।
খাদ্য অধিদপ্তরের বিধিমালা অনুযায়ী, এলএসডি কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময় পরপর বদলি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কিছু কর্মকর্তা বারবার একই বা লাভজনক স্টেশনে ফিরে আসছেন। জনপ্রশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, বদলি-নীতির স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অভিযোগ চলতেই থাকবে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, একই ব্যক্তি যদি বারবার একই জায়গায় দায়িত্ব পান, তাহলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। এজন্য স্বচ্ছ ও ডিজিটাল ট্রান্সফার সিস্টেম জরুরি।
এদিকে খাদ্য বিভাগের অভ্যন্তরে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে। সুশাসন নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, পদায়ন-বদলি বাণিজ্য বন্ধে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন প্রয়োজন।
খাদ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলতে রাজি হননি।
সূত্র মতে, সরকার বদলালেও তাদের প্রভাববলয় বহাল থাকে, তাহলে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রশ্ন থেকেই যায়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ‘সোনার হরিণ’ খ্যাত গুদামগুলোর পদায়ন-রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবেÑ এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে খাদ্য সচিব মো. ফিরোজ সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। লোভনীয় পদায়নের বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবেন। ঘুরেফিরে একই জায়গায় থাকার সুযোগ নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে বদলির বিষয়ে নীতিমালা তৈরি করা হবে।