× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এলপিজির দাম কাগজে কমলেও বাজারে চড়া

কাউসার আহমেদ

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৯ এএম

এলপিজির দাম কাগজে কমলেও বাজারে চড়া

‘বাসায় লাইনে গ্যাস নাই। রান্নায় সিলিন্ডারের গ্যাসই ভরসা। মাঝে দুদফায় দাম বাড়লেও রমজানে ১৫ টাকা কমছে। কিন্তু আমরা তো সরকারি রেটে পাই না। বাধ্য হয়েই বেশি দামে কিনতে হয়’Ñ রাজধানীর ভাটারা এলাকার গৃহিণী সুরাইয়া বেগম ক্ষোভ ও হতাশা মিশ্রিত কণ্ঠে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে কথাগুলো বলছিলেন। গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে তার মতো আরও অসংখ্য পরিবার এখন বিড়ম্বনার শিকার। সরকারি ঘোষণায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম কমার খবর এলেও খুচরা বাজারে প্রতিফলন না থাকায় ভোক্তাদের দুর্ভোগ ও অসন্তোষ বাড়ছে।

শুক্রবার রাজধানীর জোয়ার সাহারা, কুড়িল বিশ্বরোড ও ভাটারা এলাকা ঘুরে ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, ঘোষিত দামের সঙ্গে খুচরা বাজারে পার্থক্য এখনও লাগামছাড়া। সরকার ফেব্রুয়ারি মাসে ১২ কেজি এলপিজির দাম ১৫ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু অধিকাংশ খুচরা দোকানে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৫০ থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে। কিছু এলাকায় আরও বেশি দাম চাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। 

বাসাবাড়িতে রান্নার কাজ করা শাকিলা বেগম বলেন, ‘অনেক বাসায় রান্নায় গিয়েও ফিরে আসতে হয়। হঠাৎ গ্যাস শেষ হইয়া যায়। দোকানদাররা অনেক বেশি দাম চায়। তখন অনেকেই গ্যাস আনতে চায় না।’ 

সকালে হাতে ভাটারা এলাকায় গ্যাসের সিলিন্ডারের দোকানের সামনে রিকশা থেকে খালি গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে নামেন রায়হান মিয়া। কিছু সময় দাম বলে তর্ক করেন দেকোনাীর সঙ্গে। কিন্তু উপায়ান্তর না দেখে চড়া দামেই কিনতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, ‘১ হাজার ৮৪০ টাকা দিয়ে কিনছি। মাসে একটা সিলিন্ডার লাগে। আত্মীয়স্বজন এলে মাস ফুরায় না। এতে মাসিক ব্যয় বাড়ছে অনেক। রমজানে একটু রান্নাবান্না বেশি, ভাজাপোড়া আছে। এই সময়ে যদি সিলিন্ডারের দাম একটু কমত আমরা স্বস্তি পেতাম।’ 

যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম কমার প্রবণতা শুরু হয়েছে। তবে ভোক্তারা বলছেন বিপরীত কথা। ভাটারা এলাকার সিলিন্ডার ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, ‘কদিন আগেও ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বেচছি। এখন দাম কমছে। গেল সপ্তাহে বেচছি ১ হাজার ৮৫০ টাকায়। আর এখন বেচতেছি ১ হাজার ৭৫০ টাকায়। দাম আরও কমতে পারে।’ সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩৪১ টাকায় গ্যাস সিলিন্ডার কেন বিক্রি হচ্ছে নাÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কোম্পানি যে দামে মাল দেয়, তার সঙ্গে পরিবহন খরচ, লোড-আনলোড খরচ, দোকান ভাড়াÑ সব মিলিয়ে খুচরা পর্যায়ে ওই দামে বিক্রি করা সম্ভব না। আমরা তো লোকসান দিয়ে ব্যবসা করব না।’ তিনি দাবি করেন সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করে, তা মূলত কোম্পানি পর্যায়ের হিসাব। কিন্তু খুচরা বাজারে পৌঁছাতে বিভিন্ন ধাপে খরচ যুক্ত হয়। ফলে ঘোষিত দাম ও বাস্তব দামের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।

একই এলাকার আরেক ব্যবসায়ী মুক্ত বলেন, ‘আমি ছোট ডিস্ট্রিবিউটার। কোম্পানি থেকে কম দামে কিনতে পারি না। সিলিন্ডার প্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা লাভ করি। সরকার যদি আমদানিকারক ও বড় কোম্পানিগুলোকে ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে খুচরা বাজারেও দাম কমবে।’ এদিকে অনেক সময় সিলিন্ডারে গ্যাস কম থাকে বলে অভিযোগ করে ভোক্তা আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমার তিন সদস্যের পরিবার। আগে একটা সিলিন্ডার কিনলে দুমাস যেত, কিন্তু এখন এক মাস বা পাঁচ দিন আগেই সিলিন্ডার শেষ হয়ে যায়।’

বাড্ডায় হোটেলে ইফতারি বিক্রেতা ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘আগে একটা সিলিন্ডার কিনে রান্না করে বিক্রি করলে কিছু লাভ হতো। এখন এত দামে সিলিন্ডার কেনা লাগে, তাতে খরচ ওঠানোই কঠিন।’ 

ভোক্তাদের অভিযোগ, খুচরা ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে বাড়তি দাম নিচ্ছেন। সরকারি নজরদারি জোরদার না হলে ঘোষিত দাম কেবল কাগজেই থেকে যাবে। তবে নির্ধারিত দামের তালিকা দোকানে টাঙানো বাধ্যতামূলক করা হলেও বেশিরভাগ দোকানে তা দৃশ্যমান নয়। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা ঘোষিত দাম জানেন না বলেই বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন।

সংকট শুরু হয় যেভাবে : জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ও পরিবহনে জড়িত এলপিজি ভেসেলে আমেরিকান ট্রেজারি নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এ নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে এলসি (ঋণপত্র) জটিলতার কারণে দেশের বাজারে সম্প্রতি এলপিজি সংকটের শুরু। স্বাভাবিকভাবেই আমদানি কমে যাওয়ায় সরবরাহ চেইনে ঘাটতি দেখা দেয়। আর এ সংকটের সুযোগ নিয়ে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা এলপিজির দাম বাড়িয়ে দেন। শুরু করেন বেশি দামে বিক্রি। গত ডিসেম্বরে সংকট প্রকট হলে ঢাকার বাজারে ১২ কেজির প্রতি এলপিজি সিলিন্ডার ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ধীরে ধীরে বড় আমদানিকারকরা সরবরাহ বাড়ালেও সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে দাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে ১২ কেজি এলপিজির দাম ১৫ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৩৪১ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সরকারিভাবে সরবরাহ করা সাড়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়। এ ছাড়া গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির দাম প্রতি লিটার ৬১ টাকা ৮৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। বিইআরসি এবং জ্বালানি বিভাগ জানায়, ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে এলপিজি আমদানি করা হয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার টন। যদিও মাসে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৬০ হাজার টনের বেশি।

এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ এলপিজি আমদানি হচ্ছে, তাতে সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা নেই।’ আমদানিকারকরা সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রি করলেও খুচরা বাজারে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিষয়টি তদারকির জন্য প্রশাসন সক্রিয় রয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে দেশের বাজারে এলপিজি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম আগের নির্ধারিত পর্যায়ে ফেরার আশা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এলপিজি আমদানিকারক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে তিনি বলেন, ‘ভোক্তারা যেন সরকার নির্ধারিত দামেই এলপিজি পান, সেটি নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। বর্তমানে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩৪১ টাকা। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। আমরা চাই বাজারে এই অস্থিতিশীলতা দ্রুত দূর হোক এবং দাম আগের নির্ধারিত পর্যায়ে ফিরে আসুক।’ খুচরা পর্যায়ে কোনো ধরনের ‘মার্কেট অ্যাবিউজ’ বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জনভোগান্তি সৃষ্টি করা হলে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আগামী দিন থেকে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বাজার তদারকি বা নজরদারি আরও জোরদার করব, যাতে কোনো ভোক্তা বিড়ম্বনার শিকার না হন।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা