অন্তর্বর্তী সরকার
আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৩ এএম
আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪০ এএম
সংসদ ভবন
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩২টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করার জন্য জাতীয় সংসদের একজন অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যের নেতৃত্বে ‘বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হবে। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর অধ্যাদেশগুলোর একটি অংশ সেখানে উত্থাপন করা হবে। বিশেষ কমিটি পর্যালোচনা শেষে যেসব অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করার সুপারিশ করবে, সেগুলো বিল আকারে পাস হয়ে আইনে রূপান্তর হবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় সংসদের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে ১৩২টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। নির্বাচিত সরকার এই অধ্যাদেশগুলোর কোনগুলো আইনে পরিণত করা হবে আর কোনগুলো গ্রহণ করা হবে না তা নিয়ে কাজ শুরু করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, আইন-বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়। অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে যেগুলো বিএনপির ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সেগুলো বিল আকারে সংসদে উঠবে না এবং আইনেও রূপান্তর হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকটা মতদ্বৈধ দেখা দিয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অনেকগুলো অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে উত্থাপন না করার পক্ষে মত দিয়েছে। তবে সাংবিধানিক জটিলতা এড়িয়ে কীভাবে অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, সেজন্য বিকল্প ভাবনাও রয়েছে। যেমন, ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী সরকার অধ্যাদেশগুলো যেভাবে নিষ্পত্তি করেছিল একইভাবে এগুলোও নিষ্পণ্ন করার আলোচনা হয়েছে। অনেকের অভিমত, সে পথে গেলে এ নিয়ে আর বিতর্কের সুযোগ থাকবে না।
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের পটপরিবর্তনের পর ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১২২টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ অধ্যাদেশগুলো জারি করেন। নবম জাতীয় সংসদে মহাজোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় সবগুলো অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি মোট অধ্যাদেশের ৪০ শতাংশ অর্থাৎ মাত্র ৫৪টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করে। পরে তা বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হয় এবং তা আইনে পরিণত হয়।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির জারি করা এসব অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে তা আইনে রূপান্তর করতে হয়। না হলে অধ্যাদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়াসহ সব কাজের সঙ্গে বিএনপি পূর্ণ একমত ছিল না। অনেক সিদ্ধান্তে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল। তাই সেগুলোর ভবিষ্যৎ এখনই বলে দেওয়া সম্ভব।
আইন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্ডামের মাধ্যমে ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৪ সালের অবশিষ্ট সময়ে ১৭টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২০২৫ সালে জারি করা হয় ৮০টি এবং ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত ৩৫টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগের দিনে ১৬ ফেব্রুয়ারি ৬টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না থাকলেও অধ্যাদেশ জারির রেকর্ড করেন তিনি। জারিকৃত অধ্যাদেশগুলোর অনেকগুলো নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা, ফৌজদারি অপরাধ, দুর্নীতি দমন, অর্থ পাচার, জনপ্রশাসন ও শৃঙ্খলা, স্থানীয় সরকার, অর্থনীতি, রাজস্ব, কর ও বাজেট, ব্যাংকিং, আর্থিক খাত ও নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা, মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার ও সুশাসন বিষয় সম্পর্কিত। তবে এর অনেকগুলোর সঙ্গে বিএনপি একমত নয়।
সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে’, তিনি অধ্যাদেশ জারি করতে পারবেন; অর্থাৎ সংসদ অধিবেশন না থাকলে বা ভেঙে গেলে যদি এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ প্রয়োজন, যেমন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে, নতুন কোনো অপরাধ রোধে, বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা সাংবিধানিক শূন্যতা এড়াতে সংসদ অধিবেশন না ডাকা পর্যন্ত এই অধ্যাদেশ গুরুত্বপূর্ণ তবে কেবল রাষ্ট্রপতি একটি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন।
প্রশ্ন উঠেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকালে ১৩২টি অধ্যাদেশ জারি হওয়ার মতো জরুরি পরিস্থিতি বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছিল কি না। সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদে অধ্যাদেশ জারির জন্য তিনটি শর্তও রয়েছে। যাতে বলা আছে, সংসদ যে আইন তৈরি করার ক্ষমতা রাখে না, অধ্যাদেশ দিয়ে সেই ধরনের কোনো আইন করা যাবে না। অধ্যাদেশ দিয়ে সংবিধানের কোনো অংশ পরিবর্তন বা বাতিল করাও সম্ভব নয়। এমনকি আগে করা কোনো অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করা যায় না।
অধ্যাদেশের স্থায়িত্ব ও অনুমোদন বিষয়ে অনুচ্ছেদ ৯৩(২)-এ বলা আছে, ‘পরবর্তী নির্বাচিত সংসদ অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই অধ্যাদেশসমূহ উপস্থাপন করতে হবে। সংসদ চাইলে তা পাস করতে পারে বা বাতিল করতে পারে। সংসদ বসার ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে অধ্যাদেশটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।’ এ ছাড়া সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় বাংলাদেশের বিচার বিভাগ জুডিসিয়াল রিভিউ বা বিচারিক পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো অধ্যাদেশের বৈধতা যাচাই করতে পারেন। আদালত যদি মনে করেন, জরুরি পরিস্থিতি ছিল না বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে, তাহলে আদালত সেটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারেন।
আগামী ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ওই দিন থেকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে অধ্যাদেশ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তর করতে হবে। এর মধ্যে যেগুলো আইনে পরিণত হবে না, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বা অকার্যকর হয়ে যাবে। বিশেষ কমিটি গঠন করলে তা যাচাই-বাছাইয়ে আরও কিছু সময় পাওয়া যাবে।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির জারি করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে সংবিধানের ৮৭, ৮৯ ও ৯০ অনুচ্ছেদের বিধান প্রয়োজনীয় উপযোগীকরণসহ পালিত হবে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকারের বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি, বার্ষিক আর্থিক বিবৃতি সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং নির্দিষ্টকরণ আইন নিয়ে বিস্তারিত বলা আছে। এগুলোর বেশিরভাগই বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করা হবে।
পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এ ক্ষেত্রে ওয়ান ইলেভেন-পরবর্তী সরকারের পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার। সে অনুযায়ী বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোর যেগুলোর ব্যাপারে নতুন সরকার একমত নন, সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করা হবে। যেগুলো আইনে পরিণত করা হবে, সেগুলোর যাচাই-বাছাই চলছে। যাচাই-বাছাই শেষে তালিকা চূড়ান্ত করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। অধিবেশন বসার আগেই যেসব অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করার সিদ্ধান্ত হবে, সেগুলোর খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। বিশেষ কমিটি গঠন করে সেগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের অভিমত, ‘অধ্যাদেশ একটি সাময়িক প্রক্রিয়া। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর এর কার্যকারিতা থাকে না। অধ্যাদেশ হওয়া উচিত ছিল অতি জরুরি ও জনগুরুত্বসম্পন্ন। সেটা গত দেড় বছরে আমরা দেখিনি। রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য অধ্যাদেশ জারি করা কোনোভাবেই ভালো কাজ নয়।’ তার মতে, ‘এই অধ্যাদেশগুলোর অধীনে কিছু কার্যক্রম, পদক্ষেপ, নিয়োগ বা পুরনো কোনো কার্যক্রম বাতিল করা হয়েছে। তবে এই অধ্যাদেশগুলোর কার্যকারিতা শেষ হয়ে গেলে, এসব অধ্যাদেশের অধীনে গৃহীত কার্যক্রমের পরিণতি কী হবে তা ভাবা উচিত ছিল।’
তার মতে, ‘একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এত বেশি অধ্যাদেশ জারি করার প্রয়োজন ছিল না। নতুন সংসদ বসার পর যেগুলো আর আইনে পরিণত হবে না সেই অধ্যাদেশগুলোর আওতায় গৃহীত পদক্ষেপগুলো তো আর বৈধ থাকল না। নির্বাচিত সরকারের নিজস্ব ইশতেহার ও মতামত রয়েছে। তারা সবগুলো অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করতে পারবে না বা করবে না। অতীতেও এমনটা ঘটেছে। সে ক্ষেত্রে অতীতের অনেক কাজ তার বৈধতা হারাবে।’