তানভীর হাসান ও আরমান হেকিম
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৬ এএম
বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান দেশে ব্যবসা করতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও বিকাশের এই ডিস্ট্রিবিউটর কোনো নিয়মেরই ধার ধারেনি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্বজুড়ে আলোচিত পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে নাম উঠে এসেছে জেটলাইট ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠান জেন ইন্টারন্যাশনালÑ যেটি বাংলাদেশের জনপ্রিয় মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস নেটওয়ার্ক বিকাশের ডিস্ট্রিবিউটর। আর এই জেন ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধেই বাংলাদেশ থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা পাচার অভিযোগের তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান দেশে ব্যবসা করতে চাইলে সেটির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক। তবে বিকাশের এই ডিস্ট্রিবিউটর কোনো নিয়মেরই ধার ধারেনি। আর এর পেছনে খোদ বিকাশের ইন্ধন রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে শুধু সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে। সেটিও নেওয়া হয়েছে মূল মালিকদের আড়াল করে কর্মচারীদের নামে। অর্থাৎ সবখানেই অস্বচ্ছতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, যা জেনেও চুপ ছিলেন বিকাশের কর্তাব্যক্তিরা।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুসন্ধানে বিকাশের মাধ্যমে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের সত্যতা মিলেছে জেন ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে। এরপর বিষয়টি আরও তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে সিআইডিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত তদারক কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে যে অভিযোগ পাওয়া গেছে তার শতভাগ সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে তদন্তে কিছু ক্ষেত্রে এর থেকেও বেশি চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তদন্তের স্বার্থে এখনও তা প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে দ্রুতই মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে শতভাগ বিদেশী বিনিয়োগ বা যৌথ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিডা রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট বা অনুমোদন বাধ্যতামূলক। বিডার নিবন্ধন ছাড়া ব্যবসা করলে তা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতায় পড়তে পারে, বিশেষ করে যদি লাভের অর্থ দেশের বাইরে পাঠানো হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকেরও অনুমোদন নিতে হয় বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার জন্য।
যা জানাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান যদি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন না নেয় তাহলে তারা ব্যবসায়ের লাভের টাকা নিতে পারে না। এখন বিকাশের ডিস্ট্রিবিউটর জেন ইন্টারন্যাশনাল যদি অনুমোদন না নিয়ে থাকে, তাহলে বলতে হয় লাভের টাকা তারা অবৈধ পথে নিয়েছে।”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যেহেতু অনুসন্ধানটি বিএফআইইউ করেছে, সেখানে অবৈধ লেনদেন সংঘটিত হয়েছে। যেখানে সন্দেহজনক লেনদেন সংঘটিত হয়, সেগুলোই বিএফআইইউ অনুসন্ধান করে।”
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে ব্যবসা করার প্রক্রিয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, “বাংলাদেশে কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান যদি বিনিয়োগ করতে চায়, তবে তাদের প্রথমে বিডা থেকে অনুমোদন নিতে হয়। এরপর তাদের অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আসতে হয়। আমরা তখন তাদের বিডার অনুমোদনের কাগজপত্র দেখতে চাই। সেটা ঠিক থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন দেওয়া হয়।”
যা জানাচ্ছে বিকাশ
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিকাশের হেড অব কমিউনিকেশনস প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “আমরা জেন ইন্টারন্যাশনালের সব ধরনের লিগ্যাল ডকুমেন্ট যাচাই-বাছাই করে এরপর ডিস্ট্রিবিউটরশিপ চুক্তি করেছি। এখন তারা কোন প্রক্রিয়ায় লাভের টাকা নিয়েছে, সেটা আমাদের দেখার দায়িত্ব না।”
বিকাশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন উত্তরে প্রতিবেদক বিএফআইইউর প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে জানতে চান, ‘প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে জেন ইন্টারন্যাশনাল বিডা ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যবসা করার কোনো অনুমোদন নেয়নি। এমনকি সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রেও মূল বিদেশি মালিককে আড়ালে রেখে কর্মচারীর নামে লাইসেন্স করা হয়েছে। তাহলে কি আপনি দাবি করছেন বিএফআইইউ প্রতিবেদনে ভুল তথ্য দিয়েছে?’
এ প্রশ্নের উত্তরে শামসুদ্দিন হায়দার বলেন, “বিষয়টি নিয়ে মামলা চলমান, তদন্ত চলছেÑ এটা নিয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে না।”
অনুসন্ধানে যা উঠে এসেছে
অনুসন্ধানে দেখা যায়, জেন ইন্টারন্যাশনাল ২০১৩ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে আমদানি-রপ্তানি, বিতরণ ও সরবরাহ ক্যাটাগরিতে ট্রেড লাইসেন্স নেয়। ট্রেড লাইসেন্সে মালিক হিসেবে বাংলাদেশি নাগরিক মো. আবদুল কাইউম তসলিমের নাম উল্লেখ করা হলেও অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিক বা সুবিধাভোগী হিসেবে মালয়েশিয়ান নাগরিক ডা. সিরাজুদ্দিন বিন বদরুদ্দিন ও মহসিন বিন বদরুদ্দিনের নাম উঠে আসে। তারা যথাক্রমে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়, জেন ইন্টারন্যাশনালের শেয়ার মালিকানার বড় অংশ ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত জেটলাইট ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের হাতে রয়েছে। ওপেন সোর্স অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেটলাইট ইনভেস্টমেন্টের নিবন্ধিত ঠিকানায় আরও অন্তত ১০৮টি কোম্পানি নিবন্ধিত রয়েছে। আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইসিআইজে) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পানামা পেপারস-সংক্রান্ত তথ্যে ওই ঠিকানার উল্লেখ পাওয়া যায়। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে জেটলাইট ইনভেস্টমেন্টকে একটি সম্ভাব্য শেল কোম্পানি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিকাশ ও জেন ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে ২০১২ সালের ১৮ জুলাই ডিস্ট্রিবিউটরশিপ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী জেন ইন্টারন্যাশনালকে ২০১৫ সালের মধ্যে সিকিউরিটি ডিপোজিট হিসাবে ১১ কোটি ২৭ লাখ টাকা জমা দেওয়ার কথা ছিল।
সমন্বিত হুন্ডি ব্যবস্থার আলামত
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডার মেনাঙ্গ রিসোর্সেস এসডিএন বিএইচডি ও জেটলাইট ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে মাত্র তিনটি রেমিট্যান্স লেনদেনে দুই কোটি ৭৯ লাখ টাকা বাংলাদেশে আনা হয়। বাকি অর্থ স্থানীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও সেই উৎস সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এতে বলা হয়, এই অর্থ অবৈধ চ্যানেলে বাংলাদেশে প্রবেশ করে থাকতে পারে এবং হুন্ডি লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মালয়েশিয়ার ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট থেকে প্রাপ্ত তথ্যেও সন্দেহজনক চিত্র উঠে এসেছে। ডা. সিরাজুদ্দিনের নামে মালয়েশিয়ার সিআইএমবি ব্যাংকে পরিচালিত হিসাবে দেশটির বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত নগদে জমা হয়। ওই হিসাবে একাধিক বাংলাদেশি নাগরিক ‘গিফট’ হিসেবে অর্থ জমা দিয়েছেন বলে লেনদেনের সময় ঘোষণা করা হয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা জমা এবং তার সমপরিমাণ অর্থ বাংলাদেশে স্থানীয় মুদ্রায় পরিশোধ করার একটি সমন্বিত হুন্ডি ব্যবস্থার আলামত এতে থাকতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ডা. সিরাজুদ্দিন ও মহসিনের নামে মালয়েশিয়ায় অন্তত ১০টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলোতেও সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।