তানভীর হাসান ও নূর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:১৩ এএম
আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩৫ এএম
পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত
পুলিশের মাঠ পর্যায়ের অনেক ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাই বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত ও সমালোচিত হয়েছেন। এই বিতর্কের ধারায় সর্বশেষ সংযোজন সাম্প্রতিকতম সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাও। অভিযোগ এসেছে, গত ১৮ মাস ধরে তারা একটি বিশেষ দলের হয়ে নানা বৈষয়িক সুবিধা নিয়েছেন। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার ও ডিএমপির কর্মকর্তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য। গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রণীত এই তালিকায় যেসব কর্মকর্তার নাম এসেছে, তাদের মধ্যে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদোন্নতিসহ নানা আর্থিক ও বৈষয়িক সুবিধা পাওয়া কর্মকর্তাও রয়েছেন। ৫ আগস্টের পর রাতারাতি ভোল পাল্টেছেন তারা; একটি দলের পক্ষে সোচ্চার হয়ে বাগিয়ে নিয়েছেন দায়িত্বশীল বিভিন্ন জেলাসহ পুলিশ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ। যদিও এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন বলে দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ প্রশাসনে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি আর্থিক ও অন্যান্য সুবিধা নিয়েছেন এমন ৩৩ জন পুলিশ সুপার গত ১৮ মাস ধরে অন্য একটি দলপন্থী হিসেবে ভূমিকা রাখছেন। এই কর্মকর্তাদের ধারণা হয়েছিল, তাদের সমর্থন করা দল সরকার গঠন করতে চলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের আগে এই ৩৩ পুলিশ সুপার ৩৩টি জেলায় বদলি হওয়ার পর তারা ভোটের মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারকে গোয়েন্দা সংস্থা এসব ব্যাপারে অবহিত করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এই ৩৩টি জেলার মধ্যে রয়েছেÑ গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, বগুড়া, পাবনা, নাটোর, জয়পুরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, নড়াইল, মেহেরপুর, বরিশাল, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, রংপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা।
গোয়েন্দা সূত্র জানাচ্ছে, এসব পুলিশ সুপার আগে সাবেক আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। ৩৩ জেলায় বদলি হয়ে ভোটের মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এরা বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে কাজ করেন। তাদের অনেকে ওই দলের সমর্থনে সামাজিক মাধ্যমেও সরাসরি বক্তব্য পোস্ট করেন। কিন্তু সেই দলের ভরাডুবি ঘটার পর তারা এখন ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য লবিং করছেন।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ৬৪ জেলার মধ্যে এখনও আটটি জেলার পুলিশ সুপার আওয়ামীপন্থী হিসেবে চিহ্নিত। এসব জেলার মধ্যে রয়েছেÑ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলা। অভিযোগ, তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং দলটির শাসনামলে তারা সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়ার পাশপাশি পদোন্নতিও পেয়েছেন। পুলিশ প্রশাসনে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পুনর্মূল্যায়ন না করে এই কর্মকর্তাদের জেলার দায়িত্বে রাখায় বাহিনীতে নানা ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনমতে, বর্তমান বিএনপিপন্থী পুলিশ সুপার রয়েছেন ১৬ জন। নরসিংদী, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, ফেনী, খাগড়াছড়ি, সিরাজগঞ্জ, খুলনা, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, মাগুরা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, জামালপুর, শেরপুর, ঠাকুরগাঁও ও কুড়িগ্রাম জেলার পুলিশ সুপারকে বিএনপিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই একসময় ছাত্রদলের বিভিন্ন পদে ছিলেন। তবে তাদের মধ্যেও দুইজন বিএনপিপন্থী রয়েছেন, যারা বিএনপিপন্থী হলেও সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আংশিক সুবিধা ও পদোন্নতি পেয়েছেন।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, আটজন পুলিশ সুপার রয়েছেন, যারা সব আমলেই রাজনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। মধ্যপন্থী, সুবিধাভোগী ও আংশিক আওয়ামী সুবিধাভোগী এই এসপিরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা ও দিনাজপুরের পুলিশ সুপার রয়েছেন।
এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশেও (ডিএমপি) রয়েছেন জামায়াতপন্থী, আওয়ামীপন্থী, বিএনপিপন্থী সুবিধাভোগী ৩৬ কর্মকর্তা। এ ছাড়া ডিএমপিতে এখনও ৪ জন কট্টর জামায়াতপন্থীসহ ৬ জন জামায়াতপন্থী অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার রয়েছেন। যাদের রাজনৈতিক পরিচয় আগে কখনও এখনকার মতো স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারেনি। বিএনপিপন্থী অতিরিক্ত কমিশনার রয়েছেন একজন। আর একজন অতিরিক্ত কমিশনার ছাত্রজীবনে সরাসরি জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগ কর্মী ছিলেন। এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জামায়াতের হয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে।
ডিএমপির ১১ জন যুগ্ম পুলিশ কমিশনারের মধ্যে জামায়াতপন্থী একজন, আওয়ামী লীগপন্থী রয়েছেন দুইজন। তাদের একজন কট্টর আওয়ামীপন্থী ও চরম সুবিধাবাদী। সকল সময় পদোন্নতিপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা পটুয়াখালী জেলার এসপি ও বরিশাল জেলার অ্যাডিশনাল ডিআইজি ছিলেন। আরেকজন আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা ওয়ান-ইলেভেনের সময় ডিএমপি কমিশনারের বিশ্বস্ত ছিলেন। অভিযোগ, ওই সময় তিনি বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের ডিএমপি থেকে বের করে দেন। মধ্যপন্থী সুবিধাবাদী যুগ্ম পুলিশ কমিশনার ছিলেন ৬ জন। তারা ক্ষমতার সান্নিধ্যে থাকার লক্ষ্যে সব সময় খোলস পাল্টিয়ে থাকেন। আর বিএনপিপন্থী যুগ্ম পুলিশ কমিশনার রয়েছেন দুজন। তবে তারা মূলত সুবিধাবাদী ও জামায়াতপন্থী কর্মকর্তা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি। বর্তমানে ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার রয়েছেন ১৬ জন। তার মধ্যে জামায়াতপন্থী ডিসি রয়েছে ২ জন। বিএনপিপন্থী রয়েছেন ৫ জন। আর ২ জন আওয়ামীপন্থী। ডিএমপির এই ডিসিদের মধ্যে ৭ জনই মধ্যপন্থী। তারা যখন যে দল আসে, তাদের কাছ থেকেই সুবিধা ও পদোন্নতি নিয়ে থাকেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি ও পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তারা গত ১৭ বছর কষ্ট করে চাকরি করেছেন। কোনো ধরনের প্রমোশন ও পোস্টিং দেওয়া হয়নি। ৫ আগস্টের পর ভালো পদে পদায়ন পাবেন বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু পুলিশেও সেই গুপ্ত রূপ দেখা গেছে গত ১৮ মাসে। আওয়ামীপন্থীরা হঠাৎ করেই একটি দলের লোক হয়ে গেলেন। অনেকে দুটি পদও আঁকড়ে রেখেছেন। আর বিএনপিপন্থীরা রয়ে গেছেন সেই ডাম্পিং পোস্টিংয়েই। নতুন করে তারাই আবার এখন পদে বহাল থাকতে জোর লবিং করে যাচ্ছেন। বিষয়টি সরকারের দায়িত্বশীলদের নজরে রাখা উচিত বলেও মনে করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।