× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রাষ্ট্রের টাকায় ‘অদৃশ্য রাজত্ব’

দুই দশক ধরে চলছে প্রশাসনিক কেলেঙ্কারি

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:৪৪ পিএম

প্রকল্পের মেয়াদ শেষ ২০০৪ সালে, জনবল টিকে আছে এখনও। ছবি: সংগৃহীত

প্রকল্পের মেয়াদ শেষ ২০০৪ সালে, জনবল টিকে আছে এখনও। ছবি: সংগৃহীত

প্রকল্পের বৈধ মেয়াদ শেষ অনেক আগেই, স্থায়ী পদের সরকারি আদেশও হয়নি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনও ঝুলে আছে বছরের পর বছর; তবু গত ২১ বছর ধরে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলে যাচ্ছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) ১৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। কোনো একক সিদ্ধান্ত বা স্পষ্ট নীতিগত অনুমোদন ছাড়াই দপ্তর থেকে দপ্তরে ঘুরতে থাকা ফাইল, প্রশাসনিক ঢিলেঢালা ব্যাখ্যা এবং নথির ফাঁকফোকর ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে বেতন-ভাতা প্রাপ্তির এই সমান্তরাল কাঠামো। বাস্তবে এটি রাষ্ট্রের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা এক ধরনের ‘অদৃশ্য রাজত্ব’Ñ যেখানে প্রকল্প শেষ হলেও জনবল কর্মরতই আছে বেতন-ভাতা সমেত।

প্রকল্পভুক্ত কর্মরত এই ১৩০ জনের পদ বিস্তৃত উপপরিচালক থেকে শুরু করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী পর্যন্ত। প্রকল্পভিত্তিক নিয়োগ হওয়ার পরও তারা দুই দশকের বেশি সময় ধরে রাজস্ব খাতের অর্থে বেতন, ভাতা, ইনক্রিমেন্ট এমনকি পদোন্নতির সুবিধা পাচ্ছেন। অথচ তাদের চাকরির আইনি ভিত্তি আজও চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নিয়মিত রাজস্বভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপরÑ যাদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির পথ বছরের পর বছর ধরে সংকুচিত করা হচ্ছে।

এই প্রশাসনিক জটিলতার সূচনা হয় ২০০১-২০০৪ সময়কালে বাস্তবায়িত ‘ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি (৪র্থ পর্যায়)’ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। প্রকল্পটির কার্যকাল ছিল জুলাই ২০০১ থেকে জুন ২০০৪ পর্যন্ত। প্রকল্পভিত্তিক নিয়োগের নিয়ম অনুযায়ী, মেয়াদ শেষে জনবলের চাকরি শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। ২০০৪ সালে প্রকল্প শেষ হলেও সংশ্লিষ্ট জনবল বহাল থাকে এবং ধীরে ধীরে তাদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়Ñ যা পরবর্তী ২১ বছরেও নিষ্পন্ন হয়নি।

২০০৪ সালের পর থেকেই ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সংস্থাপন (বর্তমান জনপ্রশাসন) মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের মধ্যে এই জনবল রাজস্ব খাতে নেওয়া নিয়ে চিঠিপত্র চালাচালি শুরু হয়। কোথাও আংশিক সম্মতি, কোথাও শর্ত, কোথাও আপত্তি-ফাইল এগোতে থাকে, আবার আটকে যায়। এই ফাঁকে প্রকল্পের মেয়াদ কাগজে-কলমে বাড়ানো হতে থাকে। যদিও প্রকৃত অর্থে প্রকল্পের কার্যক্রম বহু আগেই শেষ।

প্রকল্পটির অধীনে নিয়োগ পাওয়া ১৩০টি পদ ২১টি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত। এর মধ্যে রয়েছেন ৬ জন উপপরিচালক, ১ জন সিনিয়র স্বাস্থ্য প্রশিক্ষক কাম মেডিকেল অফিসার, ৬ জন স্বাস্থ্য প্রশিক্ষক কাম মেডিকেল অফিসার, ৩ জন সহকারী পরিচালক, কৃষি ও মৎস্য চাষ বিষয়ে ১৪ জন সমাজবিজ্ঞান প্রশিক্ষক, ৭ জন ধর্মীয় প্রশিক্ষক ও ৭ জন প্রশিক্ষণ সহকারী। পাশাপাশি রয়েছেন হিসাবরক্ষক, হিসাব সহকারী, ক্যাশিয়ার, কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী, লাইব্রেরি সহকারী, অডিওভিজুয়াল অপারেটর, কেয়ারটেকার, এমএলএস, বাবুর্চি, মশালচি ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ আরও বহু পদ। এই বিশাল জনবল কাঠামো প্রকল্প শেষের দুই দশক পরও রাজস্ব খাতের অর্থে পরিচালিত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, রাষ্ট্র কেন ও কীভাবে এতদিন ধরে একটি অননুমোদিত কাঠামোর ব্যয় বহন করল?

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর একটি প্রশাসনিক তথ্য। জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান পরিপত্র এবং দীর্ঘদিনের সরকারি চর্চা অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের পর কোনো উন্নয়ন প্রকল্প সরাসরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হয়নি। সরকারি কোষাগারের ওপর চাপ কমাতে ওই বছর থেকেই এই কঠোর নীতি নেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী ১৯৯৭ সালের পর কেবল সেসব প্রকল্পের জনবলই রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, যারা দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট রায় অর্জন করতে পেরেছে।

কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এই ১৩০ জন কর্মচারীর ক্ষেত্রে কোনো আদালতের রায় বা বিশেষ আইনি নির্দেশনা ছিল না। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রশাসনিক ‘লবিং’ এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের সুযোগ কাজে লাগিয়েই তারা এই নীতিগত বাধা অতিক্রম করেছেন। যেখানে শত শত প্রকল্পের জনবলের চাকরির মেয়াদ আর বাড়েনি ও শেষ হয়ে গেছে কিংবা আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে, সেখানে ইফার এই কর্মীরা কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়াই ২১ বছর ধরে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি রাষ্ট্রীয় আচরণের দ্বিমুখী মানসিকতা এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর প্রতি অঘোষিত আনুকূল্যের স্পষ্ট উদাহরণ।

এই দীর্ঘ সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয় বিষয়টিতে একাধিকবার আপত্তি জানিয়েছে। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০২০ সালে পাঠানো চিঠিগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়, অনুমোদনহীন পদ রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। তবুও এসব আপত্তি কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে। বেতন, ভাতা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এমনকি পদোন্নতির প্রক্রিয়াও থেমে নেই। প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ১৯৮৮-এর কিছু ধারাকে এই ব্যয়কে প্রশ্নহীন রাখার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সবচেয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে পদগুলোর জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি নিয়ে। ২০১৫ সালের পর থেকে এই প্রকল্পভিত্তিক কর্মীদের নিয়মিত জ্যেষ্ঠতা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২০ ও ২০২১ সালে প্রকাশিত জ্যেষ্ঠতা তালিকায় আপত্তি জানাতে বাধ্য হন বহু নিয়মিত কর্মকর্তা। তাদের অভিযোগ, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে রাজস্ব খাতে প্রবেশ করা কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে প্রকল্প থেকে আসা কর্মীরা পদোন্নতির সুবিধা নিচ্ছেন, যা প্রশাসনিক ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

এ বিষয়ে ভিন্ন দাবি করেছেন প্রকল্পের মানিকগঞ্জ জেলা কার্যালয়ে কর্মরত উপপরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি দাবি করেন, তার চাকরি ২০০৫ সালেই স্থায়ী হয়েছে। তবে সচিব কমিটির নথি ও অর্থ বিভাগের সাম্প্রতিক চিঠিপত্র বলছে, এই পদগুলো স্থায়ী করার সুপারিশ গৃহীত হয়েছে মাত্র ২০২৫ সালের নভেম্বরে। নথি ও বক্তব্যের এই স্পষ্ট বৈপরীত্য ইফার ভেতরের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলাকেই তুলে ধরে।

এই দীর্ঘ অচলাবস্থার একটি মোড় আসে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সিদ্ধান্তে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের স্মারক অনুযায়ী, সচিব কমিটি ঐকমত্যে পৌঁছে যে, ‘ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমি (৪র্থ পর্যায়)’ প্রকল্পের ১৩০টি পদ ৪ এপ্রিল ২০০৫ তারিখ থেকে ভূতাপেক্ষভাবে রাজস্ব খাতে সৃজনের সুপারিশ করা যেতে পারে। তবে শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, পদ সংরক্ষণ ও স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে ৩ মে ২০০৩ সালের সরকারি আদেশ অনুসরণ করতে হবে এবং জনপ্রশাসন ও অর্থ বিভাগের সব শর্ত পূরণ করে চূড়ান্ত সরকারি আদেশ জারি করতে হবে।

কিন্তু এই ভূতাপেক্ষ সুপারিশ নতুন প্রশ্নও তৈরি করেছে। যদি পদগুলো ২০০৫ সাল থেকে বৈধ ধরা হয়, তাহলে গত দুই দশকে দেওয়া পদোন্নতি, নির্ধারিত জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর আইনগত অবস্থান কীÑ সে প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট জবাব এই সিদ্ধান্তে নেই।

এ প্রসঙ্গে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আব্দুস ছালাম বলেন, ‘প্রকল্পের পদগুলো নিয়মিতকরণ করা হয়েছে এবং স্থায়ীকরণের প্রক্রিয়া চলমান।’ বিভিন্ন সময়ে দপ্তর পরিবর্তন ও অতিরিক্ত শর্তের কারণে বিষয়টি দীর্ঘ হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ‘কাগজপত্র পর্যালোচনায় স্পষ্ট অনিয়ম পাওয়া গেছে এবং প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পৃথক প্রোফাইল তৈরি করে বিষয়টি পুনরায় যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির ২১ ক্যাটাগরির ১৩০টি পদের বিষয়ে অনিয়ম থাকার অভিযোগ উঠেছে। প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, রাজস্ব খাত থেকে বেতন দেওয়া হলেও জনবল আনুষ্ঠানিকভাবে রাজস্ব কাঠামোয় স্থানান্তর হয়নি। পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে তাই জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

বিশ্লেষকদের মতে, সচিব কমিটির সাম্প্রতিক সুপারিশে হয়তো ফাইলের ইতি টানা যাবে, কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থে চলা এই দীর্ঘ ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’ প্রশাসন ও সুশাসনের ইতিহাসে একটি অস্বস্তিকর নজির হয়ে থাকবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা