× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বেশিরভাগ আসনেই নিরাপত্তার উচ্চ ঝুঁকি, ভোটের আগে বারুদের গন্ধ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও তানভীর হাসান

প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৯:০৪ এএম

বেশিরভাগ আসনেই নিরাপত্তার উচ্চ ঝুঁকি, ভোটের আগে বারুদের গন্ধ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের প্রায় সবগুলোতেই নিরাপত্তার ঝুঁকি ‘চরম’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনমতে, বর্তমান বাস্তবতায় নির্বাচন আয়োজন করা মানে একপ্রকার অগ্নিপরীক্ষায় নামা। সহিংসতা, অস্ত্র, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও ডিজিটাল অপপ্রচারের সমন্বয়ে এমন এক বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে নির্বাচন শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গোয়েন্দা বিশ্লেষণে আরও জানা যাচ্ছে, নির্বাচনপূর্ব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত না হলে ভোটার উপস্থিতি, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতাÑ সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সম্প্রতি সরকারের উচ্চপর্যায়ে এই বিশ্লেষণী ওই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নির্বাচনপূর্ব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা দেখা দিলে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তা ছাড়া প্রতিটি সংসদীয় আসনের ভৌগোলিক অবস্থান, রাজনৈতিক বাস্তবতা, ভোটারদের ধরণ, অতীত নির্বাচনের ফলাফল এবং চলমান অপরাধপ্রবণতা আলাদা হলেও ঝুঁকির মাত্রা প্রায় সবখানেই ‘উচ্চ’। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট সহিংসতা, অস্ত্র লুট, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক কোন্দল নির্বাচনী পরিবেশকে আরও নাজুক করে তুলেছে। 

অন্য একটি সূত্র বলছে, গোয়েন্দা সংস্থার আগাম সতর্কবার্তা অনেকাংশে বাস্তব রূপ পেয়েছে। রাজধানী ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যপ্রার্থী, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণে মারাত্মক আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আশঙ্কা করছেন, নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা অশনিসংকেত। এমন ঘটনা আগামীতে আরও ঘটতে পারে। অবিলম্বে সব প্রার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দলের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আহ্বান জানানো হয়েছে। 

প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের সময় এই সহিংসতা বহুগুণে বাড়ে। এখনই যদি নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, ভোটের দিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অসম্ভব হবে। সে ক্ষেত্রে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ শুধু কাগুজে শব্দেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

থামেনি অস্থিরতা, বেড়েছে অপরাধ : গোয়েন্দা প্রতিবেদন বলছে, গত বছর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর দেশের বিভিন্ন স্থানে যে গণসহিংসতা, রাজনৈতিক দখল-বেদখল ও সংঘাত শুরু হয়, তা এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্তঃকোন্দল এবং আন্তঃকোন্দলও অনেক এলাকায় প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে দলীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা বেড়েছে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে নির্বাচনের সময় তা সহিংস রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।

সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা যদি দৃশ্যমানভাবে উন্নত না হয়, তাহলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। সহিংসতার স্মৃতি ও আশঙ্কা ভোটারদের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। সুতরাং ভোটাররা যাতে নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারেন, সেজন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচন শুধু ভোটের দিনেই নয়, তার বহু আগে থেকেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। ৩০০ আসনের প্রতিটিতে আলাদা ঝুঁকি থাকলেও সমন্বিত পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচনের পথে এই সতর্কবার্তাগুলোকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশন পদক্ষেপ নেয়Ñ সেদিকেই এখন দেশ তাকিয়ে আছে। নির্বাচনের আগে অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাস দমন না হলে নির্বাচন নিরাপদ বলা আত্মপ্রবঞ্চনা।’

লুট হওয়া অস্ত্র অদৃশ্য হুমকি : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৫ আগস্টে বা পরে বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনও উদ্ধার হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি ভয়ংকর বাস্তবতাÑ একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে মুক্ত হয়ে ফের চাঁদাবাজি ও অপরাধে সক্রিয় হয়েছে। পাশাপাশি অনেক লাইসেন্সধারী বৈধ অস্ত্র এখনও জমা পড়েনি। এসব অস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে গেলে নির্বাচনকালে সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংঘাতপ্রবণ আসনগুলোতে ভোটকেন্দ্র দখল, প্রার্থী ও ভোটারদের ভয় দেখানো, প্রার্থী ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর হামলা, ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তাই অস্ত্র উদ্ধারের অগ্রগতি ছাড়া নির্বাচন নিরাপদ বলা যাবে না।

সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বাংলাদেশর মানুষ স্বপ্ন দেখছে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণ করবে। ঠিক সেই সময় আবার নতুন করে বাংলাদেশের শত্রুরা হত্যাকাণ্ডে মেতে উঠেছে।’ ওসমান বিন হাদির ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘এ রকম আরও ঘটনা ঘটতে পারে।’ তিনি আরও জানান, নির্বাচনকে বানচাল করার অশনিসঙ্কেত দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনকে সম্পূর্ণভাবে সন্ত্রাসমুক্ত করতে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

চরমপন্থী, পার্বত্য সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সীমান্ত এলাকার বিস্ফোরক বাস্তবতা : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থী গোষ্ঠী এবং তিন পার্বত্য জেলার সশস্ত্র সংগঠনগুলো এখনও পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়নি বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব গোষ্ঠীর তৎপরতা নির্বাচনকালে নতুন মাত্রা পেতে পারে। কোনো কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নিজেদের স্বার্থে এসব গোষ্ঠীকে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে।

সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ১১৩ আসনে বাড়তি ঝুঁকি : বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু। গোয়েন্দা তথ্যে দেখা গেছে, ৩০০ আসনের মধ্যে অন্তত ১১৩টি আসনে সংখ্যালঘু ভোটার ১০ শতাংশ বা তার বেশি। এই আসনগুলোতে নির্বাচনের আগে পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। এসব এলাকার নিরাপত্তাকে ‘উচ্চ ঝুঁকি’ সম্পন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার ও ডিপফেকের শঙ্কা : গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের সময় সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক উস্কানি, ধর্মীয় অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া বক্তব্য ও নকল বার্তা ছড়িয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের অপপ্রচার মুহূর্তেই বড় সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। তাদের মতে, ডিপফেক এখন আর ভবিষ্যতের ঝুঁকি নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতা। নির্বাচন কমিশনের শক্তিশালী সাইবার মনিটরিং সেল না থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে।

হাড্ডাহাড্ডি আসন ও অতীতের ভোটের ছায়া : গোয়েন্দা বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, বিগত ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে যেসব আসনে আওয়ামী লীগ ধারাবাহিকভাবে জয় পেয়েছে, সেইসব আসনে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রচেষ্টা হতে পারে। এ ছাড়া যেসব আসনে ১০ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে, সেখানে সংঘাতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকায় ফলাফলকে প্রভাবিত করতে উভয় পক্ষ থেকেই চাপ, সংঘর্ষ বা সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে।

কী বলছে সুপারিশ : গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সরকারকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান; শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম কঠোর নজরদারিতে আনা; সংখ্যালঘু ভোটারদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা; সীমান্তবর্তী ও ঝুঁকিপূর্ণ আসনের জন্য আলাদা নিরাপত্তা পরিকল্পনা; গুজব ও অপপ্রচার ঠেকাতে সাইবার মনিটরিং সেল গঠন এবং নির্বাচনের মূল স্টেকহোল্ডার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, অফিসার ইনচার্জসহ সংশ্লিষ্টদের ভেটিং করা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা