আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:২৭ পিএম
বার্মা সাইফুল
চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি থানা এলাকার সবুর (ছদ্মনাম)। এলাকায় তার ১০টির মতো ‘ভাড়া ঘর’ আছে। এগুলোই তার জীবিকার মাধ্যম। তবে গত ১০ মাস ধরে এসব ঘর দখলে নিয়েছেন সাইফুল ইসলাম ওরফে ‘বার্মা সাইফুল’। প্রতিকার চেয়ে বিভিন্ন জায়গায় ধরনা দিলেও থানায় কোনো অভিযোগ করেননি সবুর।
কেন অভিযোগ করেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ করে আমি আমার জীবন খোয়াব নাকি?’ এমন ভয়ের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার এক প্রতিবেশীর কাছে সাইফুল ২০ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিল। না দিয়ে তিনি থানায় অভিযোগ করেছিলেন। তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। সেই হত্যার ঘটনায় মামলা করে ভিক্টিমের ভাই এখন এলাকাছাড়া।’
শুনতে রূপকথার গল্পের মতো লাগলেও এমনই অরাজক অবস্থা বায়েজিদ বোস্তামি এলাকার। সেখানে নিয়মিতভাবে দখল, চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করেছেন এই বার্মা সাইফুল।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, থানার ২০০ গজের মধ্যে বার্মা কলোনি। এখানে বসেই ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন সাইফুল। শুধু বায়েজিদ নয়, পাঁচলাইশ ও খুলশী থানা এলাকাতেও সাইফুলের অপরাধ সাম্রাজ্য বিস্তৃত্ব। তার বিরুদ্ধে সব মিলিয়ে ২৭টি মামলার তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে ছয়টি ‘২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে। তবে পুলিশ বলছে, প্রতিদিন ২-৩টি আমলযোগ্য অপরাধ করে চলেছে সাইফুল ও তার বাহিনী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা মামলা বা অভিযোগ করতে রাজি হন না।
এত মামলার পরও পুলিশ সাইফুলকে কেন গ্রেপ্তার করছে না- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংশ্লিষ্ট তিন থানার একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বার্মা সাইফুল যে এলাকায় থাকেন, সেটি শহরের ভেতর হলেও দুর্গম। ফলে কখনও তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হলেও সতর্ক হয়ে যান। পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। তা ছাড়া ওই এলাকায় তিন শতাধিক বেপরোয়া কিশোরের একটি গ্যাং চালান সাইফুলরা চার ভাই মিলে। তাদের কাছে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র আছে। ফলে নিয়মিত অভিযানের বাইরে সেখানে মুভ করার বিষয়টা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন তারা। পরিস্থিতি বিবেচনায় ওই এলাকায় অভিযানের সক্ষমতা থানা পুলিশের নেই- এমনটাই অকপটে স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গত ৩০ আগস্ট রাত সাড়ে ৯টার দিকে হিলভিউ
এলাকায় আবদুল্লাহ আল মনির (পিন্টু) নামে একজন খুন হন। ওই ঘটনায় দেলু নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দেলু সাইফুলের সহযোগী। এই হত্যায় সাইফুলের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলেও পিন্টুর পরিবার সাইফুলকে আসামি করতে রাজি হয়নি ভয়ে। পুলিশ চেষ্টা করেও রাজি করাতে পারেনি। যেহেতু অভিযোগ নেই, সেহেতু পুলিশ চাইলেই ব্যবস্থা নিতে পারে না।’
তবে পুলিশের এমন দাবিও সত্য নয়। সর্বশেষ ২৩ নভেম্বর সাইফুলের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় একটি মামলা করেছেন হাসান নামে এক ব্যবসায়ী। চাঁদা না পাওয়ায় হাসানের এক্সাভেটর নিয়ে যায় সাইফুল ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী খুলশী থানায় সাইফুল, তার দুই ভাই, প্রধান সহযোগী শামসুসহ সাত সহযোগীর বিরুদ্ধে মামলা করেন। পুলিশ পতেঙ্গা এলাকা থেকে এক্সাভেটরটি উদ্ধার করেছে। তবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে সাইফুল। এর বাইরেও বায়েজিদ থানায় তার বিরুদ্ধে দুটি মামলায় ওয়ারেন্ট আছে। যদিও পুলিশ বলছে, তাকে পাওয়া যায় না তবে সাইফুলকে গত সোমবারও অক্সিজেন এলাকায় কম্বল বিতরণ করতে দেখা গেছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা মনে করেন, থানার আশকারাতেই ওই এলাকায় ভয়ংকর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে সাইফুল। তিনি বলেন, ‘আমার পরিচিতের মধ্যে দুটি বাড়ির মালিক আছে যাদের পাঁচতলার দুটি ভবন দখল করেছিল সাইফুল। এর মধ্যে একটি ভবন ছাড়াতে ৩০ লাখ টাকা এবং আরেকটির ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে। এর মধ্যে একটির চাঁদার পরিমাণ নির্ধারণ হয়েছে পুলিশের মধ্যস্থতায়।’
সাইফুলের এমন বেপরোয়া সন্ত্রাসের বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার নিজেই ওয়াকিবহাল। গত মাসে অস্ত্র হাতে কাউকে দেখলেও ব্রাশফায়ার করে হত্যার নির্দেশনা দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ। তবে সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য এমন নির্দেশনা দিয়েছিলেন ব্যাখ্যা করে হাসিব আজিজ পরদিন সংবাদ মাধ্যমে বলেছিলেন ‘সাজ্জাদ বাহিনী, ইয়াসিন বাহিনী, বার্মা সাইফুল ইত্যাদি যারা আছে, যারা কথায় কথায় মানুষ মারে, তাদের জন্য এসএমজি ব্রাশফায়ার মুডে থাকবে।’
তাহলে কেন সিএমপি সাইফুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না- এমন প্রশ্নের জবাবে সিএমপির সহকারী কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সাইফুলের বিষয়টি আপনার কাছেই প্রথম জানলাম। তার বিষয়ে আমার বিস্তারিত জানা নেই।’
সাইফুলের বিরুদ্ধে থাকা ২৭টি মামলায় সে হাজিরা দেয় নাকি ওয়ারেন্টে আছে?- পাল্টা প্রশ্ন করেন তিনি। একাধিক মামলায় তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট আছে বলার পর তিনি বলেন, ‘ওয়ারেন্ট থাকলে পুলিশ তাকে অবশ্যই গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে। সন্ত্রাসের বিষয়ে আমাদের জিরো টলারেন্স অবস্থান আছে।’