× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চট্টগ্রাম বন্দর: যেখানে নোঙর অর্থনীতির

সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:০০ পিএম

প্রবা ফটো

প্রবা ফটো

একটি দেশের অর্থনীতির প্রধানতম স্তম্ভের মধ্যে রয়েছে শিল্প, কৃষি ও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ পণ্য পরিবহন হয় জলপথে। এ কারণে বন্দর থাকলেই সম্ভব হয় একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে দ্রুততম গতিতে এগিয়ে নেওয়া। অবশ্য শুধু বন্দর থাকলেই হবে না, সেটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই কেবল সম্ভব দেশের অর্থনীতিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান শিল্প অর্থনীতির দেশে চট্টগ্রাম বন্দর তেমনই একটি টেকসই উন্নয়নের খাত। স্বাধীনতার পর বিগত কয়েক দশকে দেশীয় সমৃদ্ধির অনেকাংশই এসেছে এই বন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে। 

দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কন্টেইনার বাণিজ্যের ৯৮ শতাংশ পরিচালনা করে চট্টগ্রাম বন্দর। এটি শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানিই করে না, বরং শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশেও সহায়তার মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। এই চট্টগ্রাম বন্দর দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে যা সামগ্রিক জিডিপির প্রায় ১৯.৫ শতাংশ। 

দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সবচেয়ে লাভজনক একক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর অন্যতম। সর্বশেষ অর্থবছরে বন্দর রাজস্ব আয় করেছে ৫ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। ব্যয় বাদ দিয়ে বন্দরের উদ্বৃত্ত ছিল ২ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। কর পরিশোধের পর বন্দর নিট মুনাফা করেছে ২ হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতির পরও বন্দরের এই রেকর্ড আয় অর্থনীতির গতিপ্রকৃতিকে শক্তিশালী রাখতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। অঙ্কের হিসাবে ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ হলেও চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা টার্নওভার লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। বন্দরের সার্বিক সুবিধা বাড়ালে, আধুনিকায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার ও দুর্নীতি প্রতিরোধ করা গেলে চট্টগ্রাম বন্দর এবং এর সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বন্দর ও টার্মিনালের মাধ্যমে এটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে ব্যবসায়িক মহল। 

বন্দরের অগ্রগতি অক্ষুণ্ন রাখতে ও এগিয়ে নিতে নতুন কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি? এমন প্রশ্নের উত্তরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি সামাল দিতে আমরা প্রতিনিয়তই পরিকল্পনা ও উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আজ থেকে দশ বছর আগে কী অবস্থা ছিল, এখন অবস্থা কী, আগে কত হ্যান্ডলিং হতো, এখন কত হচ্ছে এই বিষয়গুলোর সার্বিক দিক বিবেচনা করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনাল নির্মাণ করছে। ইয়ার্ড ও শেড ক্যাপাসিটি বাড়ানো হচ্ছে। পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে। লালদিয়ায় কন্টেইনার টার্মিনাল হবে। বে-টার্মিনাল পরিচালনায় দেশের বাইরের গ্লোবাল টার্মিনাল অপারেটররা আসবে। সেখানে দুটি টার্মিনাল হবে। একটা করবে বিদেশিরা; আরেকটা করব আমরা।’ 

বন্দর সচিব বলেন, ‘সব কটি পরিকল্পনা ও উদ্যোগ আমাদের ফিউচার গ্রোথকে বিবেচনায় নিয়েই করা হচ্ছে। তাছাড়া ১০, ২০ কিংবা ৩০ বছর পরে তখনকার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনে পরিকল্পনার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে আরও উন্নয়ন ঘটানো হবে। এক কথায় বন্দর সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি ঘটাতে এবং আমদানিকারকদের সহায়তা দিতে সার্ভিস প্রোভাইট করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।’ 

বন্দরের সক্ষমতা বাড়ছে

আগে যেখানে বহির্নোঙরে একটি জাহাজকে পণ্য খালাসে ছয়-সাত দিন অপেক্ষা করতে হতো, সেখানে এখন অন অ্যারাইভাল বার্থিং (জাহাজ আসার সঙ্গে সঙ্গে) পাচ্ছে জাহাজগুলো। এ ছাড়া টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম নেমে এসেছে দুই থেকে আড়াই দিনে। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যে জাহাজ কন্টেইনার খালাস ও বোঝাই করে পুনরায় যাত্রা করতে পারছে। ফলে আমদানিকারকরা দ্রুততম সময়ে তাদের পণ্য হাতে পাচ্ছেন। গুনতে হচ্ছে না বাড়তি খরচ। এতে তারা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি ভোক্তাদের ওপরও বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হচ্ছে না। ২৪ ঘণ্টা সমানতালে সার্ভিস দেওয়ার মাধ্যমে জাহাজ চলাচল বাড়াতে, বড় জাহাজ ভিড়াতে, ডিরেক্ট শিপিং বাড়াতে কাজ করছে সরকার। ডিরেক্ট শিপিং ও বড় জাহাজ ভিড়ানো গেলে অধিক সংখ্যক কন্টেইনার একসঙ্গে পরিবহন সম্ভব হবে। এতে পরিবহন খরচ বাঁচবে ৪০-৫০ শতাংশ।

চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে বাড়ছে দেশের আয়

ট্যারিফ বৃদ্ধির ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের আয় বাড়লে দেশের আয়ও বাড়বে। কারণ বন্দরের আয় থেকে শুল্ক ও আয়কর বাবদ বিপুল অর্থ পায় সরকার। যা সরকার দেশের মানুষের উন্নয়নে ব্যয় করে। গত ২৫ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর বিভিন্ন খাতে সরকারকে সরাসরি প্রায় ২৩ হাজার ৪১১ কোটি টাকা দিয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন ট্যাক্স ছাড়াও সরকারের চাহিদা অনুযায়ী দুই দফায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি এবং পায়রা বন্দরের উন্নয়নে ৪৬২ কোটি টাকা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। এ ছাড়া পৌরকর হিসেবে ৮৩১ কোটি টাকার এলডি ট্যাক্স হিসেবে ৪৭ কোটি টাকা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, সেখান থেকে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৭৩৯ কোটি টাকা মুনাফা এবং ১২৯৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে মুনাফা ও নিট মুনাফা হয়েছে যথাক্রমে ২১০৬ কোটি টাকা ও ১৫৫৫ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে মুনাফা ও নিট মুনাফার পরিমাণ যথাক্রমে ২৩৩৩ কোটি টাকা ও ১৭৫১ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মুনাফা ও নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ২৭১৫ কোটি টাকা ও ২০৪৩ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মুনাফা ও নিট মুনাফা হয়েছে যথাক্রমে ২৯১৩ কোটি টাকা ও ২১৮৫ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ইতোমধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরকে কেন্দ্র করে বহু শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করছে।

কন্টেইনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি 

১৯৮৫-৮৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর মাত্র কয়েক হাজার টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করেছিল। আর সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে এ সংখ্যা গিয়ে ঠেকেছে ৩২ লাখ টিইইউসে। অর্থাৎ সংখ্যার হিসাবে প্রায় ৮১ গুণ হ্যান্ডলিং বেড়েছে। ব্যবসাবান্ধব বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে। পুরনো অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন টার্মিনাল নির্মাণ, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি। ১৯৮৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের বহরে টাগবোট, পাইলট বোট, অ্যাম্বুলেন্স বোট, পানি ও জ্বালানি সরবরাহকারী ভেসেলসহ সাপোর্ট ভেসেল/বোট ছিল ১৯টি। ২০২৫ সালে এসে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮টিতে। এই বিপুলসংখ্যক সুবিধা পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডিজিটালাইজেশন ও কার্বণ নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক অঙ্গীকারের কারণে গ্রিন পোর্টে রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ। 

উল্লেখ্য, বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩০ লাখ ৭ হাজার ৩৭৫ টিইইউস কন্টেইনার, ১১ কোটি ৮২ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪৩ মেট্রিক টন কার্গো ও ৪ হাজার ২৫৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হ্যান্ডলিং করেছে ৩১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৯০ টিইইউস কন্টেইনার, ১২ কোটি ৩২ লাখ ৪২ হাজার ৭৪৮ মেট্রিক টন কার্গো ও ৩ হাজার ৯৭১টি জাহাজ। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হ্যান্ডলিং করেছে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ টিইইউএস কন্টেইনার, ১৩ কোটি ৭ লাখ ২৪ হাজার ৭৮৩ মেট্রিক টন কার্গো ও ৪ হাজার ৭৭টি জাহাজ। 

বন্দর কর্তৃপক্ষের গত ২৪ নভেম্বর ঘোষিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও হ্যান্ডলিংয়ে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে বন্দরে ১২ লাখ ১৩ হাজার ৮০৫ টিইইউস কন্টেইনার, ৪৫ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন কার্গো এবং ১ হাজার ৪২২টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কন্টেইনারে ১০ দশমিক ১৫ শতাংশ, কার্গোতে ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং জাহাজে ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড হয়েছে।

অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যয়

দেশীয় অর্থনীতিকে সেবা প্রদানের মাধ্যমে আয়ের পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নে চট্টগ্রাম বন্দরকে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। এতে বন্দরে টার্মিনালের সংখ্যা, ইয়ার্ড স্পেস, আধুনিক যন্ত্রপাতির সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। 

এনসিটি : চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। ২০০৭ সালে নির্মাণকাজ শেষ হওয়া এই টার্মিনাল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫০০ কোটি টাকা। যন্ত্রপাতি সংযোজনে ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা।

সিসিটি : চট্টগ্রাম বন্দরের আরেকটি আধুনিক টার্মিনাল চিটাগং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি)। ৪৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই টার্মিনালে জেটি রয়েছে তিনটি। 

পিসিটি : পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে গত বছর। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২৫০ কোটি টাকা।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর : চট্টগ্রামের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। ২০২৩ সালে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা দায়সহ এই বন্দরকে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এটি নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। মাতারবাড়ী বন্দর চ্যানেল দেশের এনার্জি সিকিউরিটি নিশ্চিত করছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এই চ্যানেল সংরক্ষণ, জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে। 

বে-টার্মিনাল : চট্টগ্রাম বন্দরের অদূরেই নির্মিত হচ্ছে বে-টার্মিনাল। চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিক এই সম্প্রসারণ প্রকল্পে দুটি টার্মিনালে বিদেশি বিনিয়োগ হবে, একটি টার্মিনাল বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হবে। এটি নির্মিত হলে গভীর সমুদ্রবন্দর সুবিধার আংশিক মেটাতে পারবে চট্টগ্রাম বন্দর। 

পানগাঁও আইসিটি : রাজধানী ঢাকার কেরানীগঞ্জে পানগাঁও ইনল্যান্ড কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০১৩ সালে প্রায় ১৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টার্মিনাল অপারেশনাল কর্মকাণ্ড শুরু করে। এই আইসিটি পূর্ণাঙ্গ চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা জাহাজ সড়ক বা নৌপথে না গিয়ে সরাসরি পানগাঁওতে চলে যাবে। সেখান থেকেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত কন্টেইনার চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরে চলে যেতে পারবে।

ডিজিটালাইজেশন : আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের অধিকাংশ সেবা এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম, অনলাইন পেমেন্ট, ডিজিটাল অ্যাক্সেস কন্ট্রোল, ডাটা এক্সচেঞ্জ সিস্টেম, সিটিএমএসসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। মেরিটাইম সিঙ্গেল উইন্ডো (এমএসডব্লিউ), সাইবার সিকিউরিটি ও সার্ভার সিস্টেম বাস্তবায়নের কাজ চলমান রয়েছে। উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এআইনির্ভর কার্গো ও ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং ও মনিটরিং প্রযুক্তি সংযোজনের। এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের জন্য বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। স্বয়ংসম্পূর্ণ চট্টগ্রাম বন্দর নিজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমেই এসব অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করতে মাশুল বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে।

ড্রেজিং : চট্টগ্রাম বন্দর কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত বঙ্গোপসাগরের জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল। কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা রক্ষায় সারা বছর ধরেই এটি সংরক্ষণ, ড্রেজিং করতে হয়। চ্যানেলের মূল বন্দর এলাকার নাব্যতাকে দীর্ঘস্থায়ী ও নির্ধারিত ড্রাফট ধরে রাখতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হয়েছে। সম্প্রতি শেষ হওয়া ড্রেজিংয়ের ফলে খালের মুখ থেকে বর্জ্য অপসারণ হয়েছে। এতে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে গেলেও খালের মাধ্যমে কর্ণফুলীতে আসা চট্টগ্রাম নগরীর বর্জ্য ড্রেজিং কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এজন্য স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বাড়তি ব্যয় করে ড্রেজিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়েছে বন্দরকে। 

পরিচালনগত ব্যয় : চট্টগ্রাম বন্দরে এখন বিশ্বের সর্বাধুনিক কি-গ্যান্ট্রি ক্রেনের মাধ্যমে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়। এর সঙ্গে আছে আরটিজি, রেল মাউন্টেড গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের আধুনিক সব যন্ত্রপাতি। এসব যন্ত্রপাতি ক্রয় যেমন ব্যয়সাপেক্ষ, তেমনি এর সংরক্ষণ ও মেরামতেও ব্যয় অনেক। ১৯৮৬ সালের পরে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ।

আইএসপিএস কোডের নির্দেশনা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর সীমা মিরসরাই-সীতাকুণ্ড উপকূলসহ এখন ৬২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। যা একসময় ছিল মাত্র ১০ নটিক্যাল মাইল। এই বিশাল সমুদ্র এলাকায় চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তা ও নজরদারিতে সার্বক্ষণিক কাজ করছে কর্তৃপক্ষ। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৩৫০ জন ওয়াচম্যান। সংযোজন করেছে ভিটিএমআইএসসহ আধুনিক সব প্রযুক্তি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিবছর ক্রমবর্ধমান হারে বেতন-ভাতা, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিতে ব্যয় করতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। এ ছাড়া বন্দরে কর্মরতদের দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক রীতিনীতি এবং নির্দেশনার অনুশীলন ও বাস্তবায়ন : চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরের মতো আইএমওর সকল স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করে আইএসপিএস ও আইএমডিজির মতো আন্তর্জাতিক কোড অনুশীলন ও বাস্তবায়ন করছে। পুরো বন্দরকে সিসিটিভির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিং, ডিজিটাল অ্যাক্সেস কন্ট্রোল, ইউভিএসএস, ডাটাবেজ তৈরি, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার ইত্যাদি আইএসপিএস কোড বাস্তবায়নের অংশ। প্রতিবছর আইএমওর প্রতিনিধিদলের পরিদর্শন ও নির্দেশনার আলোকে কর্তৃপক্ষ নিত্যনতুন নিরাপত্তাব্যবস্থার বাস্তবায়ন করছে।


বর্তমান ট্যারিফ কাঠামোর দুর্বলতা

চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সরাসরি জাহাজ চলাচল আছে এমন বন্দরগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার বন্দরগুলো বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিনিয়ত ট্যারিফ সমন্বয় করে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অধিকাংশ বন্দর নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে ট্যারিফ রিভিউ করে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর একেবারে ভিন্ন। পরিচালন ব্যয় কয়েকগুণ বাড়লেও ট্যারিফ আদায় হচ্ছে ৪০ বছরের পুরনো কাঠামোতেই। ফলে পিছিয়ে রয়েছে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বন্দরগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায়। সেবা প্রদানের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বন্দরের আর্থিক কাঠামো প্রতিযোগিতার অন্যতম সূচক হিসেবে কাজ করে। একই সময়ে পরিচালন ব্যয় কিংবা অবকাঠামোগত ব্যয়ই নয়, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে প্রায় ২৮৪ শতাংশ। ফলে ট্যারিফ বৃদ্ধি ছাড়া আগামীর বিশ্বের সাথে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিগত সুবিধা দেওয়া না গেলে বিশ্বের অন্যান্য বন্দরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে এ বন্দর। 

ট্যারিফ বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল পাবে দেশের মানুষ

বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত সমীক্ষার (ফিজিবিলিটি স্টাডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ আঞ্চলিক অন্যান্য বন্দরের তুলনায় সর্বনিম্ন। বর্ধিত ট্যারিফ হিসাবে নিলে কন্টেইনারপ্রতি ট্যারিফ বাড়বে ৩ হাজার ৮০০ টাকা। যার প্রভাবে ভোক্তাদের ওপর প্রতিকেজি পণ্যে ব্যয় বাড়বে সর্বোচ্চ ১২ পয়সা। প্রতি ১০০ টাকা মূল্যের পণ্যে ব্যয় বাড়বে ১৫ পয়সা। যা ভোক্তাদের জীবনমানে উল্লেখযোগ্য কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। দেশের রপ্তানিকারকদের ওপরও ট্যারিফের প্রভাব পড়বে না। আমাদের দেশ থেকে রপ্তানি হওয়া বেশিরভাগ পণ্যের, বিশেষত তৈরি পোশাকের পরিবহন ব্যয় দিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট দেশের আমদানিকারকরা। রপ্তানি হয় ফ্রেইট অন বোর্ড (এফওবি) পদ্ধতিতে। অর্থাৎ পণ্য পরিবহন বা শিপিং ব্যয় বহন করবে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি এ পদ্ধতিতে হয় বলে রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীরাও ট্যারিফ বৃদ্ধির ফলে সংকটে পড়বে না।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা