ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, ঢাকা ও মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:১২ এএম
ছবি: সংগৃহীত
জলদস্যুর হাত থেকে সুন্দরবন মুক্ত হলেও দেখা দিয়েছে নতুন বিপদ। বনের নদ-নদী ও খালে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার করছেন একশ্রেণির জেলেরা। এতে একদিকে যেমন হুমকির মুখে পড়েছে বনের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ তেমনি জনস্বাস্থ্যের জন্যও এটি ক্ষতির কারণ।
বনের ভেতরে মাছ শিকারের জন্য অনেক জেলে ও ব্যবসায়ী ফুরাডান, থিওডান, ব্রিফিউরানের মতো কীটনাশক পানিতে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এর বিষক্রিয়ায় শুধু মাছই নয়, চিংড়ি, কাঁকড়া, শুশুক, এমনকি মারা যাচ্ছে ক্ষুদ্র জলজ জীবও। বিষ দিয়ে মাছ ধরার কাজটি বেশি হয় শীতকালে। কারণ শীতকালে নদীর স্রোত কম থাকে, ফলে খালের আগা থেকে মাছ সহজে নেমে আসে না। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশেই জেলেরা বিষ দিয়ে সুন্দরবনের ভেতরে মাছের সঙ্গে কাঁকড়াও শিকার করছেন।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এখন শুধু প্রকৃতির আশ্রয় নয়, হয়ে উঠেছে অবৈধ বাণিজ্য কেন্দ্রও। খুলনা জেলার পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ ও আশপাশের নদীনালা থেকে প্রতিদিন ভোরে শত শত কেজি বিষ প্রয়োগে ধরা চিংড়ি গোপনে পৌঁছে যাচ্ছে ফুলতলা, দেউলিয়া ও মংলার আড়তগুলোতে। সেখান থেকে নজরদারিহীন এই বিষাক্ত মাছ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাজারে।
সুন্দরবনের জলজ সম্পদ রক্ষায় বন বিভাগ প্রতি বছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য প্রাণী আহরণে নিষেধাজ্ঞা দেয়। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা ভেঙে এবারও খুলনার কয়রা উপজেলাসহ পশ্চিম সুন্দরবনের অন্তর্গত বালুরগাং, আমড়া তুলি, ভোমরখালি, আদাচাই, কালাবগি ও পিনখালির মতো নদী ও খালে চলছে অবাধ মাছ শিকার।
স্থানীয়রা জানান, বনের ভেতরের খালগুলোতে প্রতিদিন অন্তত ২০০ থেকে ২৫০টি নৌকা ঢোকে। বন বিভাগের অনুমতি ছাড়াই এরা নিজেদের কোম্পানি জেলে পরিচয়ে মাছ ধরতে ব্যবহার করছে বিষ, কারেন্ট জাল এবং ব্যাটারিচালিত মেশিন। অভিযোগ রয়েছে, এসব বেশিরভাগের সঙ্গে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহাজন ও আড়তদারদের সরাসরি যোগাযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়রার এক জেলে বলেন, ‘আমরা ছোট মাছ ধরতে পারি না। কিন্তু কোম্পানির লোকেরা প্রতিদিন বনের ভেতর ঢোকে। বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই তারা কাজ চালায়।’
বিষ মাছ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে। এই চক্রে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, আড়তদার, কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, এমনকি স্থানীয় সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতারাও। জানা যায়, প্রতিটি নৌকা থেকে প্রতি সপ্তাহে ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়; যা ভাগ হয় বিভিন্ন স্টেশনের মাধ্যমে। এসব অর্থ স্থানীয় বন অফিস থেকে শুরু করে ওপর মহল পর্যন্ত পৌঁছায় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এই সিন্ডিকেডের সঙ্গে যুক্ত নাম-পরিচয় গোপন করে এক সদস্য বলেন, ‘সবাই জানে কে কোথায় কীভাবে ম্যানেজ হয়। টাকা না দিলে কেউ বনে ঢুকতে পারে না। সবকিছু ভাগাভাগি করেই চলে।’
অভিযোগ রয়েছে, চিংড়ির মৌসুমে (এপ্রিল থেকে অক্টোবর) এই চক্রের সদস্যরা গভীর রাতে বনের বিভিন্ন খালে প্রবেশ করে। তারা বালতি ভরে কীটনাশক ফুরাডান, থিওডান ও ব্রিফিউরান মিশিয়ে পানিতে ছড়িয়ে দেয়। এর এক ঘণ্টার মধ্যেই নদীজুড়ে ভেসে ওঠে মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, শুশুক, এমনকি ছোট কচ্ছপ পর্যন্ত। এরপর দ্রুত সেই মাছ তুলে বরফে সংরক্ষণ করা হয়।
জেলেরা জানায়, বনের ভেতরে প্রবেশে তাদের রুট জোড়শিং-পাতাখালি সড়ক-ফুলতলা মাছ বাজার-দেউলিয়া হয়ে গাবুরা ডিপো। আর এই পথেই প্রতিদিন বিষাক্ত মাছ ঢুকছে শহরের বাজারে। জানা যায়, ফুলতলার রহিম ফিস ট্রেডার্স, হেলাল অ্যান্ড ব্রাদার্স, সাইফুল এন্টারপ্রাইজ, বাবু ফিস হাউস এবং রাজ্জাক গাজী ফিশ ট্রেড এই চক্রের মূল ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এখান থেকে মাছ যায় গাবুরা, দেউলিয়া, রূপসা ও খুলনা শহরের কাটায়া এবং বানিয়াখামার ফিশ হাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আড়ত শ্রমিক বলেন, ‘চিংড়ি দেখলেই বোঝা যায় কোনটা বন থেকে এসেছে। কিন্তু সবাই চুপ থাকে। কারণ বড় বড় আড়তদাররা এতে জড়িত।’
বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেমের জন্যও প্রাণঘাতী উল্লেখ করে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘ফুরাডান ও থিওডান জাতীয় কীটনাশক পানিতে মিশে মুহূর্তেই মাছের স্নায়ুতন্ত্র বিকল করে দেয়। এসব বিষ শুধু মাছকেই মারে না, নদীর পনিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া, শৈবাল, এমনকি উদ্ভিদের বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত করে।’
এ বিষয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. ফারহানা রহমান বলেন, ‘প্রতিদিন বিষাক্ত চিংড়ি খেয়ে আমরা নিজেদেরই ধ্বংস করছি। এটি শুধু স্বাস্থ্য নয়, আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক হুমকি।’
চিকিৎসকরা বলছেন, এসব বিষাক্ত চিংড়ি নিয়মিত খেলে কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে মাছ শিকার ও নিষেধাজ্ঞার সময়ে বনে প্রবেশ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খুলনা বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক এজেএম হাসানুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার সময় সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ নেই। নিয়মিত টহল চলছে। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে জেলেদের অভিযোগ, সরকার প্রতি বছর নিষেধাজ্ঞার সময় খাদ্য সহায়তা ঘোষণা করলেও বাস্তবে তা সঠিকভাবে পৌঁছায় না। প্রকৃত জেলেরা তালিকায় অনেকেই নিজের নাম খুঁজে পান না, আবার অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিই ভুয়া পরিচয়ে সহায়তা নেয়।
ফুলতলা মৎস্য আড়তের সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা মাছের উৎস যাচাই করার ক্ষমতা রাখি না। প্রশাসন নিয়মিত নজরদারি করলে আমরাও সতর্ক হব।’ স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি, গত দুই বছরে ফুলতলা বা দেউলিয়ায় বিষ চিংড়ি পাচার রোধে কোনো বড় অভিযান পরিচালিত হয়নি।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন (২০১২), বন আইন, ও মৎস্য সংরক্ষণ বিধি (১৯৮৫) অনুযায়ী বিষ প্রয়োগ বা অবৈধ মাছ শিকার শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দোষ প্রমাণিত হলে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাবেই দোষীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুন্দরবনের এই সংকট রোধে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও সিসিটিভি নজরদারি চালু করা জরুরি। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি মৎস্য আড়তে ‘ফিশ ট্রেসিং সিস্টেম’ চালু করে উৎস যাচাই বাধ্যতামূলক করা, বিষাক্ত চিংড়ি শনাক্তে ল্যাবরেটরি ও মোবাইল টেস্টিং ইউনিট স্থাপন, জেলেদের বিকল্প জীবিকা ও প্রশিক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ এবং গোপন তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে চক্রটি ভাঙার বিষয়েও জোর দেন।
তাদের মতে, সুন্দরবনের বিষ চিংড়ি এখন শুধু পরিবেশ নয়, মানবিক ও জাতীয় সংকটের প্রতীক। প্রতিদিন বিষাক্ত মাছ খেয়ে মানুষ যেমন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, তেমনি ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতির ভারসাম্য। বন বিভাগের নিষ্ক্রিয়তা, প্রশাসনের নীরবতা ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এই অপরাধকে আরও শক্তিশালী করছে। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে সুন্দরবন হয়তো শুধু মানচিত্রে টিকে থাকবে, বাস্তবে নয়।