× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঠিকাদারের গড়িমসির বলি মাতারবাড়ী

আরমান হেকিম

প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১১:০৬ এএম

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১১:২৫ এএম

ছবি: সংগৃহীত (মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র)

ছবি: সংগৃহীত (মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র)

বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি হওয়ার কথা ছিল দেশের সবচেয়ে বড় আশার বাতিঘর। কিন্তু কেন্দ্রটি এখন পরিণত হয়েছে ছাইয়ে ডুবতে বসা এক দুঃস্বপ্নের কারখানা হিসেবে। বয়লারের ‘অ্যাশ স্ল্যাগিং’ আর ‘ফাউলিং-এ প্রথম ইউনিটের বিদ‍্যুৎ উৎপাদন ৬০০ মেগাওয়াট থেকে ২০০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। এ ছাড়া ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিটেও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। এটি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুমিটোমো করপোরেশনের। তবে দায়িত্ব পালন না করে উল্টো নানা অজুহাতে অর্থের দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যেটা নিয়ে জাপানি দূতাবাস ও জাইকার কাছে চিঠি পাঠালেও কার্যত কিছুই হয়নি। বরং নতুন অজুহাতে সময়ক্ষেপণে লায়াবিলিটি পিরিয়ড শেষ করার চেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া প্রকল্পটিতে ১০ বছর ধরে ৮৭টি অনিয়মের অভিযোগের ব‍্যাপারটিও সুরাহা করার কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। টাকার অঙ্কে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি অনিয়ম ঘটেছে। বাস্তবায়ন অগ্রগতির পর্যালোচনা সভার নথিপত্র ঘেঁটে এসব তথ‍্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। 

বিশ্লেষক ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে ছাই হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এই ছাই নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা ব‍্যর্থতা। যেকোনো কাজে লায়াবিলিটি পিরিয়ড দেওয়া হয় যেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সেটা ঠিক করে দেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এ প্রকল্পে ভিন্নচিত্র দেখা গেছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত লায়াবিলিটি পিরিয়ড থাকার পরেও সুমিটোমো করপোরেশন বয়লারের ছাই জমার সমস্যা ঠিক করে দিচ্ছে না। প্রথমে তারা নিম্নমানের কয়লার অজুহাত দিল পরে জাপানে ল্যাব টেস্টে উত্তীর্ণ হলেও তারা দায় নিতে রাজি হয়নি। জাইকা ও দূতাবাসে টেস্ট রিপোর্টসহ চিঠি পাঠানো হলে পরবর্তীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সমস্যার কারণ খতিয়ে দেখার জন্য সিডিউল দিলেও তারা সেটা করেনি। বরং ১৩৫ কোটি টাকার সংস্কার ব্যয় বহন করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে উল্টো ১৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ ভ্যারিয়েশন অর্ডারের নামে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত দাবি উত্থাপন করেছেন। এ যেন দায়বদ্ধতার নতুন সংজ্ঞাÑ ‘ত্রুটি আমাদের, ক্ষতিপূরণ তোমার!’

বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বলা হয়, ৫১ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত ‘মাতারবাড়ী ২×৬০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল-ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্ট’-এর প্রথম ইউনিটের বয়লার সেকশনে ছাই জমা হওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ইউনিটটি বন্ধ ছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে কমিশনিং হওয়ার পর থেকেই বড় ধরনের পরিচালনগত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে এটি। 

সম্প্রতি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হওয়ায় ফুল লোডের এক-তৃতীয়াংশ লোডে চালু রয়েছে। অর্থাৎ তিন ভাগে এক ভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। প্রতিটি ইউনিট ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। সে হিসাবে মাত্র ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। বাকি ৪০০ ইউনিট ক্ষতি হচ্ছে। এই মেরামতের জন্য ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (বিনামূল্যে মেরামতের জন্য ঠিকাদার কর্তৃক দেওয়া সময়কাল) চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে শেষ হবে। 

এ বিষয়ে জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুমিটোমো করপোরেশনকে বারবার জানানো সত্ত্বেও তাতে কর্ণপাত করেনি। বরং তারা প্রথমে অজুহাত দেয় নিম্নমানের কয়লা ব্যবহারের কারণে বয়লারে ছাই জমা হয়েছে। যেটার দায় তাদের নয়। পরবর্তীতে তারা প্রাইস অ্যাকসিলারেশন বাবদ অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করার জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প অফিসকে চাপ প্রয়োগ করে। এ বিষয়ে ইআরডির মাধ্যমে জাইকা অফিস এবং সর্বশেষ জাপান দূতাবাসকে অবহিত করা হলেও তারা কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি বলে প্রকল্প পরিচালক জানান। 

নিম্নমানের কয়লা ব্যবহারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কয়লার নমুনা জাপানে অবস্থিত ল্যাবে পাঠানো করা হয়। ল্যাব টেস্ট রিপোর্ট কয়লার মান উপযুক্ত ছিল বলে জানায়। পরবর্তীতে ল্যাব টেস্টের রিপোর্টসহ জাইকা অফিস ও জাপান দূতাবাসকে ইআরডির মাধ্যমে চিঠি দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সুমিটোমো করপোরেশন রুট কস এনালাইসিসে (সমস্যার কারণ বিশ্লেষণ) এর ওয়ার্কিং সিডিউল দিয়েছে। তবে তা সম্পন্ন করেনি জাপানি এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ফলে ইউনিট-১-এর ফুল লোডেড অপারেশন সম্ভব হচ্ছে না। ২য় ইউনিটেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ (বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার জন্য প্রদেয় অর্থ) বাবদ আনুমানিক ৯৫৮ লাখ ডলার বা প্রায় ১ হাজার ১৬৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ১৩৫ কোটি টাকার একটি সংশোধন পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ করতে ২১ মাসেরও বেশি সময় প্রয়োজন। তবে, জাপানি-নেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্যোগের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট বিধানের অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করে এই ব্যয়ভার বহন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ১৫ দশমিক ৬৯ শতাংশ ‘প্রাইস এসক্যালেশন’ (মূল্যবৃদ্ধি) দাবিও জমা দিয়েছে।

বৈঠকে বিদ্যুৎ বিভাগকে, প্রয়োজনে বুয়েট বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় কারিগরি ত্রুটিগুলোর মূল কারণ উদঘাটন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া জাইকা ও বিদ্যুৎ বিভাগকে সমাধান খুঁজে বের করতে একটি জরুরি বৈঠক করার জন্য অনুরোধ করা হয়। কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়, জাইকার সহায়তায় উভয় ইউনিটের মেরামত কাজসহ সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করে ইআরডিকে জানাতে হবে। আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে প্রকল্পটি সংশোধন (রিভাইস) করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

প্রকল্পটিতে অনিয়মের চিত্রও ভয়াবহ। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১১ বছরে প্রকল্পটিতে ৮৭টি অডিট আপত্তি এসেছে। এর মধ্যে মাত্র ৩১টির জবাব দেওয়া হয়েছে, বাকি ৫৬টির কোনো জবাব দেওয়া হয়নি। যেগুলোর জবাব দেওয়া হয়েছে সেগুলোও নিষ্পত্তি হয়নি। 

পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ গত মে মাসে একনেক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ৬ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা খরচের নিরীক্ষা অনিষ্পন্ন আছে। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক পলাতক। তাই উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট। কিন্তু পিডিবি নেয় মাত্র ১৮৫ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুরো সক্ষমতা ব্যবহার না হওয়া দুঃখজনক। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখতে সপ্তাহে দুবার কয়লা আমদানি করতে হয়। এতদিন নিম্নমানের কয়লা ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হতো। এখন সেই নিম্নমানের কয়লা পরীক্ষার জন্য ব্যাংককে পাঠানো হয়েছে। এখন যারা পাঠিয়েছেন, তারা পরীক্ষার প্রতিবেদন আনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ আরও বলেন, কিছুদিন আগে গণমাধ্যমে মাতারবাড়ী এলাকায় একটি সড়ক বানাতে অত্যধিক খরচের সংবাদ এসেছে। প্রতি কিলোমিটারে রেকর্ড পরিমাণ হওয়ার কথাও উঠে আসে। 

তিনি বলেন, সড়কটির বেশিরভাগ অংশ উঁচুনিচু। সেখানে সেতু-কালভার্ট বানাতে হয়েছে। সড়কের দৈর্ঘ্যের অর্ধেকের বেশি সেতু-কালভার্ট। তাই খরচ খুব বেশি হয়নি।

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, অডিট আপত্তির কোনোটিই নিষ্পত্তি না হওয়া ক্রয়কার্য সম্পাদনে চরম অদক্ষতার পরিচায়ক, যা অত্যন্ত হতাশাজনক। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালিত কোম্পানি ও অডিট কর্তৃপক্ষ ফাপাডের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করবে। 

বৈঠকে বলা হয়, ইউনিট-১-এর মেরামত ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ডের মধ্যেই সম্পন্ন নিশ্চিত করতে হবে। ইআরডির মাধ্যমে চিঠি দিয়ে জানাতে হবে, নির্ধারিত সময়ে জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিনা শর্তে মেরামত সম্পন্ন না করলে এবং ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড শেষ হয়ে গেলে দেশের প্রকিউরমেন্ট রুলস অনুযায়ী জমাকৃত পারফরমেন্স সিকিউরিটি বাজেয়াপ্ত করাসহ ভবিষ্যতে এদেশের যেকোনো কাজে যেন অংশ নিতে না পারেÑ সেজন্য ব্ল্যাকলিস্টে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এটি প্রয়োগ করা হলে বাংলাদেশ-জাপানের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের জন্য সম্মানজনক হবে না এবং বিব্রতকর হবে। এ ছাড়া লায়াবিলিটি পিরিয়ড শেষে এ সমস্যা উদ্ভূত হলে তা নিরসনে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্ভাব্য গৃহীতব্য ব্যবস্থাদি হিসেবে স্থাপিত বয়লার ম্যানুফাকচারিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। 

উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সূত্রে জানা গেছে, এক হাজার ৬০০ একর পরিত্যক্ত লবণের মাঠে ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা দিচ্ছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা, বাকি টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হয় ডিসেম্বর মাসে। এই ইউনিটেরও উৎপাদন সক্ষমতা ৬০০ মেগাওয়াট।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা