× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নিজেদেরই লাইসেন্সের মেয়াদ নেই, তারা দিচ্ছেন পাইলটদের লাইসেন্স

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২৬ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৫৬ পিএম

নিজেদেরই লাইসেন্সের মেয়াদ নেই, তারা দিচ্ছেন পাইলটদের লাইসেন্স

বাংলাদেশের পাইলটদের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের দায়িত্ব রয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ফ্লাইট অপারেশন্স ইন্সপেক্টরদের (এফওআই) ওপর। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) কঠোর নিয়ম অনুযায়ী এই ইন্সপেক্টরদের নিজস্ব বৈধ পাইলট লাইসেন্স, টাইপ রেটিংসহ পূর্ণ অপারেশনাল যোগ্যতা থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাংলাদেশে দায়িত্বে থাকা ছয় ফ্লাইট অপারেশন্স ইন্সপেক্টরের (এফওআই) মধ্যে অন্তত পাঁচজনেরই লাইসেন্সের মেয়াদ বহু বছর আগেই শেষ হয়েছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এর মধ্যে একজনের ১৯ বছর আগে মেয়াদ শেষ হয়েছে। বিমান নিরাপত্তা সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই পদে অযোগ্য ও বৈধতাহীন ইন্সপেক্টরদের দায়িত্ব পালনে উদ্বেগ বাড়ছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। আগামী আইকাও কো-অর্ডিনেটেড ভ্যালিডেশন মিশনে (আইসিভিএম) বাংলাদেশ ‘সিগনিফিক্যান্ট সেফটি কনসার্ন (এসএসসি)’-এ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বৈধ লাইসেন্স নেই, তবুও অনুমোদন দিচ্ছেন নতুন পাইলটদের

বেবিচক সূত্র জানায়, বর্তমানে দায়িত্বে থাকা এফওআইদের মধ্যে ক্যাপ্টেন রাফি উল হকের ২০০৬ সালে, ক্যাপ্টেন ফরিদ-উজ জামানের ২০১৫ সালে, ক্যাপ্টেন আশরাফুল আজহারের ২০১৬ সালে, ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ মিয়ার ২০১৫ সালে, ক্যাপ্টেন মনিরুল হক জোয়ারদারের ২০২৫ সালের জুলাইয়ে লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এদের বাইরে ক্যাপ্টেন ফেরদৌস হোসেন ৬৮ বছর বয়সে নতুন এয়ার ট্রান্সপোর্ট পাইলট লাইসেন্স (এটিপিএল-৪১২) পেয়েছেন। তার ক্ষেত্রেও মেডিকেল সার্টিফিকেটসহ বেশকিছু বাধ্যতামূলক নথি চাওয়া হয়নি। আইকাও ডক ৮৩৩৫-এর ৬.২.১.১ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, লাইসেন্স সম্পর্কিত দায়িত্বে থাকা যেকোনো ইন্সপেক্টরের থাকতে হবে বৈধ পাইলট লাইসেন্স, বর্তমান টাইপ রেটিং এবং অপারেশনাল যোগ্যতা। বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন প্রসিডিউরেও একই মানদণ্ড বাধ্যতামূলক। কিন্তু বেবিচকের কার্যক্রম চলছে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে।

মেডিকেল-অযোগ্য পাইলটই হয়েছেন ইন্সপেক্টর

অভিজ্ঞতা স্বল্প, অবসরে যাওয়া বা মেডিকেলে অযোগ্য পাইলটই হয়েছেন ইন্সপেক্টরÑ এমন অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছেন ক্যাপ্টেন ফরিদ-উজ জামান। যিনি আগে কোনো এয়ারলাইনসেই প্রশিক্ষক ছিলেন না, তার নাম নিয়ে আলোচনাই সবচেয়ে বেশি। মেডিকেল সমস্যা থাকায় তিনি সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনস থেকে চাকরিচ্যুত হন। শিক্ষাগত যোগ্যতা শুধু এইচএসসি। ক্যাপ্টেন আশরাফুল আজহার ছিলেন কেবল বিমানবাহিনীর ট্রান্সপোর্ট পাইলট; বাণিজ্যিক ফ্লাইটের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এমনকি এফওআই হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচ হাজার ঘণ্টার ক্যাপ্টেন সময়ও নেই।

আরেকজন ক্যাপ্টেন মাজেদ মিয়া বিমানবাহিনীর ফ্লাইট ট্রেনিং সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়ে পরে প্রশাসনিক পদে যান। তার আধুনিক বিমানের কোনো ফ্লাইট অভিজ্ঞতা নেই। শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি। ক্যাপ্টেন মনিরুল হক জোয়ারদারের অতীতেও বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন এয়ারলাইনসে দায়িত্ব পালনকালে একাধিক বিমান দুর্ঘটনায় পাইলট মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে তার নেতৃত্বাধীন প্রশিক্ষণ ইউনিটের নাম উঠে আসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা নিজেরাই বহু বছর বিমানে উড়েননি বা আধুনিক এয়ারক্রাফটের রেটিং নেই, তারা কীভাবে দেশের বাণিজ্যিক পাইলটদের যোগ্যতা যাচাই করছেনÑ এটাই এখন মূল প্রশ্ন।

অযোগ্যতা আড়াল করে বিদেশ সফরের সুবিধা

বেবিচকের একাধিক সূত্র জানায়, এফওআই পদের সঙ্গে জড়িত একটি প্রভাবশালী গ্রুপ নিরাপত্তা তদারকি বিভাগের সিকিউরিটি পাসের সুযোগ কাজে লাগায়। এই পাস ব্যবহার করে তারা জিডি (জেনালের ডিক্লিয়ারেশন) দেখিয়ে ভিসা বা টিকিট ছাড়াই বিদেশে ভ্রমণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেকে সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বিদেশে অডিটেও গেছেন। সূত্র বলছে, প্রাক্তন পাইলট ফরিদ-উজ জামান, মাজেদ মিয়া, মোতাহারÑ এসব নাম তাদের তালিকায় রয়েছে।

যোগ্য এফওআইদের সরিয়ে অযোগ্যদের চুক্তি নবায়ন

অভিযোগ রয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় চার পরামর্শকের চুক্তি নবায়ন না করতে বলেছিল তাদের যোগ্যতা না থাকায়। অক্টোবরের ওই চিঠিতে বলা হয়, শুধুমাত্র যোগ্য ব্যক্তিদের চুক্তি বাড়ানো যাবে। কিন্তু বেবিচক উল্টো পথে হেঁটে ৪৬ জনের চুক্তি নবায়ন করেছে, তাদের অনেকেরই বৈধ লাইসেন্স নেই। অন্যদিকে বৈধ লাইসেন্সধারী দুই সাবেক এফওআই আজিজ আব্বাসি রফিক ও কাজী কবির উদ্দিন আহমেদ, যাদের সব মানদণ্ড পূরণ ছিল, তাদের চুক্তি নবায়ন করা হয়নি। একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বেবিচকের একজন প্রভাবশালী সদস্য (এফএসআর) এসব সিদ্ধান্তে সরাসরি ভূমিকা রাখেন।

নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও আইকাও মানদণ্ড উপেক্ষা

গত ৮ নভেম্বর প্রকাশিত নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে বেবিচক বৈধ এটিএল, টাইপ রেটিং বা বয়সসীমা কোনোটিই বাধ্যতামূলক রাখেনি। আইকাও মানদণ্ড সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পরামর্শক পদের ন্যূনতম যোগ্যতা এটিপিএল থেকে নামিয়ে এইচএসসি করা হয়েছে, যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস ২০০৮-এর বিরোধী। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের পথ উন্মুক্তই রাখা হয়েছে।

বিমান নিরাপত্তা-সংক্রান্ত এসব অনিয়মের বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বর্তমান ফ্লাইট অপারেশন ইন্সপেক্টরদের অনেকের লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ। এ ছাড়া নতুন করে নিয়োগ এখনও হয়নি। ইন্সপেক্টর ছাড়া সঠিক ফ্লাইট নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ এসব এফওআই দিয়ে কার্যক্রম চালানোও নীতিবহির্ভূত। নতুন যোগ্য পরিদর্শক নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে দেশের এভিয়েশন নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনায় ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক রুটে বাংলাদেশের এয়ারলাইনসগুলোর ভবিষ্যৎ হবে প্রশ্নবিদ্ধ।

তিনি আরও বলেন, এফওআই একটি দেশের এভিয়েশনের মেরুদণ্ড। এখানে যারা থাকবেন তাদের হতে হবে সর্বোচ্চ যোগ্য। বাংলাদেশ এখানে বহু বছর ধরে অনিয়ম করে যাচ্ছে। আগামী আইকাও অডিটে এসএসসি পাওয়া মানে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত আন্তর্জাতিকভাবে অবিশ্বস্ত হয়ে পড়বে। বৈধ লাইসেন্সবিহীন ব্যক্তিরা যদি পাইলটদের যোগ্যতা যাচাই করেন, তাহলে এটি সরাসরি সেফটি হ্যাজার্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। আইকাও এমন অনিয়মকে মূল্যায়নে বড় নেতিবাচক হিসেবে ধরে। এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ, আন্তর্জাতিক রুট সীমিত হয়ে যেতে পারে। এ বিষয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

আইকাও অডিটের সামনে বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

বিমান চালনা বিশেষজ্ঞদের মতে, অযোগ্য এফওআইদের মাধ্যমে বিদেশি এটিও অডিট, পাইলট সার্টিফিকেশন, টাইপ রেটিং, প্রশিক্ষণ তদারকিÑ এসবই অনিয়মিত হওয়ায় আইকাও এসব কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করতে পারে।

এর ফলে এফএএ, ইএএসএ এমনকি আইএটিএ-এর নিরাপত্তা মূল্যায়নেও বাংলাদেশ বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে; যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, বিমানের কোড-শেয়ার, নতুন বিমান কেনা-ভাড়া ও বিদেশে পাইলট প্রশিক্ষণে। বৈধ লাইসেন্সবিহীন, অভিজ্ঞতাহীন ও বয়স উত্তীর্ণ ইন্সপেক্টরদের হাতে পাইলট লাইসেন্সিংয়ের মতো গুরুতর কাজ থাকা শুধু অনিয়ম নয়, এটি দেশের বিমান নিরাপত্তাকে গভীর ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে।

আগামী আইকাও অডিটের আগে এসব সমস্যার সমাধান না হলে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত আন্তর্জাতিকভাবে বড় সংকটে পড়তে পারেÑ এমন সতর্কবার্তা দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা