দীপক দেব
প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৪৯ এএম
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জারি হাওয়া ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার)’ বাস্তবায়ন আদেশের ধারা-৬ অনুযায়ী গণভোট আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সহায়ক আইন প্রণয়নের কাজ শেষ করা হয়েছে। গণভোটের আইনটি পাসের জন্য আজ মঙ্গলবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। ১৯৯১ সালের গণভোট আইনের আলোকেই নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, গত বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গণভোটের জন্য ‘যথোপযুক্ত আইন’ প্রণয়নের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়ার পর আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ আইনের খসড়া প্রণয়নের কাজ শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল সোমবারই আইনের কাজ শেষ করা হয়েছে। আইনটি উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের জন্য আজকের বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৯১ সালের গণভোট আইনটি করা হয়েছিল সংবিধান সংশোধনী কোনো বিল সংবিধানের ১৪২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদে গৃহীত হওয়ার পর তাতে রাষ্ট্রপতি সম্মতি দান করবেন কী করবেন নাÑ এ প্রশ্নটি যাচাইয়ের জন্য গণভোটের বিধান প্রণয়নকল্পে। আর এবারের আইনটি করা হচ্ছে, জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত অংশ সংসদে অনুমোদনের আগেই গণভোটের মাধ্যমে যাচাইয়ের জন্য।
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গণভোট পরিচালনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুস্পষ্ট আইন অপরিহার্য। তবে সংবিধান সংস্কার এখন রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। তাই দ্রুত আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যালট পদ্ধতি, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, প্রচারের বিধি এবং ফলাফল চূড়ান্ত করার নিয়ম সবকিছু আইনেই নির্ধারিত হবে। জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত থাকায় আইন প্রণয়নের জন্য বিকল্প সাংবিধানিক কাঠামো ব্যবহার করতে হচ্ছে। অর্থাৎ অধ্যাদেশ জারি করা হবে।
১৯ নভেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব তানিয়া আফরোজ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবসমূহ অনুমোদনের জন্য গণভোট প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারের পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেছেন। ধারা-৬ অনুযায়ী, গণভোট আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে যথোপযুক্ত আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের কার্যকর প্রস্তুতির জন্য গণভোটের উপযোগী আইন প্রণয়ন জরুরি। এটি লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের দায়িত্বে থাকায় দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (ড্রাফটিং ও মুদ্রণ ও প্রকাশনা) ড. মোহাম্মদ মহিউদ্দীন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এই মুহূর্তে এটা (গণভোট আইন) নিয়ে কথা বলার সুযোগ নেই। তবে এটুকু বলতে পারি আইনটি কাল (মঙ্গলবার) উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে যেতে পারে। তবে একই শাখার একটি সূত্রে জানা গেছে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত যে অংশ গণভোটে উপস্থাপন করার কথা বলা হয়েছে গণভোট আইনে তা উল্লেখ থাকবে।
জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংস্কার বিষয়ে গণভোট প্রসঙ্গে আদেশে বলা হয়, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে এ আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত অংশ গণভোটে উপস্থাপন করা হবে। গণভোটের ব্যালটে উপস্থাপনীয় প্রশ্ন-১. গণভোটে নিম্নরূপ প্রশ্ন উপস্থাপন করা হবেÑ আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?; (হ্যাঁ/ না) :
(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। (খ) আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধনী করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। (গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও কয়েকটি সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। (ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
(২) ব্যালটের মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ব্যালটে প্রত্যেক ভোটার গোপনে ভোট দান করবেন। গণভোট অনুষ্ঠানের বিষয়ে বলা হয়, এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন এই আদেশ অনুসারে গণভোট অনুষ্ঠান করা হবে। গণভোট অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে যথোপযুক্ত আইন প্রণয়ন করবে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার গণভোটের প্রস্তুতি নিতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) চিঠি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। চিঠিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোটের আয়োজন করতে বলা হয়েছে। গত শনিবার এ প্রসঙ্গে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, সরকার চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, গণভোট করা ইসির দায়িত্ব। একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের আয়োজন করতে বলা হয়েছে। এদিকে বিকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস’ আয়োজিত কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসিরউদ্দিন বলেছেন, আগামী সপ্তাহে গণভোটের আইন পাস হবে। আইন হলেই কাজ শুরু করবে কমিশন। আইন না হওয়া পর্যন্ত কমিশন এ বিষয়ে কাজ করতে পারবে না।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, গণভোটের অধ্যাদেশ জারির পর আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু করবে ইসি। অধ্যাদেশ অনুযায়ী গণভোটের বিধিমালা করবে সাংবিধানিক সংস্থাটি। ওই বিধিমালায় ব্যালট কেমন হবে, ভোটগ্রহণ ও গণনা প্রক্রিয়া বিস্তারিত উল্লেখ থাকবে। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পৃথক রঙের ব্যালট থাকবে। সংসদ নির্বাচনের ব্যালট হবে আগের মতোই সাদা-কালো। গণভোটের জন্য সবুজ বা গোলাপি রঙের ব্যালট চিন্তা করা হচ্ছে। যদিও বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি।