দীপক দেব
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০২৫ ১২:৩৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
গণভোট নিয়ে মতপার্থক্য এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো। তবে এর মধ্যেই নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) গণভোটের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে ইসিকে দেওয়া চিঠিতে বলা হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোটের আয়োজন করতে। এদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসিরউদ্দিন জানিয়েছেন, গণভোটের প্রস্তুতি নিতে কমিশন আইন পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘আগামী সপ্তাহে গণভোটের আইন পাস হবে। আইন হলেই কাজ শুরু করবে কমিশন।’
এদিকে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী গণভোট নিয়ে এখনও বিপরীতমুখী অবস্থানে। গতকাল শনিবারও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গণভোটের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ মানুষ বুঝতে পারছে না। শেষদিন পর্যন্তও বুঝতে পারবে না। একই দিন জামায়াতে ইসলামী আবারও জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোটের আয়োজন নিয়ে বিরোধিতা করেছে। দলটি মনে করছে, ‘নির্বাচনের দিন গণভোট হলে জেনোসাইড হওয়ার ঝুঁকি আছে।’
এমন প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঐকমত্য কমিশন ও সরকারের পর সকল রাজনৈতিক দলেরই উচিত সংস্কার ও গণভোটের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখানো। তারা যদি মনে করেন সংস্কার দরকার, গণভোট দরকার, তাহলে এই মতপার্থক্য থাকবে না। বিষয়টির সমাধান এখন রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
উল্লেখ্য, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও গণভোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধের মধ্যে গত ১৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দেন। তবে জামায়াতে ইসলামীসহ আটটি ইসলামী দল এখনও জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি জানিয়ে আসছে। এদিকে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার এক সপ্তাহ পর গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ইসিকে চিঠি দিয়ে গণভোটের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে। এর আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসির সংলাপে গণভোট নিয়ে ইসির প্রস্তুতির বিষয়ে সিইসি বলেছিলেন, সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাওয়ার পর ইসি সিদ্ধান্ত নেবে। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়ার আগেই আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছিলেন, ‘আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে গণভোট অধ্যাদেশ প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন হবে।’
নির্দেশনার পর আইনের অপেক্ষায় ইসি : ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে একসঙ্গে আয়োজনে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ইসিকে চিঠি দিয়েছে। চিঠি প্রসঙ্গে ইসি সচিব আখতার আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই চিঠি পেয়েছি। সরকার চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, গণভোট করা ইসির দায়িত্ব। এক্ষেত্রে একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট করার জন্য বলা হয়েছে।’
এদিকে গতকাল শনিবার রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে প্রস্তুতির বিষয়ে মন্তব্য করেন সিইসি এএমএম নাসিরউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমাদের একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করতে হবে, একই ‘রিসোর্স’ ব্যবহার করে। এটা আগে ছিল না। আগের কোনো কমিশনকে এই চ্যালেঞ্জ দিতে হয়নি। এটার জন্য অনেকগুলো অতিরিক্ত কাজ করতে হবে। কিন্তু গণভোটটা আমাদের আয়োজন করতে হবে। আমরা একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করব, কারণ আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আইন না হওয়া পর্যন্ত কমিশন এ বিষয়ে কাজ করতে পারবে না। আগামী সপ্তাহেই গণভোট আইনটি পাস করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আইন পাস হলে সেই আইন অনুযায়ী কমিশন প্রস্তুতি ও সিদ্ধান্ত নেওয়া শুরু করবে।’
গণভোটের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’Ñমানুষ বুঝছে না : ‘গণভোট নিয়ে এখনও মানুষ বুঝতে পারেনি’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘পিআর দেশের মানুষ বোঝে না। পিআরের সঙ্গে আমরা পরিচিত নই। গণভোটের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’Ñমানুষ বুঝতে পারছে না। শেষদিন পর্যন্তও বুঝতে পারবে না।’ তিনি বলেন, ‘দেশে কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের কথা বলেছেন। সংস্কারের জন্য অনেক পণ্ডিত বিদেশ থেকে এসেছেন। ৮-৯ মাস সংস্কারের সবশেষে যেটা বলেছে পিআর, সেটা আমরাই ঠিকমতো বুঝি না, সাধারণ মানুষের জন্য আরও কঠিন। গণভোট করবেন একটি ব্যালটে চারটি প্রশ্ন, এখনও মানুষ বুঝতে পারছে না, শেষদিন পর্যন্তও বুঝতে পারবে না।’
জেনোসাইডের আশঙ্কা জামায়াত আমিরের : এদিকে গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম সফরকালে নগরের চকবাজার প্যারেড মাঠে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচনের দিন গণভোট চাই না। নির্বাচনের দিন গণভোট হলে জেনোসাইড হওয়ার আশঙ্কা আছে।’ তিনি বলেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। সেটা আমাদের তৈরি করতে হবে। এই নির্বাচন না হলে দেশে সংকট দেখা দেবে। কিন্তু আমরা কোনো সংকট তৈরি হতে দেব না।’
এখন দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের : এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোটের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পরও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের প্রতি ঐকমত্য কমিশনের অন্যতম সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মানুষ না বুঝলে এটা তো বোঝানোর দায়িত্ব তাদের (রাজনৈতিক দলের)। তারা যদি আন্তরিক হয়, সদিচ্ছা নিয়ে মানুষকে বোঝাতে চায়, তাহলে অবশ্যই মানুষ গণভোটের বিষয়গুলো বুঝবে। ঐকমত্য কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত দেওয়ার পর এখন এটা বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের। তারা যদি সংস্কার চায়, গণভোট চায়, তাহলে এগুলো কোনো সমস্যা না। তারা চাইলে হবে, না চাইলে হবে না। এখন সব দায়দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের।’
সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে প্রস্তুত কমিশন : এদিকে রাজধানীর গুলশানে একটি বেসরকারি হোটেলে এক কর্মশালার উদ্বোধন শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ বলেছেন, ‘একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে প্রস্তুত বর্তমান কমিশন। তবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে সামাজিক মাধ্যমে অপতৎপরতা ও এআইর অপব্যবহার ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘ঐতিহাসিক হবে’ বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের পুনঃসূচনা হবে। রেকর্ড সংখ্যক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেবেন। তারা সবাই একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনের অংশীদার হতে আগ্রহী।’