মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ২১ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৪৮ এএম
ছবি : সংগৃহীত
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমশই অবনতি ঘটছে। হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই, নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের ঘটনা বেড়ে চলেছে। এমনকি বিচার বিভাগ ও আইন-আদালতের নিরাপত্তা নিয়েও জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিচার বিভাগ, আইন-আদালত ও বিচারকদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে তা আরও বেড়েছে। বিচারকদের বাসায় ঢুকে হামলা করার মতো ঘটনাও ঘটছে। ফলে দেশের ৬৪টি জেলায় কর্মরত দুই হাজারের বেশি বিচারকের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উৎকণ্ঠা ও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ গত ১৩ নভেম্বর রাজশাহী মহানগর ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আব্দুর রহমানের রাজশাহীর বাসায় ঢুকে তার স্ত্রী তাসমিন নাহার ও ছেলে তাওসিফ রহমানের ওপর হামলা চালায় এক যুবকÑ যার নাম লিমন মিয়া। হামলায় তাওসিফ রহমান ঘটনাস্থলেই মারা যায়। আহত তাসমিন নাহারকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় সারা দেশে চাঞ্চল্য তৈরি হয়। বিচারকদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও উদ্বেগ ও নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। দেশের প্রতিটি আদালত, বিচারকের বাসস্থান ও তাদের যাতায়াতের সময় অবিলম্বে নিরাপত্তা বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য নিযুক্তিসহ দুই দফা দাবি জানায় বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। আরেক দাবিতে এই অ্যাসোসিয়েশন রাজশাহীর ঘটনায় সম্পৃক্ত এবং গ্রেপ্তার করা আসামিকে আইন-বহির্ভূতভাবে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায়। এ সময় তারা দাবি না মানলে ১৬ নভেম্বর থেকে কলম বিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করে। তবে ১৫ নভেম্বর রাতেই আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সঙ্গে বৈঠকের পর সংগঠনটি এ কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়।
আগেও নিরাপদ ছিলেন না বিচারকরা
বিচারকদের নিরাপত্তাহীনতার ঘটনা নতুন নয়। ২০০৫ সালে ঝালকাঠি জজ আদালতের সিনিয়র সহকারী জজ হিসেবে কর্মরত দুই বিচারক সোহেল আহমেদ ও জগন্নাথ পাড়ে জঙ্গিদের আক্রমণে নিহত হন। ২০১৫ সালের ৯ জানুয়ারি ফেনী জেলায় কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল কাদির মিয়া, রাশেদুর রহমান ও শিহাব উদ্দিন আহমদের ওপর বোমা হামলা চালানো হয়। এ সময় আব্দুল কাদির মিয়ার চোখ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ম্যাজিস্ট্রেট রাশেদুর রহমানের স্ত্রী সাঈদা আফরীন মুস্তারি আহত হন। ২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে উল্টোপথে মোটরসাইকেল চালানোর প্রতিবাদ করায় চট্টগ্রামের পঞ্চম যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ জহির হোসেনের ওপর হামলা হয়। ২০২২ সালের মার্চ মাসে দেশের বিচারক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা চালানোর পরিকল্পনা করার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। ডিএমপির মিডিয়া সেন্টার থেকে এসএমএস পাঠিয়ে সাংবাদিকদের এই গ্রেপ্তার করার সংবাদ জানানো হয়েছিল।
২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর বাংলাদের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের অধিবেশন চলাকালে বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি কাজী ওয়ালিউল ইসলামের বেঞ্চে কিছু আইনজীবী বিচারকদের উদ্দেশে ডিম ছুড়ে মারেন। চলতি বছরের অক্টোবর মাসে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাজী আজিম উদ্দিন কলেজ রোডে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকায় দুই বিচারকের বাংলোতে চুরির ঘটনা ঘটে। চোররা তাদের বাড়ি ভাঙচুর করে এসি ইউনিট, বৈদ্যুতিক সংযোগের তামার তার, বাথরুম ফিটিংস, সিরামিকস প্লেট, পানির ট্যাপ, প্রেশার কুকার, রাইস কুকার, ওভেন, টর্চলাইট, প্লাস্টিক পাইপসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যায়।
বারবার চিঠি পাঠানো হলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিচার বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, দেশের প্রত্যেক আদালত ও ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণ, এজলাস, বিচারকদের বাসভবন ও গাড়িতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে সুপ্রিম কোর্ট থেকে বারবার চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু সরকার কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। বিচার বিভাগের সদস্যরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও তাদের নিরাপত্তা সুরক্ষিত করা হচ্ছে না।
এদিকে জেলা পর্যায়ের প্রত্যেক বিচারকের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি আবাসন ও পরিবহন নেই। চৌকি আদালতে কর্মরত বিচারকদের অবস্থা আরও শোচনীয়। ফলে বিচারকদের বাধ্য হয়ে অরক্ষিত বাসায় ভাড়া থাকতে হয়, রিকশা-ভ্যানে করে এমনকি পায়ে হেঁটেও যাতায়াত করতে হয়। এসব কারণেও নিরাপত্তাহীনতার সংকট বাড়ছে।
বিচারক পরিবারের এক সদস্য প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিচার বিভাগ ও বিচারকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকারের অবহেলার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আমরা সোচ্চার রয়েছি। কিন্তু সরকার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় বিচারকরা নিয়োজিত থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দায়িত্বশীলদের এই দায় কোনোভাবে এড়ানোর সুযোগ নেই।’
৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ হাইকোর্টের
গত ১৫ নভেম্বর রাতে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে বৈঠক শেষে কর্মসূচি প্রত্যাহারের কথা জানিয়ে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের যৌক্তিক দাবির বিষয়ে আইন উপদেষ্টার সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। আলোচনা সাপেক্ষে ঘোষিত কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়েছে।’
তবে ১৬ নভেম্বর রবিবার সারা দেশের সব আদালত প্রাঙ্গণে ও বাসস্থানে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিরাপত্তা বাড়ানোর নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়। হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউনূস আলী আকন্দ এ রিট করেন। রিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে। গত ১৮ নভেম্বর মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টসহ সারা দেশের অধস্তন আদালতে নিরাপত্তাব্যবস্থার চিত্র সম্পর্কে জানতে হাইকোর্ট রেজিস্ট্রার জেনারেলকে কমিটি গঠন করে ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। রুলে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণসহ অধস্তন সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত এবং ট্রাইব্যুনালগুলোয় কর্মরত বিচারক এবং তাদের এজলাস ও বাসভবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
উচ্চ আদালত আগেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আদেশ দিয়েছেন
এর আগেও ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণসহ অধস্তন সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত বা ট্রাইব্যুনালগুলোয় কর্মরত বিচারক এবং তাদের এজলাস ও বাসভবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে আদেশ জারি করা হয়। কিন্তু সেই আদেশের পরও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমন প্রেক্ষাপটে গত ১৬ নভেম্বর আইনজীবী মেহেদী হাসান বাদী হয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। এই রিট আবেদনের শুনানিতে আইনজীবীরা উল্লেখ করেন, অধস্তন সব দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোয় কর্মরত বিচারক এবং তাদের এজলাস ও বাসভবনের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, যা বিচার বিভাগের জন্য অশনিসংকেত। শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল ও আদেশ দেন।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে জানুয়ারি মাসে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী নিম্ন আদালতের নিরাপত্তায় ১১ দফা নির্দেশনা জারি করেন। প্রধান বিচারপতি দেশের সকল অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এই নির্দেশনা দেন। তবে আদালত প্রাঙ্গণের বাইরে বিচারকদের নিরাপত্তার বিষয়টি সেভাবে কার্যকর করা হয়নি।
জেলা পর্যায়ে যেসব বিচারক গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি করেন, তাদের আবাসস্থল ও যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনও প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর হয়নি। এ বিষয়ে ঢাকার নিম্ন আদালতের এক বিচারক-পরিবারের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের সরকারি বাসার গেটে পুলিশ প্রহরা থাকলেও তা অপর্যাপ্ত। যাতায়াতের সময়ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা থাকে না।’ বিচারকদের পরিবারের আরেক সদস্য জানান, ‘নিম্ন আদালতের নিরাপত্তা সব সময়ই হুমকির মুখে থাকে। ঢাকার আদালতে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি অনেক বিচারকের জীবনও অনেক সময় ঝুঁকিতে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘বিচারকদের চব্বিশ ঘণ্টার নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা উচিত।’
এ বিষয়ে আইন ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিচারক ও তার পরিবারের ওপর এমন হামলা দুঃখজনক। এ বিষয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এ ছাড়া সকল বিচারকের নিরাপত্তার বিষয়টি অধিকতর বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।