ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৫ ০৮:৫৭ এএম
অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক দেশের ৫০ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ নিয়ে প্রশাসনের সর্বস্তরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই নানা প্রশ্ন উঠেছে। যদিও দীর্ঘ যাচাই-বাছাই, গোয়েন্দা সংস্থার মতামত, মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনসহ পাঁচ স্তরের পরীক্ষার পর এ-সংক্রান্ত পৃথক পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে নিয়োগে জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা ও সিনিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সুপারিশ অনেক ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এর বদলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রভাবশালী দুই আমলার অভিমতই মুখ্য ভূমিকা রেখেছে এ নিয়োগে।
বিএনপি ঘনিষ্ঠ সাবেক আমলাদের একটি অংশ মনে করছে, সদ্য নিয়োগ পাওয়া ৫০ ডিসির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তাই দুটি রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ডিসি নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্যই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এ অবস্থায় তারা তাই বলছেন, নতুন নিয়োগ পাওয়া ডিসিদের দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা যায় না। এমন প্রেক্ষাপটে আমলাদের একাংশের পক্ষ থেকে আগামী সপ্তাহে সরকারের সর্বোচ্চ মহলে এ নিয়োগ বাতিলের দাবি উঠতে পারে।
নিয়োগের প্রথম থেকেই আলোচনা : গত এক সপ্তাহ আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ডিসি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগেই প্রশাসনে গুঞ্জন ছিল ঢাকা, খুলনাসহ কয়েকটি জেলায় ডিসি নিয়োগ ঘিরে বড় ধরনের লবিং চলছে। এসব জেলায় অভিজ্ঞ উপসচিবদের নাম প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছিল এসএসবি। কিন্তু পরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের জোর তদবিরের কারণে তালিকায় থাকা অনেকেই বাদ পড়েছেন, যা নিয়ে প্রশাসনে বিতর্ক চলছে।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন যুগ্ম সচিব বলেন, এসএসবির তালিকা ও চূড়ান্ত তালিকার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে। ১২-১৪ জনকে বাদ দিয়ে যাদের উঠিয়ে আনা হয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা তুলনায় অনেক কম। তবে এসএসবি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; সেটি মাঠপর্যায়ের বহু তথ্য বিশ্লেষণের ফল। তা উপেক্ষা করা মানে প্রশাসনিক কাঠামোয় ভুল বার্তা দেওয়া।
বিতর্কের কেন্দ্রে ঢাকা আর খুলনা : ঢাকা জেলার নতুন ডিসি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা উঠেছে। রাজধানী জেলার মতো জটিল প্রশাসনিক এলাকায় অভিজ্ঞ, সংকট মোকাবিলায় দক্ষ, উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় পারদর্শী কর্মকর্তা নিয়োগ পাওয়ার কথা। অথচ ঢাকায় এবার নতুন যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তিনি এর আগে কোথাও ডিসি হিসেবেই কাজ করেননি। তাই তার মাঠপর্যায়ে সংকট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম। একইভাবে বিভাগীয় জেলা খুলনায়ও নতুন ডিসির নিয়োগ নিয়ে একই প্রশ্ন উঠেছে। বিভাগীয় জেলায় নির্বাচনকালে এই নিয়োগপ্রাপ্তরা আইনশৃঙ্খলাজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতদূর সফল হবেÑ সেই প্রশ্ন বিভিন্ন মহলে।
নিয়োগ পাওয়া ডিসিদের ক্ষেত্রে যে অভিযোগটি সবচেয়ে বেশি উঠছে, সেটি হলো তাদের বেশিরভাগই অতীতে দুটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং পরবর্তী সময়েও তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা অব্যাহত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক ডিসি বলেন, ‘ঢাকা জেলা রাষ্ট্রের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং জেলা। এখানে অভিজ্ঞতা অগ্রাধিকার পাওয়া জরুরি। এখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পরিচালনার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদিকটি এবার ডিসি নিয়োগে উপেক্ষা করা হয়েছে।’
দুই প্রভাবশালী আমলার ভূমিকা : সূত্র বলছে, নতুন ডিসি নিয়োগের পেছনে প্রভাবশালী দুই আমলার বিশেষ প্রভাব রয়েছে। তাদের মতামত অনুসারে প্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়ন হয়ে আসছে বলেও প্রশাসনে গুঞ্জন ও আলোচনা রয়েছে। তাদের একজন প্রশাসন সাজানোর ক্ষেত্রে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের হয়ে পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছেন। এরই অংশ হিসেবে নির্বাচনকালীন ডিসি নিয়োগে তিনি মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন। গত এক বছরে প্রশাসনে তার নিজস্ব বলয়ও তৈরি হয়ে গেছে।
সরকার-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সব জেলা প্রশাসকই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা। মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা, দুর্নীতিমুক্ত পরিচিতি ও ডিজিটাল সেবায় দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়েই এই নিয়োগ হয়েছে। এসএসবির সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে এসএসবি কোনো বাধ্যতামূলক চূড়ান্ত তালিকা নয়। সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন, জেলার পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই নিয়োগ হয়েছে। যাদের নিয়ে বিতর্ক করা হচ্ছে, তারা সবাই প্রশাসনের মেধাবী কর্মকর্তা।
সাবেক আমলা ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর বলেন, ‘নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে প্রথম বড় নিয়োগে যদি বিতর্ক সৃষ্টি হয়, তাহলে জনগণের আস্থায় আঘাত লাগে। প্রশাসনের মনোবলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিয়োগে রাজনৈতিক রঙ থাকলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পক্ষপাত তৈরি হয়। মাঠপর্যায়ে সেটির প্রভাব সরাসরি পড়ে।’ তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসক একটি জেলায় সরকারের সর্বোচ্চ নির্বাহী। তাই নিয়োগে পক্ষপাত বা অস্বচ্ছতা থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাছাড়া এমন নিশ্চয়তাও নেই যে, প্রভাবশালী জেলাগুলোতে ভুল বা অনভিজ্ঞ সিদ্ধান্ত সংকট তৈরি করবে না।