× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি

গোলাম কিবরিয়া

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৫ ০১:০৩ এএম

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৬ পিএম

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি

বাংলাদেশÑ নদীমাতৃক এই দেশটি যেন প্রকৃতির চিত্রময় এক রঙিন ক্যানভাস। ছোট্ট ভূখণ্ড হলেও এখানে মিলেছে পাহাড়, সমুদ্র, বন, নদী আর সবুজের অফুরন্ত সমারোহ। তাই বলাই যায়, পর্যটনের অজস্র সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে এই দেশটিতে।

বিগত শতকের শেষভাগ থেকেই পর্যটন শিল্পকে বিশ্বব্যাপী একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ বছর বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য ছিলÑ ‘টেকসই উন্নয়নে পর্যটন’। ঋতুবৈচিত্র্যময় বাংলাদেশের উন্নয়নেও অপার ভূমিকা রাখতে পারে পর্যটন। 

ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য মতে, পর্যটন মহাপরিকল্পনায় দেশে পর্যটনের আঞ্চলিক ও কাঠামোগত পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দেশের ৮ বিভাগকে ৮টি পর্যটন অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। পর্যটনের অবকাঠামো তৈরির জন্য উপযুক্ত জমি চিহ্নিতকরণসহ সারা দেশে ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন গন্তব্য চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসব গন্তব্যের মধ্যে আছেÑ বরিশাল অঞ্চলে ১০৭টি, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৪২৬টি, ঢাকা অঞ্চলে ৩৫৩টি, খুলনা অঞ্চলে ১০৩টি, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৮৮টি, রংপুর অঞ্চলে ১৪৬টি ও সিলেট অঞ্চলে ১২৩টি। এ ছাড়া মহাপরিকল্পনায় পর্যটন অংশীজন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, পর্যটক, পর্যটন সেবা প্রদানকারীসহ সংশ্লিষ্ট সবার জন্য থিমভিত্তিক আচরণবিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। 

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর দেশ

বাংলাদেশের দক্ষিণে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। ১২০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই সৈকত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মোহনীয় দৃশ্যে ভ্রমণকারীদের বিমোহিত করে। ইনানী, হিমছড়ি, মারমেইড, দরিয়ানগর বা পাটুয়ারটেকের মতো স্থানে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা মিশে আছে নীল জলে ও সোনালি বালিতে।

অন্যদিকে উত্তর-পূর্বের সিলেট বিভাগ যেন এক সবুজ স্বপ্নরাজ্য। বিস্তীর্ণ চা-বাগান, পাহাড়ি নদী ও টিলা অঞ্চল মিলিয়ে এটি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা। জাফলংয়ের ঝরনা, লালাখালের নীল জল, মৌলভীবাজারের চা-বাগান, উদ্যান-বিল, বিছনাকান্দির প্রান্তর বা রাতারগুলের জলাবনÑসবই প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতা।

পূর্বাঞ্চলে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ঘেরা এলাকা ভিন্ন এক স্বাদ এনে দেয়। নীলগিরি, নীলাচল, বগা লেক, কেওক্রাডং কিংবা রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদÑএই স্থানগুলো শুধু নয়নাভিরাম নয়, বরং বাংলাদেশের পাহাড়ি সংস্কৃতির প্রাণও বটে।

দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের রাজ্য। এখানে আছে গেওয়া-গরান বন, অসংখ্য খাল-বিল ও প্রাকৃতিক প্রতিবেশের এক অনন্য মেলবন্ধন। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী এই বন শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের নয়, পরিবেশ গবেষকদেরও গন্তব্য।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা

বাংলাদেশের ইতিহাস হাজার বছরের। মহাস্থানগড়, ময়নামতি, পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার এবং বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদÑপ্রতিটি স্থান বহন করছে সভ্যতার উত্তরাধিকার। প্রাচীন স্থাপত্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, রাজবাড়ি, জমিদারবাড়ি ও মসজিদগুলো পর্যটকদের ইতিহাসচর্চায় অনুপ্রাণিত করে।

ঢাকা, সোনারগাঁ, পানামনগর কিংবা রাজশাহীÑপ্রতিটি শহরের রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। পুরান ঢাকার সরু গলি, খাবারের সুবাস আর ঐতিহাসিক স্থাপনা যেন সময়ের ভেতর ভ্রমণের সুযোগ করে দেয়।

সংস্কৃতি, উৎসব ও আতিথেয়তা

বাংলাদেশের মানুষ অতিথিপরায়ণ ও হাসিখুশি। ‘অতিথি দেবো ভব’Ñ এই মনোভাব থেকেই গড়ে উঠেছে দেশের আতিথেয়তার সংস্কৃতি। যেখানেই যান না কেন, ভ্রমণকারীরা পাবেন আন্তরিক অভ্যর্থনা। বাংলাদেশের সংস্কৃতি যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি উৎসবমুখর। বাংলা নববর্ষ, বৈশাখী মেলা, পহেলা ফাল্গুন, ঈদ, দুর্গাপূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা কিংবা পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর জুম উৎসবÑ সবই পর্যটনে এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে।

পর্যটনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সম্ভাবনা

বর্তমানে পর্যটন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা। সরকার পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন, ইকো ট্যুরিজম, হেরিটেজ ট্যুরিজম ও অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমে গুরুত্ব দিচ্ছে।

পর্যটনের উন্নয়নে ১৯টি মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা আছে। কিন্তু এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ খাতসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের। সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এবং উপযুক্ত স্টেকহোল্ডারদের সহযোগিতা পেলে পর্যটন খাত বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে দেশে বিদেশি নাগরিক এসেছে ৫ লাখ ৬৬৫ জন, ২০১৮ সালে ৫ লাখ ৫২ হাজার ৭৩০ জন। ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ বিদেশি নাগরিক দেশে আসে, এই সংখ্যা ৬ লাখ ২১ হাজার ১৩১। করোনার সময় ২০২০ সালে এসেছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৫১৮ জন, ২০২১ সালে ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৮৬ জন এবং ২০২২ সালে আসে দেড় লাখ বিদেশি। ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার। গেল বছরের হিসাব এখনও আসেনি পর্যটন বোর্ডের কাছে। এসব বিদেশির কতজন ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এবং কতজন প্রকৃত পর্যটনের উদ্দেশ্যে এসেছে সেই তথ্য অবশ্য দিতে পারেনি বিটিবি।

পর্যটন বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ও বহুমাত্রিক অন্যতম কেন্দ্রীয় খাত। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থানের ১১ টি খাতের পর্যটন শিল্পও একটি খাত। মোট চাকরির ১০ শতাংশ ঘটে এই পর্যটন শিল্পে। কোভিড-পূর্ববর্তী ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটন অবদান রাখে ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার; যা বিশ্ব জিডিপিতে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। এই শিল্পের সঙ্গে সমগ্র বিশ্বে ৩৩০ মিলিয়ন মানুষ কর্মরত রয়েছে। সমগ্র বিশ্বে ১৫০ কোটি পর্যটক রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ৭ জনে ১ জন পর্যটক।

এসব বিবেচনায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনে পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা রাখছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল প্রতিটি দেশের জন্যই পর্যটন শিল্প সমানভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রযোজ্য। ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের জন্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিভিন্ন এজেন্ডা গ্রহণ করা হয়েছে; যা বিভিন্ন দেশ নিজ নিজ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাস্তবায়ন শুরু করেছে। মিলিনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজির ওপর ভিত্তি করে এসডিজি অর্জনে ১৭টি লক্ষ্য ও ১৬৯টি সংশ্লিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে কার্যক্রম সেট তৈরি করা হয়েছে; যার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পর্যটন শিল্প প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট থাকলেও বিশেষ করে লক্ষ্যমাত্রা ৮, ১২ ও ১৪ অর্জনে অর্থাৎ অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, টেকসই ভোগ ও উৎপাদন (এসসিপি) এবং মহাসাগর ও সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পর্যটন শিল্প সরাসরি সম্পৃক্ত রয়েছে। তবে এই এজেন্ডা অর্জনের জন্য একটি সুস্পষ্ট বাস্তবায়ন কাঠামো, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং মানবসম্পদে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

এসডিজি লক্ষ্য-৮, যেখানে উপযুক্ত কাজ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। পর্যটন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। পর্যটন খাতে শালীন কাজের (Decent work) সুযোগ রয়েছে, বিশেষ করে যুবক এবং নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পেশাগত উন্নয়নে ব্যাপক সম্ভাবনার ক্ষেত্র পর্যটন। পর্যটনকে টেকসই উন্নীত করার জন্য নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে; যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ স্থানীয় সংস্কৃতি ও পণ্য বিকশিত করবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই সেক্টরের অবদান এসডিজি লক্ষ্য-৮.৯ বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে।

তবে এদেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ এখনও প্রাথমিক পর্বে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভাব, দুর্বল অবকাঠামো, প্রশাসন ও স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে পর্যটনমনস্কতার ঘাটতি, পর্যটনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে ভ্রমণপিপাসুদের টানতে পারছে না বাংলাদেশ। 

‘সমুদ্র আত্মার সঙ্গে কথা বলে’Ñ কথাটি বলেছিলেন আমেরিকান সাহিত্যিক কেট চোপিন। আর সেন্ট অগাস্টিন বলেছেন, ‘পৃথিবী একটা বই আর যারা ভ্রমণ করে না তারা বইটি পড়তে পারে না।’ এ রকম অনেক বড় বড় সাহিত্যিক কিংবা মনীষী ভ্রমণ নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। মানুষের মন কখনোই ঘরে বদ্ধ হয়ে থাকতে পারে না। মন সারাক্ষণই বলে যায়Ñআহা রে আহা রে, কবে যাব পাহাড়ে? আর তাই ভ্রমণপিপাসু মানুষ ছুটে বেড়ায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। যদি পরিকল্পিতভাবে বিনিয়োগ, প্রচার ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ সহজেই দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। আমাদের প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষÑ সবই এই সম্ভাবনার শক্ত ভিত্তি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা