× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

উন্নয়নের নতুন দিগন্ত টেকসই পর্যটন

মোহাম্মদ রাফেউজ্জামান

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৫ ০১:০০ এএম

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৩৭ পিএম

উন্নয়নের নতুন দিগন্ত টেকসই পর্যটন

বাংলাদেশ ‘সৌন্দর্যের দেশ’ নামে পরিচিত। বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং আন্তরিক আতিথেয়তায় পরিপূর্ণ এই দেশ। বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার থেকে শুরু করে সবুজ চা-বাগানে ঘেরা সিলেট, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন, শান্ত-নিরিবিলি চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়Ñসব মিলিয়ে এ দেশ দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য অফুরন্ত আকর্ষণের সম্ভার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থান সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্যের অন্যতম। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জেলা ইকোট্যুরিজম ও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের জন্য আদর্শ স্থান। নদীবেষ্টিত এই দেশজুড়ে নদীভ্রমণ ও গ্রামীণ পর্যটনেরও অবারিত সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশের গৌরবময় ইতিহাস ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এর অন্যতম বড় সম্পদ। পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, মহাস্থানগড় এবং ময়নামতি প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে আমাদের হাজার বছরের সভ্যতার সাক্ষী। দেশের প্রাণবন্ত উৎসব, ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও বৈচিত্র্যময় খাবার আমাদের সংস্কৃতিকে আরও বর্ণময় করে তুলেছে। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস বাংলাদেশকে দিয়েছে অনন্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব। বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতা ও উষ্ণ আতিথেয়তা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার অন্যতম প্রধান কারণ। 

সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প এখনও প্রত্যাশিত অগ্রগতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতা এই খাতের টেকসই উন্নয়নকে ব্যাহত করছে। বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের প্রধান কিছু বাধা নিম্নরূপÑ

১. ভ্রমণ পরামর্শ (Travel Advisories)

অনেক বিদেশি সরকার এখনও বাংলাদেশের জন্য অনুকূল নয় এমন ভ্রমণ পরামর্শ জারি করে রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করে। এসব পরামর্শ অনেক সময় পুরনো তথ্য বা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়, যার ফলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পর্যটক আগমনের সংখ্যায়, আন্তর্জাতিক পর্যটন ইভেন্টে অংশগ্রহণে এবং বিদেশি ট্যুর অপারেটর ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর।

২. ই-ভিসা ও ভিসা সুবিধা (E-Visa and Visa Facilitation)

বাংলাদেশে ই-ভিসা সেবা চালু করা হলেও এখনও এটি জটিল ও অসংগঠিত। পর্যটকদের অনেক সময় বিলম্ব, প্রযুক্তিগত সমস্যা এবং স্পষ্ট নির্দেশনার অভাবের মুখে পড়তে হয়। ই-ভিসা প্রক্রিয়াকে সহজ, দ্রুত ও ব্যবহারবান্ধব করলে এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা গেলে বিদেশি পর্যটকের আগমণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরলীকৃত ই-ভিসা ও ভিসা সুবিধা বিশেষত প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে পর্যটক আকর্ষণে সহায়ক হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ বাড়াবে।

৩. আউটবাউন্ড ট্যুরিজমে অগ্রিম আয়কর (AIT) প্রত্যাহার (Withdrawal of Advance Income Tax on Outbound Tourism)

আউটবাউন্ড পর্যটন প্যাকেজে অগ্রিম আয়কর (AIT) আরোপের ফলে পর্যটক ও ট্যুর অপারেটর উভয়ের জন্যই অপ্রয়োজনীয় আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হয়। এই কর প্রত্যাহার করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে নিবন্ধিত কোম্পানির মাধ্যমে স্বচ্ছ ও বৈধ লেনদেন নিশ্চিত হয় এবং ট্যুর অপারেটরদের জন্য সমান সুযোগের পরিবেশ তৈরি হয়।

৪. বিদেশে সেবা প্রদানে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ প্রদানের সুবিধা (Ease of Payment through Banks for Counterpart Services Abroad) 

বাংলাদেশি ট্যুর অপারেটররা বিদেশি হোটেল, পরিবহন সংস্থা ও পর্যটনসেবা প্রদানকারীদের বৈধভাবে অর্থ দিতে গিয়েও প্রায়ই জটিলতার মুখে পড়েন। কঠোর ব্যাংকিং নীতিমালা এবং সুবিধাজনক আন্তর্জাতিক অর্থ প্রদানের পদ্ধতির অভাবে এ সমস্যা দেখা দেয়। পর্যটন সম্পর্কিত অর্থ প্রদানের জন্য অনুমোদিত বহির্মুখী রেমিট্যান্সের একটি সহজ ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা প্রবর্তন করলে ব্যবসায় স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়বে।

৫. সেন্ট মার্টিন দ্বীপে সারা বছর পর্যটন সুবিধা (Year-Round Access to St. Martin’s Island)

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্রাকৃতিক পর্যটনস্থান হলেও মৌসুমভিত্তিক দর্শনার্থী সীমাবদ্ধতার কারণে এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। উপযুক্ত অবকাঠামো, পরিবেশবান্ধব নীতিমালা এবং নিয়ন্ত্রিত পর্যটন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে সারা বছর দ্বীপে পর্যটন কার্যক্রম চালু করা সম্ভব। এতে স্থানীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে এবং একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণও নিশ্চিত করা যাবে।

৬. বিদেশি পর্যটকদের জন্য পার্বত্য ও সীমাবদ্ধ এলাকায় ভ্রমণ অনুমতি সহজীকরণ (Ease of Permission for Foreign Tourists in Hill Tracts and Restricted Areas)

বর্তমানে বিদেশি পর্যটকদের চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলসহ কিছু এলাকায় ভ্রমণের জন্য বিশেষ অনুমতি নিতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া। এই অনুমতি প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ ও ডিজিটাল প্লাটফর্মে নিয়ে এলে নিরাপত্তা বিধি বজায় রেখেই এসব অনন্য গন্তব্যকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য আরও সহজলভ্য করা সম্ভব হবে। এর ফলে বাংলাদেশ একটি উন্মুক্ত ও পর্যটক-বান্ধব দেশ হিসেবে বৈশ্বিক পরিচিতি পাবে।

৭. পর্যটন যানবাহনে অতিরিক্ত শুল্ক (Excessive Duty on Tourist Vehicles)

বাংলাদেশে পর্যটন উন্নয়নের অন্যতম বড় বাধা হলো পর্যটন যানবাহনে আরোপিত অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক এবং ১৫ বছরের বয়সসীমা। আধুনিক, আরামদায়ক ও নিরাপদ যানবাহন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি ইতিবাচক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান নীতিমালার কারণে নতুন যানবাহন আমদানি করা ট্যুর অপারেটরদের জন্য আর্থিকভাবে অলাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার যদি পর্যটন যানবাহনে শুল্ক কাঠামো প্রত্যাহার করে বা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে এবং ১৫ বছরের সীমা তুলে দেয়, তাহলে অপারেটররা আধুনিক ও পর্যটকবান্ধব যানবাহন সংযোজন করতে পারবে, যা সামগ্রিক পর্যটনসেবার মান উন্নত করবে।

৮. আন্তর্জাতিক অর্থ প্রদানে অপ্রতিকূল বিনিময় হার (Unfavorable Exchange Rate for International Payments)

আরেকটি বড় সমস্যা হলো ব্যাংকের অফিসিয়াল বিনিময় হার এবং আন্তর্জাতিক হোটেল চেইন বা সেবা প্রদানকারীদের অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হারের মধ্যে পার্থক্য। এই বৈষম্য দেশীয় অপারেটর এবং বিদেশি অংশীদারদের নির্বিঘ্ন ব্যবসায়িক লেনদেনকে নিরুৎসাহিত করে। পর্যটন সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যবহৃত বিনিময় হার ব্যাংকের অফিসিয়াল হারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা উচিত।

৯. বিদেশে পর্যটন রাষ্ট্রদূতের অভাব (Lack of Tourism Ambassadors Abroad)

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও পর্যটন সম্ভাবনা যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয় না। বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে পর্যটনকেন্দ্রিক কর্মকর্তা বা ‘ট্যুরিজম অ্যাম্বাসেডর’ না থাকায় বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের দৃশ্যমানতা সীমিত রয়ে গেছে। সরকার যদি প্রতিটি দূতাবাস ও মিশনে পর্যটন রাষ্ট্রদূত বা পর্যটন কর্মকর্তা নিয়োগ করে, তবে ইকো-ট্যুরিজম, সাংস্কৃতিক পর্যটন ও মেডিকেল ট্যুরিজমের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশকে কার্যকরভাবে প্রচার করা সম্ভব হবে।

নীতিমালা ও প্রশাসনিক এই বাধাগুলো দূর করতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, ডিজিটাল সুবিধা বৃদ্ধি এবং পর্যটনবান্ধব সংস্কার অপরিহার্য। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ সহজেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতামূলক পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

  • সভাপতি, ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব)
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা