সাক্ষাৎকার
প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০২৫ ০০:৩৩ এএম
আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৪২ পিএম
পর্যটন শিল্প বিকাশের অন্যতম প্রধান শর্ত নিরাপত্তা। পর্যটন শিল্পকে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার চাদরে আবৃত করে দেশের সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে ২০১০ সালে জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ঘোষণা করা হয়। সেই নীতিমালার ৬.৯ অনুচ্ছেদে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে ট্যুরিস্ট পুলিশ মোতায়েনের বিষয় উল্লেখ ছিল। পরে ২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর ‘ট্যুরিস্ট পুলিশ’ নামে বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হয় এবং ২০২০ সালের ৩ জুন ‘ট্যুরিস্ট পুলিশ বিধিমালা, ২০২০’ শিরোনামে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশকে পর্যটকদের জন্য একটি নিরাপদ স্থানে পরিণত করা ও পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে শুরু থেকেই ট্যুরিস্ট পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। ৪টি বিভাগে ১১টি রিজিয়ন রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশের। এই রিজিয়নগুলোকে ৩২টি জেলায় ৩৯টি জোনে বিভক্ত করে ৬৪ অফিসের মাধ্যমে ১৩২টি পর্যটনস্পটে ভাগ করে কাজ করছে তারা।
বর্তমানে ট্যুরিস্ট পুলিশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসান। প্রতিদিনের বাংলাদেশের মুখোমুখি হয়ে সেই পরিকল্পনা ও ট্যুরিস্ট পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন অতিরিক্ত আইজিপি ও ট্যুরিস্ট পুলিশপ্রধান মো. মাইনুল হাসান। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাইফ বাবলু।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে ট্যুরিস্ট পুলিশ কী ভূমিকা পালন করছে?
মো. মাইনুল হাসান : ট্যুরিস্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যটনস্পটে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ২০১৩ সালে ট্যুরিস্ট পুলিশ গঠন করা হয়। দেশের ১৩০টি পর্যটনস্পটে ট্যুরিস্ট পুলিশ রয়েছে। এসব স্পটে পর্যটকদের নিরাপত্তা দিচ্ছে তারা। কোনো ট্যুরিস্ট পর্যটনস্পটে গিয়ে কোনো প্রতারণার শিকার হচ্ছেন কি না, চুরি, ডাকাতি ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন কি না, নারী পর্যটকরা ইভ টিজিংয়ের শিকার হচ্ছেন কি নাÑ এসব বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি করে থাকে ট্যুরিস্ট পুলিশ। ফলে স্পটগুলোতে আগের চেয়ে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করেছে, হয়ে উঠেছে জমজমাট। রেভিনিউ যুক্ত হচ্ছে রাজস্ব খাতে। এ ছাড়া অসুস্থ হয়ে পড়া পর্যটকদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সহযোগিতা, পর্যটকদের হারিয়ে যাওয়া সন্তানদের খুঁজে বের করা, দুর্ঘটনায় পড়া পর্যটকদের উদ্ধারে ট্যুরিস্ট পুলিশ বাড়তি দায়িত্ব পালন করছে। আর এসব কারণে পর্যটকরা ভ্রমণে নিরাপত্তা ও সুরক্ষিত মনে করেন নিজেদের।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় ট্যুরিস্ট পুলিশকে ঢেলে সাজানোর বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা নিয়েছেন কি না?
মো. মাইনুল হাসান : টুরিস্ট পুলিশের অর্গনোগ্রাম অনুযায়ী জনবলের সংকট রয়েছে। জনবল বৃদ্ধির জন্য সরকারের কাছে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। সরকার সেটি অনুমোদন করলে ট্যুরিস্টদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও জনবল বাড়ানো হবে। যাতে প্রতিটি স্পটে পর্যটকদের পুরোপুরি নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। জনবলের পাশাপাশি লজিস্টিক সাপোর্ট প্রয়োজন রয়েছে। যে সকল লজিস্টিক প্রয়োজন তার একটি চাহিদা সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে। যেসব পর্যটনস্পটে এখনও ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যক্রম বা অফিস নেই, সেসব স্থানে ট্যুরিস্ট পুলিশের অফিস করার পরিকল্পনা রয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশকে প্রযুক্তিসমৃদ্ধ একটি ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। পর্যটনস্পটে প্রতিদিন কত পর্যটক আসছেন, কতজন রাত্রিযাপন করছেন তার সব ডেটা থাকবে ট্যুরিস্ট পুলিশের কাছে। ট্যুরিস্টদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখতে পারবে ট্যুরিস্ট পুলিশ। সমুদ্রসৈকত বা কোস্টাল এলাকায় পর্যটকদের সুরক্ষায় বোট ও লাইফ সাপোর্ট জ্যাকেটসহ বিশেষ টিম গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : অপরাধপ্রবণ স্পটগুলোতে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা কতটুকু?
মো. মাইনুল হাসান : দেশের সব পর্যটনস্পটের গুরুত্ব সমান নয়। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চল, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন স্পটে সবচেয়ে বেশি পর্যটকের আনাগোনা থাকে। এসব এলাকায় পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট আরও বেশি প্রয়োজন। কক্সবাজারে পর্যটকরা অনেক সময় সমুদ্রে নামতে গিয়ে অথবা ছোট ছোট দ্বীপে ভ্রমণ করতে গিয়ে নানা ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হন। তাই সেখানে লাইফ জ্যাকেট, স্পিড বোটের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। পাবর্ত্য অঞ্চলে ট্যুরিস্ট পুলিশকে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে থেকেই পর্যটকদের নিরাপত্তা দিতে হয়। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ট্যুরিস্ট পুলিশ বর্তমানে পেশাদারত্ব ও দক্ষতায় পুরোপুরি একটি সক্ষম ইউনিট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। অনেক এলাকা রয়েছে, সেগুলো আগে অপরাধপ্রবণ পর্যটন স্পট ছিল। ট্যুরিস্ট পুলিশ সেই সব স্পট অপরাধমুক্ত করতে নিরলসভাবে কাজ করছে। অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে টুরিস্টদের নিরাপত্তা দিচ্ছে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ : পর্যটন স্পটগুলোতে কোনো ধরনের সমস্যা আছে কি না? ট্যুরিজমকে এগিয়ে নিতে ট্যুরিস্ট পুলিশ কীভাবে সেগুলোর সমাধান করে থাকে?
মো. মাইনুল হাসান : দেশের পর্যটনস্পটগুলোর মধ্যে অনেকগুলো রিমোট এলাকা। এছাড়া পর্যটকদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার হোটেল ও থাকার ব্যবস্থার সংকট রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভালো না। নিরাপত্তার জন্য দায়িত্বে থাকা ট্যুরিস্ট পুলিশের বিশ্রাম বা থাকার ব্যবস্থার সমস্য রয়েছে। এসব সমাধান করা মূলত পর্যটন করপোরেশনের দায়িত্ব। ট্যুরিস্ট পুলিশের মূল লক্ষ্য স্পটগুলোতে ট্যুরিস্টদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ট্যুরিস্ট পুলিশ ট্যুরিস্টদের জন্য মনোরম পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে। এ বাহিনী ভদ্র সৌজন্যমূলক ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটি স্থলে পর্যটকদের ভ্রমণে উৎসাহিত করে থাকে। গত এক বছরে ট্যুরিস্টদের মারপিট, পর্যটনস্পটগুলোতে ছিনতাই, চুরির ঘটনায়সহ নানা অপরাধে ২৮২টি মামলা তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে তারা। আর এ অভিযোগে ৮৭ জনকে গেপ্তার করা হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া ৩৬৭ শিশু উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর উদ্ধার করে ২৬২ জনকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। পর্যটকদের হারিয়ে যাওয়া বা চুরি হওয়া ৯০টি মোবাইল উদ্ধার করে মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সমুদ্রসৈকতসহ কোস্টাল এলাকায় ভ্রমণ করতে গিয়ে পানিতে পড়ে ডুবে যাওয়ার সময় ২৮ জনকে উদ্ধার করে প্রাণহানির শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করা হয়েছে। ৪৬ মূল্যবান সামগ্রী উদ্ধার করে সেগুলো যথাযথ মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।