মেহেদী আল আমিন
প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১৬:৫৩ পিএম
আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২৫ ১৭:০৯ পিএম
প্রতীকী ছবি।
দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন কোম্পানির ১২টি ব্র্যান্ডের টি-ব্যাগের ভেতরে থাকা চা পাতা পরীক্ষা করে চারটিতে ইউরেনিয়ামের উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেঙ্গল ক্লাসিক টি ব্র্যান্ডের চা পাতায় ৪ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন), প্যারাগন ব্র্যান্ডের চা পাতায় ৪ পিপিএম, লিপটন গ্রিন টি ব্র্যান্ডের চা পাতায় ৪ পিপিএম এবং ব্রুক বন্ড তাজা ব্র্যান্ডের চা পাতায় ৩ পিপিএম মাত্রায় ইউরেনিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে “ব্রিউইং টক্সিনস: এক্সপোজিং দ্য হেভি মেটাল হ্যাজার্ড ইন টি-ব্যাগস অ্যান্ড ড্রাইড লুজ টি” শীর্ষক এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
এসডো ও ফিলিপাইনস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা বেন টক্সিকস যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করে। এ গবেষণাতেই এসব তথ্য উঠে আসে।
এসডোর সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার ড. শাহরিয়ার হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “চা পাতায় ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। তবে কোন উৎস থেকে ইউরেনিয়াম এসেছে, তা এই গবেষণায় দেখা হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের পরীক্ষা দেশে এটিই প্রথম। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও ব্যাপকভাবে গবেষণা করা।”
ইউরেনিয়ামের পাশাপাশি পারমাণবিক তেজস্ক্রিয় ধাতু থোরিয়ামও পাওয়া গেছে। বেঙ্গল ক্লাসিক টি ব্র্যান্ডের চা পাতায় ৪১ পিপিএম, প্যারাগনে ৪৬ পিপিএম, লিপটন গ্রিন টিতে ৪২ পিপিএম এবং ব্রুক বন্ড তাজায় ৫০ পিপিএম থোরিয়াম শনাক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তাদের কোনো গবেষণা নেই। যদি এসডোর গবেষণা সঠিক হয়, তবে ইউরেনিয়াম কোন উৎস থেকে এসেছে এবং তা রেডিওঅ্যাকটিভ কিনা, তা জানা জরুরি।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন চট্টগ্রাম কেন্দ্রের পরিচালক ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শাহাদত হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “গবেষণাটিতে হয়তো ইউরেনিয়াম সনাক্ত হয়েছে। তবে জানতে হবে, শনাক্ত ইউরেনিয়ামটি রেডিওঅ্যাকটিভ কিনা। যদি রেডিওঅ্যাকটিভ হয়, তবে তা অবশ্যই মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা নার্ভের ক্ষতি করে, নিউরন ও মস্তিষ্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। এর তেজস্ক্রিয়তার কারণে বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিতেও পারে।”
বেঙ্গল ক্লাসিক টি উৎপাদন করে সিটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সিটি টি এস্টেট লিমিটেড, প্যারাগন ব্র্যান্ড উৎপাদন করে প্যারাগন অ্যাগ্রো লিমিটেড, আর লিপটন গ্রিন টি ও ব্রুক বন্ড তাজা ব্র্যান্ড দুটি উৎপাদন, প্যাকেটজাত ও বাজারজাত করে লিপটন টিস অ্যান্ড ইনফিউশনস।
প্যারাগন অ্যাগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
লিপটন টিস অ্যান্ড ইনফিউশনসের বাংলাদেশে গুলশান অফিসে গিয়েও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সেখানে থেকে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। সদর দপ্তরে ই-মেইল পাঠানো হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
এছাড়া সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহাকে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনিও কোনো বক্তব্য দেননি।
গবেষণায় নমুনা হিসেবে নেওয়া অন্যান্য ব্র্যান্ড হলো কাজী ব্ল্যাক টি, কাজী গ্রিন টি, কাজী লেমনগ্রাস টি, ফিনলে গোল্ড ব্ল্যাক, টেটলি, সিলন, ইস্পাহানি মির্জাপুর ও ডিলমা। এছাড়া একটি খোলা চা পাতাও নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ চা বোর্ডের গবেষণা কর্মকর্তা মো. নাজমুল আলম বলেন, “গবেষণাটি আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা আগে জানতাম না যে টি-ব্যাগের প্যাকেজিংয়েও ভারী ধাতু থাকতে পারে। গবেষণায় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ও চা কোম্পানিগুলোকে যুক্ত করা হলে আরও ভালো হতো। চা শিল্পের স্বার্থে ভবিষ্যতে বড় পরিসরে সব পক্ষের অংশগ্রহণমূলক গবেষণা প্রয়োজন।”
এছাড়া ১২টি ব্র্যান্ডের টি-ব্যাগ থেকে চা পাতা আলাদা করে ব্যাগগুলোও পরীক্ষা করা হয়।
টি-ব্যাগে ৬টি নমুনায় ক্রোমিয়াম, ৭টি ব্র্যান্ডে সীসা, ৪টিতে ক্যাডমিয়াম এবং ৮টিতে পারদ পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পারদের মতো ভারী ধাতু মস্তিষ্কের ক্ষতি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও আচরণগত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। ক্যাডমিয়াম ও পারদ উচ্চ রক্তচাপ, রক্তনালীর ক্ষতি এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এসব ধাতু প্রজননজনিত সমস্যা, বন্ধ্যাত্ব, গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, “এই সবগুলো ভারী ধাতুই মানবদেহের জন্য প্রায় একইরকম ক্ষতিকর। এগুলো কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে, কিডনি বিকল করতে পারে এবং ক্যান্সার সৃষ্টি করার ক্ষমতাও রাখে।”
গবেষণায় জনসচেতনতা যাচাইয়ের জন্য ৮ বিভাগের ৩ হাজার ৫৭১ জনের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে দেখা যায়, ৯৬ শতাংশ মানুষ নিয়মিত চা পান করেন; ৫৫ শতাংশ দিনে দুই থেকে তিন কাপ এবং ২৭ শতাংশ চার বা তার বেশি কাপ চা পান করেন। উত্তরদাতাদের মধ্যে ৯২ শতাংশ কখনো টি-ব্যাগের লেবেল পড়ে দেখেননি। মাত্র এক শতাংশ ধারণা রাখেন যে টি-ব্যাগে ভারী ধাতু থাকতে পারে।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, “শুধু ভোক্তা নয়, উৎপাদক ও সরকারি সংস্থারও সচেতন হওয়া দরকার। গবেষণার মাধ্যমে আমরা সেই বিষয়টি তুলে ধরতে চেয়েছি। তবে আরও বেশি নমুনা নিয়ে বড় পরিসরে গবেষণা করার আর্থিক সক্ষমতা আমাদের নেই।”