× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আবাসনে ‘ষোলো আনা’ সুখ পেতে চান সরকারি কর্তারা

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৯:০৬ এএম

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৮:২৯ পিএম

ফাইল ফটো।

ফাইল ফটো।

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বিপুল ব্যয়ে রাজধানীতে গড়ে উঠছে বিলাসী আবাসন। এসব ভবন নির্মিত হবে আগারগাঁও, আজিমপুর ও মতিঝিলের মতো অভিজাত এলাকায়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরে যখন ‍কৃচ্ছ্র সাধন ও বাজেট সংকোচনের পথে হাঁটছে, ঠিক তখনই একের পর এক আবাসন প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হচ্ছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। এসব প্রস্তাবের বেশ কয়েকটি ইতোমধ্যে পাসও হয়েছে। জানা গেছে, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এসব প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকারি কর্মকর্তাদের উন্নত জীবনযাত্রা নিশ্চিতের জন্য। প্রকল্পগুলোকে সরকারের পক্ষ থেকে আবাসন সংকট সমধানের উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করা হলেও বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন এসব প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারের কৃচ্ছ্র নীতির বাস্তবতা নিয়ে।

প্রকল্পগুলোর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোপোজাল (ডিপিপি) বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরকারি আবাসন ভবনগুলো শুধু থাকার জায়গাই নয়, পুরোই বিলাসী আয়োজন।

বিলাসবহুল এসব প্রকল্পের প্রতিটিই মাল্টিপারপাস ভবন। যেখানে থাকছে কমিউনিটি সেন্টার, লাইব্রেরি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, জিমনেশিয়াম, ওয়াকওয়ে, পার্কিং, সুসজ্জিত পুকুর, অ্যাম্পিথিয়েটার, খেলার মাঠ, মার্বেল পাথরের সিঁড়ি ও লবি, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং ও সেফটি ক্যানোপির মতো বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। এসব ভবনে প্রতিটি অত্যাধুনিক ফ্ল্যাটের নির্মাণ খরচ কোটি টাকার ওপরেÑ যার মাধ্যমে ‘ষোলো আনা’ সুবিধা ভোগে মরিয়া সরকারি বাবুরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর বাণিজ্যিক কেন্দ্র মতিঝিলের আল হেলাল জোনে ১০ দশমিক ২৫ একর জমিতে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ১০টি ভবন নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। এই ভবনগুলোর ৭৩৬টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ১৮০০ বর্গফুটের ৯২টি, ১৫০০ বর্গফুটের ৩৬৮টি এবং ১২৫০ বর্গফুটের ২৭৬টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ হবে কর্মকর্তাদের জন্য। প্রস্তাবে বলা হয়, ভবনের বাইরে থাকবে আরও আটটি ২৫তলা আবাসিক টাওয়ার, একটি মাল্টিপারপাস ভবন ও একটি জেনারেটর-সাবস্টেশন। মাত্র ৭৩৬ জন কর্মকর্তার আবাসনের জন্য বিলাসবহুল এ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।

এ ছাড়া রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রায় ৪৩ একর জমির ওপর ১ হাজার ৫১২টি ফ্ল্যাটের একটি প্রকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী এই প্রকল্পে নির্মাণ হবে ৪৯টি ভবন। এ ছাড়া কমিউনিটি ফ্যাসিলিটি জোনে স্কুল, কলেজ, মসজিদ, শপিংমল, কমিউনিটি সেন্টার ও সুইমিংপুলসহ একাধিক ভবন নির্মিত হবে। গণপূর্ত কর্মীদের জন্য থাকবে ডরমিটরি ভবনও।

এসব আবাসিক ভবনের প্রতিটিতে থাকবে দুটি বেজমেন্ট পার্কিং, উচ্চমানের লিফট ও আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। প্রকল্প এলাকায় সোলার স্ট্রিট লাইট, ক্লোজড ড্রেনেজ, কনসিল্ড ইন্টারনেট লাইন, গভীর নলকূপ থেকে পানি সরবরাহ, এসটিপি, ডাম্পিং জোন, খেলার মাঠ ও লেকপাড় প্লাজার মতো সুবিধা রাখা হয়েছে। এ প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

রাজধানীর আজিমপুরের সি ও ডি জোনে নতুন সরকারি আবাসন প্রকল্পের জন্যও দুটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সি জোন একনেক বৈঠকে পাস হলেও ডি জোনের প্রস্তাব এখনও পাস হয়নি। প্রকল্প অনুযায়ী সি জোনে বর্তমানে অবস্থিত ৩২টি পুরনো ভবন ভেঙে নির্মিত হবে ১১টি বহুতল ভবন, যাতে থাকবে ৮৩৬টি ফ্ল্যাট। এর বাইরে থাকবে একটি ৯০০০ বর্গফুটের সার্ভিস ভবন, ১৫,০০০ বর্গফুটের মাল্টিপারপাস ভবন এবং ৬,০০০ বর্গফুটের একটি মসজিদ। প্রকল্প এলাকায় আরও থাকবে অভ্যন্তরীণ রাস্তা, ওয়াকওয়ে, পার্কিং, মাস্টার ড্রেন, স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, ভূগর্ভস্থ জলাধার, সাব-স্টেশন, জেনারেটর, ৩৭টি লিফট, এক্সপ্রেস বিদ্যুৎ লাইন এবং আধুনিক ফায়ার সেফটি সিস্টেম। সি জোনের ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৭৪ কোটি টাকা। ২০২৮ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা।

এর আগে আজিমপুরের এ ও বি জোনের কাজ সমাপ্ত হয়। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে এ জোনে বসবাস শুরু হয়েছে। অন্যদিকে ২০২১ সালে বরাদ্দপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বি জোনে বসবাস করেছেন। এ জোনেহাজার ১৪০টি এবং বি জোনেহাজার ৭৪৮টি ফ্ল্যাট রয়েছে

এ ছাড়া ১৪৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় তৈরি হচ্ছে ১২৩টি ফ্ল্যাট। ২০২৪ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে ২০২৬ সালে।

প্রকল্পগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে গণপূর্ত প্রকল্প সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. খালেদ হুসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যখন আমরা কোনো প্রকল্প তৈরি করি, তখন এর একটি স্থাপত্য নকশা প্রণীত হয়। আবাসিক এলাকার জন্য কোন কোন সুবিধা প্রয়োজন, তা স্থপতিরা নকশায় অন্তর্ভুক্ত করেন। আমরা কেবল জানাই কতজনের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবেÑ এই চাহিদাটুকুই। ওই সংখ্যক মানুষের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো নির্ধারণ করেন স্থপতিরাই। পরবর্তীতে স্থাপত্য নকশার ভিত্তিতেই আলোচনা করে ডিপিপি প্রণয়ন করা হয়। এ প্রক্রিয়ার বাইরে আমরা একচুলও সরে যেতে পারি না।’

এদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নেওয়া এসব বিলাসী প্রকল্পে এত অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। আবাসনের মাধ্যমে ‘ষোলো আনা’ সুবিধার বিনিময়ে জনসেবার মানে উন্নীত হবে কি নাÑ সে প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণের মনে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের জন্য মানসম্মত বাসস্থান এবং তাদের জীবনযাপনের জন্য উপযুক্ত বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে জনগণকে সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সরকারি কর্মচারীদের শুধু সুবিধা নিলেই হবে না, সেবার মানও উন্নত করতে হবে এবং কাজের গতি বাড়াতে হবে।’

তবে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য উচ্চাভিলাষী আবাসন নির্মাণের কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. আদিল মুহাম্মদ খান।

এসব প্রকল্পে সঠিক ভেটিং হয় না; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজেরাই নকশা প্রণয়ন করে আবার নিজেরাই অনুমোদন করিয়ে নেন উল্লেখ করে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আগে দেশে সরকারি কর্মচারীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা থাকলেও সম্প্রতি এসব প্রকল্প করপোরেট আঙ্গিকে সাজানো হচ্ছে। সরকারি আবাসনের জায়গায় এখন লাক্সারি ইন ও করপোরেট স্টাইলের বহুতল ভবন নির্মাণ হচ্ছে, যা আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা