চট্টগ্রামে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি
বিশেষ প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১০:৫৩ এএম
বাংলাদেশের কৌশলগত চট্টগ্রাম অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে শুধু বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার প্রতিরক্ষা সম্পর্কই জোরদার হবে না, বরং বাংলাদেশের সেনা ও অন্যান্য বাহিনীর সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে ড্রোন, সাঁজোয়া যান, হ্যামিলটন শ্রেণির কাটার জাহাজসহ নানা রকম সামরিক সরঞ্জাম পেয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন নির্মাতা লকহিড মার্টিনের তৈরি C-130 হারকিউলিস পরিবহন বিমানও বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর বহরে যুক্ত হয়েছে। নৌবাহিনীর জন্য বিশেষ বাহিনী গঠন ও অফিসারদের নিয়মিত প্রশিক্ষণেও যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা দিচ্ছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহিনীর একটি C-130J সুপার হারকিউলিস পরিবহন বিমান চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। একই সঙ্গে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে বিএএফ জহুরুল হক ঘাঁটিতে শুরু হয়ে গতকাল বৃহস্পতিবারে সাঙ্গ হওয়া ‘প্যাসিফিক এঞ্জেল ২৫-৩’ মহড়ায় বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও শ্রীলঙ্কার বিমানবাহিনী অংশ নেয়। চার দিনের এই মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল দুর্যোগ মোকাবিলা, মানবিক সহায়তা ও আঞ্চলিক অংশীদারত্ব বাড়ানো।
এর আগে আগস্টে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী যৌথভাবে ‘টাইগার শার্ক’ মহড়া সম্পন্ন করে। এর লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার, সেনাদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বঙ্গোপসাগর ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এই উপস্থিতি কেবল সামরিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই অঞ্চল ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মিয়ানমারের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত। এদিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি (AA)-এর কর্মকাণ্ড সীমান্তে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে এবং রোহিঙ্গা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
আরাকান আর্মির তৎপরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশে ঢুকছে, যা বাংলাদেশের সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সীমান্তের অঞ্চল, বিশেষত নাফ নদীর ওপর AA’র নিয়ন্ত্রণ মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করেছে এবং সংঘাত বাড়িয়েছে। এতে রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাবও বাড়তে পারে। পাশাপাশি, প্রতিদ্বন্দ্বী রোহিঙ্গা সশস্ত্র দলগুলোর উপস্থিতি এবং AA’র দমনমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে সহায়তা করছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও সীমান্ত অস্থিরতা মোকাবিলায়। পাশাপাশি, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে প্রতিহত করার লক্ষ্যও রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। তারা মনে করেন চীন মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী নিয়মিতভাবে চট্টগ্রামে আসছেÑ কখনও টহল বা তথ্য সংগ্রহের জন্য, আবার কখনও যৌথ মহড়ার জন্য। এ বছরই বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন প্যাসিফিক এঞ্জেল-২৫’ এবং ‘টাইগার লাইটনিং-২০২৫’ নামে কয়েকটি মহড়া চালিয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের একটি নতুন দল চট্টগ্রামে পৌঁছেছে এবং শিগগিরই আরেকটি যৌথ প্রশিক্ষণ মহড়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের নিয়মিত আগমন ও যৌথ মহড়ার কারণে চট্টগ্রামে মার্কিন উপস্থিতি এখন অনেক বেশি দৃশ্যমান। সম্প্রতি ঢাকার একটি হোটেলে যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশেষ বাহিনীর অফিসারকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। এর পরপরই দুই দেশের সহযোগিতা আরও গতি পেয়েছে। তবে এ ঘটনায় ভারতের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, নির্ধারিত সীমার বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা বাংলাদেশে বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্লোবাল ডিফেন্স কর্প’ নামের ভূ-রাজনীতি, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিষয়ক ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ওয়াশিংটনের এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দেশ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্র সেন্টমার্টিন দ্বীপে নৌঘাঁটি করতে চাইছে। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশকে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে।