রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৯:৫২ এএম
রাজধানীর গুলিস্তানে সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেট। একের পর এক অবৈধ দোকান উঠছে এই মার্কেটে। এখানে নকশা-বহির্ভূত অবৈধ দোকানই রয়েছে ৫১৩টি। এসব দোকান থেকে প্রতি মাসে আদায় হচ্ছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। যা চলে যাচ্ছে প্রভাবশালী একটি চক্রের পেটে। অভিযোগ উঠেছে, বিষয়টি জেনেও না জানার ভান করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। তারা অবৈধ দোকানি বা প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। ফলে নেই কোনো উচ্ছেদ অভিযান। অথচ ডিএসসিসির প্রধান কার্যালয় নগর ভবনের সীমানা থেকে সুন্দরবন মার্কেটের দূরত্ব ১০০ মিটারের কম।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) মালিকানাধীন বাণিজ্যিক এই মার্কেটটি চারতলা বিশিষ্ট। এর ওপর অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে আরও একতলা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মার্কেটের নকশায় নির্ধারিত দোকানের বাইরে নিচতলায় গড়ে উঠেছে ৯৯টি দোকান, দ্বিতীয় তলায় ৪১টি, তৃতীয় তলায় ৩৭টি, চতুর্থ তলায় ৩৬টি এবং পঞ্চম তলায় ৩০০টি অবৈধ দোকান। সব মিলিয়ে অবৈধ দোকানের সংখ্যা ৫১৩টি। এসব দোকান গড়ে তোলা হয়েছে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য উন্মুক্ত জায়গা, এসকেলেটর, লিফট, সিঁড়ি, বিদ্যুৎ রুম ও টয়লেট দখল করে।
ভবন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ এসব দোকানের কারণে পুরো মার্কেটই ভয়াবহ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে। এমনকি মার্কেটের অবৈধ অংশে আগুন লাগলে বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধার তৎপরতা চালানোর পথও থাকবে না- ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা।
তারা বলছেন, মার্কেটের জরুরি বহির্গমন পথ ও এসকেলেটরের জায়গা দখল করে দোকান বসানোয় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এমনকি বিদ্যুৎরুম দখল হওয়ায় যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার শঙ্কাও রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের রাজস্ব শাখা থেকে করপোরেশনের সম্পত্তি বিভাগকে একাধিকবার এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদের নির্দেশনা দেওয়া হলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তা কার্যকর হয়নি। অভিযোগ আছে, অবৈধ আয়ের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটের ভেতরে করপোরেশনের একটি প্রভাবশালী অংশও সম্পৃক্ত। ফলে কাগজে-কলমে নোটিস জারি হলেও বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না।
সুন্দরবন মার্কেটের রেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট মারুফ হাওলাদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'আমরা শুধু বৈধ দোকানগুলোর ভাড়া আদায় করি। অবৈধ দোকানের ভাড়া কে বা কারা তোলেন তা জানি না।'
সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা উচ্ছেদের জন্য সম্পত্তি বিভাগের ওপর নির্ভরশীল। ২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অন্তত আটবার অবৈধ দোকান উচ্ছেদের জন্য চিঠি পাঠিয়েছে রাজস্ব বিভাগ। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। তবে ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর সম্পত্তি বিভাগ কিছু দোকান উচ্ছেদ করলেও অভিযোগ রয়েছে তা ছিল নিছক লোক দেখানো। ফলে ওই অভিযানে কোনো ফল মেলেনি। বরং উচ্ছেদের কয়েক মাসের মধ্যেই দোকানগুলো আবার নতুন করে গড়ে তোলা হয়।
এ বিষয়ে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তা হাছিবা খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'মার্কেটে নতুন করে যে দোকান বানানো হয়েছে, সেগুলো শনাক্ত করা হয়েছে। শিগগিরই সেগুলো উচ্ছেদ করা হবে। এজন্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছি।'
সম্প্রতি মার্কেটটি ঘুরে দেখা যায়, সুন্দরবন মার্কেটের নিচ থেকে পঞ্চম তলা পর্যন্ত মোবাইল এক্সেসরিজের দোকান ও গোডাউন। কিন্তু প্রথম দেখায় কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ তা বোঝার উপায় না থাকলেও সিঁড়ির নিচসহ হাঁটা-চলার পথের দোকানগুলো যে নকশার বাইরে তৈরি তা একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়। আর পঞ্চমতলার সবগুলো দোকানই গোডাউন হিসেবে ব্যবহার হয়। অভিযোগ উঠেছে, জনগণের করের টাকায় নির্মিত এই মার্কেট এখন সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। এসব অবৈধ দোকান থেকে মাসে ৩০ লাখ টাকা ভাগাভাগির 'মধু' এলে কাদের পেটে যাচ্ছে- এই প্রশ্ন এখন নগরবাসীর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজনৈতিক দলের ছায়ায় একটি চক্র এসব অবৈধ দোকান থেকে ভাড়া আদায় করছে। গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তনের আগে আওয়ামী লীগের নেতারা এসব ভাড়া নিজেদের পকেটে তুলতেন। এখন তুলছেন বিএনপির নেতারা। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে ২০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন এসব দোকানের ভাড়া তুলতেন। তখন তার সহযোগী ছিলেন যুবদলের নিয়াজ মোরশেদ জুম্মন। গত বছরে গণঅভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর ভাড়াচক্রে যুক্ত হন বিএনপি নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর মো. মামুন। তাদের হয়ে ভাড়া তোলেন সাজু, আব্দুর রহিম, ফিরোজ আলম ও শরিফুল ইসলাম। এ ছাড়াও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নানা খরচের নামে এই চক্রটি চাঁদা আদায় করে। সিটি করপোরেশনের কোষাগারে জমা না হয়ে যার পুরোটাই চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের হাতে। তবে সাবেক কাউন্সিলর মো. মামুন চাঁদা তোলার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, 'একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। আমি মার্কেটে যাই না। এসবের সঙ্গে জড়িত নই।' অন্যদিকে এ বিষয়ে মোবাইল ফোনে কল দিলে নিয়াজ মোরশেদ জুম্মন বলেন, 'কথা বলতে চাইলে সামনাসামনি আসেন'। পরবর্তীতে সুন্দরবন মার্কেটে গিয়ে তাকে না পাওয়ায়, আবারও মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'এত সময় কি পাই? কত ব্যস্ততা থাকে।'
এদিকে অবৈধ দোকান উচ্ছেদের বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জহিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, 'গত আগস্টে সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটে আগুন লাগার পর আমরা বৈঠক করেছিলাম। সেই বৈঠকে অবৈধ দোকানের বিষয়টি উঠে আসে। আমরা অবৈধ দোকানগুলো শনাক্ত করছি। নকশা-বহির্ভূত দোকান শিগগিরই উচ্ছেদ করা হবে। তবে উচ্ছেদের আগে আমরা মালিক সমিতিসহ সংশ্লিষ্টদের অবহিত করব।' তিনি আরও বলেন, 'একসঙ্গে সব অবৈধ দোকান ভেঙে দেওয়া কঠিন। তবে কোনো দোকান সিটি করপোরেশনের রুল অনুযায়ী রাখার সুযোগ হলে সেগুলোকে বৈধতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।'